পানির নিচে পেঁয়াজের ক্ষেত

  



পিএনএস ডেস্ক: সপ্তাহব্যাপী টানা বৃষ্টিতে পাবনায় রোপণকৃত পেঁয়াজ পচে গেছে। এ অবস্থায় পেঁয়াজের সংকট অব্যাহত থাকার আশঙ্কায় রয়েছেন চাষিরা। দেশের পেঁয়াজ উৎপাদনকারী এলাকাগুলোর মধ্যে পাবনার সুজানগর উপজেলা অন্যতম। সেখানে প্রতিবছর আগাম পেঁয়াজের আবাদ হয়। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে মূলকাটা পেঁয়াজ চাষিদের সর্বনাশ হয়ে গেছে। পদ্মার পানি বেড়ে বন্যার ক্ষতির ধকল কাটিয়ে উঠার আগেই সপ্তাহব্যাপী বৃষ্টিতে রোপণকৃত পেঁয়াজ পচে যায়।

এতে চাষিরা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন। পাশাপাশি প্রতি বছর চারা থেকে উৎপাদিত যে পেঁয়াজ আগেভাগে বাজারে এসে ভারসাম্য রক্ষা করে এবার তা নিয়ে চরম শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এরপরও এই অঞ্চলের পেঁয়াজ চাষিরা নতুন করে জমি তৈরি করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। এরই মধ্যে কেউ কেউ নতুন করে মূলকাটা পেঁয়াজ রোপণ করেছেন।

চাষিরা জানান, সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে আগাম পেঁয়াজ জমিতে রোপণ করা হয়েছিল। কিন্তু এবার সপ্তাহব্যাপী বৃষ্টিতে পেঁয়াজের চারা পচে গেছে। অনেক পেঁয়াজ ক্ষেত পানির নিচে। এতে মাথায় হাত পড়েছে চাষিদের।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আজাহার আলী বলেন, এবার পাবনার ৯ উপজেলায় ৩৯ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে মূলকাটা পেঁয়াজের লক্ষ্যমাত্রা ৯ হাজার ৭৬৫ হেক্টর। এতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৫ লাখ ৩৬ হাজার ৮৬৫ মেট্রিক টন। মূলকাটা পেঁয়াজের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১ লাখ ২২ হাজার ৩৮৮ মেট্রিক টন।

আজাহার আলী বলেন, জেলার সুজানগর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। কাজেই ৯ উপজেলার মধ্যে শুধুমাত্র সুজানগরে ১ লাখ ২২ হাজার ৩৮৮ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে মূলকাটা পেঁয়াজ রোপণ করা হয় এবং চারার পেঁয়াজ বাজারে আসার দুই মাস আগেই মূলকাটা পেঁয়াজ বাজারে আসে। আগাম এই পেঁয়াজ চাষ করে কৃষক একদিকে যেমন লাভবান হন অন্যদিকে এই পেঁয়াজ বাজারের ভারসাম্য রক্ষা করে। কিন্তু এবার সে সম্ভাবনা ভেস্তে গেল।

স্থানীয় সূত্র জানায়, পদ্মায় আকস্মিক পানি বেড়ে জমি জলমগ্ন হওয়ায় প্রথম দফায় ক্ষতির মুখে পড়েন কৃষকরা। পানি নেমে গেলে এক সপ্তাহের মধ্যে জমিতে পেঁয়াজ রোপণ শুরু করেন তারা। এরই মধ্যে ২৩ অক্টোবর থেকে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে টানা কয়েকদিন বৃষ্টি হওয়ায় জমিতে রোপণকৃত পেঁয়াজের জমিতে পানি জমে যায়। পচন ধরে রোপণকৃত পেঁয়াজে। এতে ব্যাপক ক্ষতির শিকার হন কৃষকরা।

সুজানগর উপজেলার ভায়না ইউনিয়নের চর বিশ্বনাথপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল বারেক বলেন, ৪ হাজার ২০০ টাকা করে সাত মণ পেঁয়াজ কিনে এক বিঘা জমিতে রোপণ করেছিলাম। গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে সব পেঁয়াজ পচে গেছে। এখন আর কিছুই করার নেই। এবার আগাম পেঁয়াজ বাজারে তুলতে পারবে এখানের কৃষকরা।

উপজেলার চরভবানীপুর এলাকার কৃষক ইউনুস আলী বলেন, মূলকাটা পেঁয়াজ রোপণের জন্য জমি চাষ করে প্রস্তুত করেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ টানা বৃষ্টিতে জমিতে পানি জমে যাওয়ায় আগামী ১৫ দিনেও পেঁয়াজ রোপণ সম্ভব হবে না।

একই এলাকার কৃষক আকবর হোসেন বলেন, এই অঞ্চলের কৃষকরা প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু করে অক্টোবর মাস পর্যন্ত মূলকাটা পেঁয়াজ রোপণ করেন। এবার বন্যার কারণে সঠিক সময়ে পেঁয়াজ রোপণ করতে পারেননি কৃষকরা। বন্যার ধকল কাটিয়ে শেষ সময়ে যখন মূলকাটা পেঁয়াজ রোপণ করা হয় তখন টানা বৃষ্টি তা নষ্ট করে দিয়েছে।

আহম্মদপুর ইউনিয়নের বোয়ালিয়া গ্রামের সফল পেঁয়াজ চাষি রাসেল হোসেন বলেন, বৃষ্টিতে ১০ বিঘা জমির পেঁয়াজ পচে গেছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার পেঁয়াজের দাম বেশি। সবার আশা ছিল আগাম পেঁয়াজ বাজারে এলে দাম কমবে। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আগামী দুই মাসের মধ্যে দাম কমার সম্ভাবনা নেই।

সুজানগর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা ময়নুল হক সরকার বলেন, প্রতি বছর এই উপজেলার কৃষকরা মূলকাটা পেঁয়াজ রোপণের দুই মাস পরই অর্থাৎ ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে বিক্রি শুরু করেন। এ বছর সুজানগর উপজেলায় মূলকাটা পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল এক হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে। কিন্তু অসময়ের বৃষ্টিতে রোপণকৃত পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে এবার লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না। এরপরও নতুন করে পেঁয়াজ রোপণের চেষ্টা করছেন কৃষকরা।

সুজানগর প্রেস ক্লাবের সভাপতি শাহজাহান আলী বলেন, এবার বন্যার কারণে পেঁয়াজ রোপণ করতে দেরি হয়েছে কৃষকদের। শেষ সময়ে যখন রোপণ শেষ হলো তখন টানা বৃষ্টি শেষ করে দিয়েছে পেঁয়াজের আবাদ। এমনিতেই পেঁয়াজের আকাশছোঁয়া দাম, তার ওপর নষ্ট হয়ে গেছে আগাম পেঁয়াজের আবাদ। মনে হয় না আর পেঁয়াজের দাম কমবে।

পিএনএস/ হাফিজুল ইসলাম

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech