খেজুর গাছ বিলুপ্তির পথে!

  

পিএনএস, পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি : খুলনার পাইকগাছায় বেশিরভাগ ফসলী জমিতে মৎস্য মাছ চাষ করায় খেজুর গাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে। যদিও দু’চারটি খেজুর গাছ নজরে পড়ে তাও পরিচর্চা করার লোক সংকট।

ঋতুর পালাবদলে শরৎ কে বিদায় জানিয়ে চলছে শীত। সকালের দুর্বাঘাস ও পাতা-পল্লবেও এসেছে শিশিরের ছোঁয়া। শুরু হয়েছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যের প্রতীক খেজুর গাছ পরিচর্চা করে রস সংগ্রহের কাজ। ৯০‘র দশকের আগ পর্যন্ত খুলনার দক্ষিণে উপজেলা পাইকগাছা-কয়রা প্রান্তর জুড়ে যতদূর চোখ যেত, ছিল সবুজের সমারোহ। সবুজেশ্যামলে ভরে থাকত সারা মাঠ। ক্ষেতের ভেঁড়ি বা আইল দিয়ে সারি সারি দেখা মিলত হাজার হাজার খেজুর গাছ, কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সবকিছুই যেন অতীত। আর এখন প্রান্তর জুড়ে ধানের পরিবর্তে চাষ হচ্ছে লবণ পানিতে চিংড়ি। নগরায়নের প্রতিযোগীতায় ইট ও টালীর ভাটা বিরামহীণ গতিতে গিলে খাচ্ছে। শীতের সকালে সোনালী রৌদের সাথে মিষ্টি খেজুরের রসের স্বাদও যেন তাই আজ ভুলতে বসেছে চিরচেনা জনপদের মানুষরা। তবুও যেখানে যে গাছগুলো এখনও নিরবে দাঁড়িয়ে আছে সেগুলোকে নিয়েই যেন গাছিদের শুরু হয়েছে অন্য রকম ব্যস্ততা। এ অঞ্চলে ছোট বড় মিলে অসংখ্য লবণ পানির চিংড়ি মাছের ঘের রয়েছে। মাটির উর্বরতা শক্তি হ্রাস পেয়ে বেড়ে গেছে অম্লতা। বছরের সারাটা সময় জুড়ে একদিকে যেমন খেজুর গাছের প্রতি ভাটা সমূহের চোখ রাঙানি অন্যদিকে পরিবেশ বিপর্যয়ে গাছের অকাল মৃত্যু। সব মিলিয়ে জনপদ থেকে সাবাড় হয়েই চলেছে মিষ্টি রসের অফুরন্ত ভান্ডার খেজুর গাছ। তাই গাছের সাথে সাথে গাছিরাও যেন তাদের পেশা পরিবর্তন করে চলে গেছে অন্য পেশায়। কোনো কোনো এলাকায় গাছ পরিচর্চা যারা এখনও বাপ-দাদার পেশা আঁকড়ে ধরে আছেন, তাদেরও যেন যায় যায় অবস্থা। এ প্রসঙ্গে কথা হয় প্রবীণ গাছি সবুর মোড়লের সাথে। কেমন যাচ্ছে তার দিন-কাল এমন প্রশ্ন করতেই যেন বড় একটা দীর্ঘশ্বাস, তার পর ছল-ছল চোখে বললেন, এদিক এখন খেজুর গাছ কই? সব তো প্রায় শেষ, তাই আমরা ভালো নেই, তারপরও মাঠের দিকে যাচ্ছি, দু-একটা আছে সেগুলো যদি কাটতি পারি!’

প্রসঙ্গত, খেজুর গাছের অগ্রভাগের একটি নির্দিষ্ট অংশ চিরে বিশেষ ব্যবস্থায় ছোট কলসি (ভাড়) বাঁধা হয়। ফোঁটায় ফোঁটায় রসে পূর্ণ হয় সে কলসি। তাই রসের সন্ধানে খেজুর গাছ তোলা কাটাসহ বিভিন্ন রকমের পরিচর্চায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন গাছিরা। যদিও এখন গাছিরা গাছিনী বা তাদের বউদের ছন্দ বা গানের সুরে বলেনা ‘ঠিলে ধুয়ে দে-রে বউ গাছ কাটতে যাব’। ছোট হোক বা বড়, খেজুর গাছে বেশ ঝুঁকি নিয়েই পরিচর্চা করতে হয়। কোমরে মোটা রশি বেঁধে গাছে ঝুলে গাছ তোলার কাজ করতে হয়। এছাড়া রস সংগ্রহের পাত্র ভাঁড়, ঠিলে বা কলস প্রস্তুত করতেও তা নিয়মিত আগুনে পোড়াতে হয়। এলাকাবাসী খেজুর গাছ উজাড়ের জন্য সবচেয়ে বেশী দায়ী করেছেন এলাকার ইট ও টালির ভাটা মালিকদেরকে, কেননা খেজুর গাছের চাহিদাটা ভাটা গুলোতেই বেশী। এছাড়া প্রান্তর জুড়ে চিংড়ি চাষ হওয়ায় ঘের প্রস্তুত করতে খেজুর গাছ কাটতে হয়। নানান কারণে তাই যেন আজ গ্রাম-বাংলা থেকে বিলুপ্ত হতে চলেছে খেজুর গাছ। জানা যায়, যশোর জেলার পর এজনপদেই বেশী পরিমাণ খেজুর গাছ ছিল। তাই রসের পাশাপাশি চাহিদা অতিরিক্ত গুড়ও উৎপাদিত হত এখান থেকে। বর্তমানে এলাকায় খেজুর গাছের দেখা কম মিললেও বছরের প্রায় সারাটা সময় জুড়ে কৃত্রিম পন্থায় চিনি জ্বালিয়ে তৈরি হয় খেজুরের গুড় বা পাটালি। আমাদের গ্রাম বাংলায় অতীতে খেজুর রসের যে সুখ্যাতি ছিল তা যেন ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। একটা সময় ছিল যখন খেজুরের রস বিহীন শীতের সকালই জমতো না। সকালের স্বোনালী রৌদে বসে মগ, প্লাস বা ঘটে করে মিষ্টি রসের চুমুক না হলে যেন খালি খালি লাগত। সান্ধ্য বা সেজো রস ছিল যেন আরো মজাদার। খেজুরের গুড় রসনা বিলাসি বাঙালীর সংস্কৃতিরই যেন একটা অংশ বলে মনে করেন স্থানীয়রা। প্রতিটি ঘরে খেজুরের রস দিয়ে পিঠা-পুলি-পায়েস তৈরীর ধূম পড়বে। ঢেঁকি ঘরে চাল কুটার ধুম পড়ে যাবে, শোনা যাবে ঢেঁকির ঢক ঢক শব্দ।

পিএনএস/এসআইআর

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন