হায় রে কৃষক, তোমার এ কী হাল !

  

পিএনএস (মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম প্রধান) : হায় রে কৃষক। তোমার এ কী হাল।যাদের উদয়-অস্ত রোদে পোড়া সামাহীন শ্রম-ঘামের বদৌলতে আমাদের পেটে অন্নের জোগান হয়, সে প্রাণের কৃষককে গ্রেফতার আতঙ্কে ভুগতে হচ্ছে। ফসল তোলার আনন্দের বদলে গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলার কৃষকরা ভুগছেন গ্রেফতার আতঙ্কে। এমনটা তো হবার কথা নয়।

খবরে প্রকাশ, সাদুল্যাপুর উপজেলায় আমন মৌসুমে ধান কাটা-মাড়াইয়ের শুরুতেই বকেয়া ঋণের টাকা পরিশোধের জন্য কৃষকদের চাপ দিচ্ছে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। এরই মধ্যে এ ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে উপজেলার ৩৪১ কৃষকের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা করা হয়েছে। মামলায় ঋণখেলাপি চার কৃষককে গ্রেফতারও করেছে পুলিশ। তাই আমন কাটা-মাড়াই এবং ইরি-বোরো ধানের বীজ বপনের এ সময়ে এখানের কৃষকরা গ্রেফতার আতঙ্কে এলাকা ছাড়া।

জানা গেছে, সাদুল্যাপুর উপজেলায় বিভিন্ন ব্যাংক এবং সরকারি অন্যান্য বিভাগের ঋণের বকেয়া সুদে-আসলে ১৫ কোটি ৪২ লাখ ৬ হাজার ৫৫৩ টাকা ৭ পয়সা। এই টাকার পুরোটাই বর্তমানে অনাদায়ী। ঋণের এসব টাকা আদায় না হওয়ায় গেল নভেম্বর পর্যন্ত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ৩৪১টি সার্টিফিকেট মামলা দায়ের করা হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সার্টিফিকেট সহকারী মাহবুবার রহমান মিয়া জানান, এই উপজেলায় রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ৩টি শাখার ১৪২টি মামলার বিপরীতে ১ কোটি ১১ লাখ ৯৭ হাজার ৪১৯ টাকা ৯ পয়সা খেলাপি ঋণ রয়েছে। একইভাবে অগ্রণী, জনতা, রূপালি, পল্লী উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকে ৪১ লাখ টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে। উপজেলা সমবায় বিভাগ, রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ শঠিবাড়ী এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের বিভিন্ন মামলার বিপরীতেও বেশ কয়েক লাখ টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সাদুল্যাপুর উপজেলা শাখার সভাপতি টেলিজার রহমান বাচ্চু বলেন, এখানে যারা ঋণ নিয়েছেন, তারা সবাই দরিদ্র। তাই তাদের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা না দিয়ে, ঋণ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর উচিত ঋণের টাকা সুদমুক্ত করে পরিশোধের জন্য বাড়তি সময় দেওয়া। এর পাশাপাশি সার্টিফিকেট মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়া কৃষকদের গ্রেফতার না করে তাদেরও ঋণ পরিশোধের মতো পরিবেশ সৃষ্টির সুযোগ করে দেওয়া উচিত।

দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটেরাদের দ্বারা তছরূপ হচ্ছে। ব্যাংকগুলোর টাকা নয়ছয় করে একরকম অবাধে হাতিয়ে নিচ্ছে মহলবিশেষ। শেয়ারবাজারের টাকা নিয়ে হরিলুট চলছেই। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের টাকা চলে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক জুয়ার আসরে! শত শত নয়, হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করে বুক ফুলিয়ে চলছে দুর্বৃত্তসমরা।করছে আলিশান বাড়ি। হাঁকাচ্ছে দামী গাড়ি। আর বেচারা কৃষক।তারা পড়ছেন চরম বিপাকে।

ঝড়-বৃষ্টি-বাদল-বন্যা-খরাসহ নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ মাথায় নিয়ে মাঠে ফসল ফলান কৃষক। হাড়ভাঙ্গা কষ্টের সে ফসলে আমরা উদর পূর্তি করি। একবারও কি আমরা ভাবি, কার অবদান? যদি ভাবি, তাহলে আমাদের বৃহৎ খাদক গোষ্ঠীর তাদের জন্য কি কিছুই করার নেই? নেই কোনো দায়? গ্রেফতার নয়, বরং প্রণোদনা দেওয়াই শ্রেয়। তাদের জন্য তেমন সুহৃদের অভাব প্রকট।

অস্বীকারে উপায় কি আছে যে আমার বাবা, আপনার বাবা তো কৃষক। কাদা মাটির গন্ধ আজও গায়ে পাওয়া যাবে আমার-আপনার। শহরে এসে প্যান্ট-শার্ট পরে বাবাদের মূল পেশা ভুলে গেলে চলবে না। নিজেকে অনেক কিছুর ঊর্ধ্বে ভাবলেও চলবে না। কৃষকের সন্তানের গৌরবজনক পরিচয় যারা ভুলতে বা ভোলাতে চান, তারা প্রকৃত অর্থে দেশের ভালো চান কি? আর দেশের প্রাণ কৃষকের ভালো যারা চান না, তাদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

আমাদের প্রশাসনযন্ত্র কৃষক-বান্ধব না হওয়ায় কৃষকদের দুর্ভোগ কাটছে না। ঘটছে না তাদের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন। কতভাবে ফসলহানি ঘটে, তা একটু চোখ-কান খোলা রাখলেই সহজে জানা যায়। অতি বৃষ্টি, বন্যা, খরা, পোকামাকড়ের আক্রমণসহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকের ফসলহানি ঘটে প্রায়ই। আর এ ক্ষতি প্রান্তিক কৃষক সহজে কাটিয়ে উঠতে পারেন না। ঋণ নিয়ে বীজ বপনের পর ফসলহানি ঘটলে তখন কৃষকের মাথায় হাত পড়ে।তখন আর ঋণ পরিশোধের সুযোগ থাকে না। চলতি বছর একাধিকবার বন্যা হয়েছে, যে বন্যায় তাদের ব্যাপক ফষলহানি ঘটে। সাস্প্রতিক এ বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের মনে রাখতে হবে।

এই কৃষকরা যেমন আমাদের অন্নের ব্যবস্থা করেন তেমনি তাদের কারণেই জিডিপি বৃদ্ধি পায়। দেশ ও জাতির জন্য এমন কল্যাণ যারা নিরবদি বয়ে আনেন, সে কৃষকদের ঋণ মওকুফ করে দিতে বাধা কোথায়? নীরবে-নিবৃত্তে যারা আমাদের কেবলই উপকার করে, বন্যা-খরায় ফসলহানির পর তাদের এ সুযোগ দেওয়া যৌক্তিক। যাদেরটা খেয়ে আমরা নিয়মিত উদুর ভর্তি করি ও তরতাজা থাকি, তাদের জন্য এ কাজটা নৈতিক দায়িত্ব নয়কি।

প্রতিবেদক : বিশেষ প্রতিনিধি

পিএনএস/জে এ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech