সর্বনাশা ফারাক্কার কুফল : পানির অভাবে সেচকাজ ব্যাহত

  

পিএনএস (মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম প্রধান) : দীর্ঘদিন বৃষ্টি নেই। আকাশে কোলো মেঘের ভেলা ভেসে বেড়ালেও বৃষ্টি আকারে ধরায় ঝরে পড়ছে না। খাল-বিলেও পানি নেই। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় নলকূপেও পানি উঠছে না। ভরসা এখন গভীর নলকূপ। কিন্তু গভীর নলকূপ তো হাতেগোনা। আবার অনেক গভীর নলকূপেও পানি উঠছে না।পানির অভাবে কৃষক ধানের চারা রোপণ করতে না পেরে দিশেহারা।

আমনের পর পানির অভাবে কৃষকরা ধান রোপণ করতে পারছেন না। ইরি ধানের চারা যথাসময়ে করা হলেও পানির অভাবে ইরি ধান চাষ করতে পারছেন না কৃষকরা। দেশের ছোট নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয়গুলো শুকিয়ে যাওয়ায় সেচের পানি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইলের চেত্রা নদীটিতে পানি নেই। নদীটি শুকিয়ে যাওয়ায় পানির অভাবে ফসলি জমিতে সেচ দিতে পারছেন না কৃষকরা। এককালের খরস্রোতা চেত্রা নদীকে এখন দিগন্তজোড়া বালুচর বৈ অন্য কিছু মনে হয় না।নদীটির বেহালদশা দেখে মনেই হয় না এককালে এখনে কোনো নদী ছিল!

ঐতিহাসিক সত্য হলো, নদীমাতৃক বাংলাদেশের জন্ম নদীর পানিতে বয়ে আনা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পলিকণা দ্বারা। লাখো বছরের প্রক্রিয়ায় পলি সঞ্চয় করে নদীই গড়ে তুলেছে ‘ব’ আকৃতির পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম ব-দ্বীপ বাংলাদেশ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে দেশের প্রধান নদীগুলো যৌবন হারিয়ে মরে যেতে বসেছে।

দেশের বড় নদ-নদীগুলো যখন যৌবন হারাচ্ছে তখন শাখা নদী, উপ-নদীগুলো মরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সরকারি তথ্যেই নদ-নদীর সংখ্যা ৭০০ থেকে ৪০৫-এ নেমেছে। বেসরকারি তথ্যে মাত্র ২৩০টির মতো নদ-নদী টিকে আছে।পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে নদ-নদীর সংখ্যা ছিল মূলত সহস্রাধিক।

দেশের নদ-নদীগুলো মরে যাওয়ার অন্যতম কারণ অবৈধভাবে উজানে বাঁধ নির্মাণ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও দখল। সর্বনাশা ফারাক্কাসহ নদীর উজানে ৫৪টি বাঁধ দেওয়ায় আমাদের দেশের নদ-নদীগুলো মরে যাওয়ার বড় কারণ। মূলত মরণবাঁধ ফাক্কার কুফলেই নদ-নদীগুলো মরে যাচ্ছে।


ফারাক্কার প্রভাবে নদ-নদীগুলো তিলে তিলে মরে যাওয়ায় কৃষিপ্রধান উত্তরাঞ্চলে মরুকরণ দেখা দিয়েছে। সেচ চাহিদা মেটাতে হচ্ছে মাটির নিচের পানি তুলে। তাতে বিপদ আরো বাড়ছে। ভূগর্ভের পানির স্তর নিচে নামছে, মাটির গুণাগুণ নষ্ট হচ্ছে। পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটছে। বেড়ে যাচ্ছে সর্বনাশা মরুকরণ প্রক্রিয়া।

নদীমাতৃক বাংলাদেশের এ কী হাল! পুরোপুরি শুকনো মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই পানির অভাবে কৃষক সেচকাজ করতে পারছেন না। মাঘ মাসে এ অবস্থা হলে চৈত্র-বৈশাখ মাসে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে, আন্দাজ করা কঠিন।এ অবস্থায় সচেতন জনগোষ্ঠী যারপরনাই ব্যথিত ও চিন্তিত।

ছোট নদ-নদী, খাল-বিলগুলোয় যখন পানি নেই, প্রকৃতিতে তখন চলছে অনাবৃষ্টিজনিত দীর্ঘকালীন তীব্র খরা। ভূগর্ভের পানির স্তরও আশঙ্কাজনক নেমে যাওয়ায় অনেক গভীর নলকূপেও পানি উঠছে না। ফলে কৃষকরা সেচকাজের মাধ্যমে ধান রোপণ করতে না পেরে দিশেহারা।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে পানির অভাবে কৃষকরা চাষবাস করতে পারছেন না, তা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়। কিন্তু দেশের নদ-নদীগুলোর করুণ হাল দেখলে তা বিশ্বাস হয় বৈকি। এককালের অনেক খরস্রোতা নদ-নদী এখন মরা খালে পরিণত। আর পানির অভাবে খালগুলো শুকিয়ে চৌচির। ফসলের মাঠের অবস্থাও এমনই।

কৃষকরা যেন আর পানির অভাবে না ভোগেন, সফল ফলাতে কষ্ট না হয়; সে জন্য দেশের মৃতপ্রায় নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয়গুলো খনন করা অতীব জরুরি। পাশাপাশি এগুলো দখলমুক্ত করে পানি চলাচল স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দেশ যেমন নদীমাতৃক তেমনি কৃষিপ্রধানও। ফারাক্কার কূফল থেকে নদী, কৃষি ও কৃষককে বাঁচাতে নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয়গুলো বাঁচানো সময়ের দাবি।

প্রতিবেদক : বিশেষ প্রতিনিধি- পিএনএস

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech