ভয়াবহ ঋণ অনিয়মে রূপালী ব্যাংক

  

পিএনএস: রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক নজিরবিহীন অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করেছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী একক ব্যক্তি খাতে ব্যাংকের মোট মূলধনের ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ফান্ডেড ঋণ (নগদ ঋণ) দেয়া যায়। কিন্তু মেসার্স মাদার টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড নামে গাজীপুরের একটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রায় ৬৭৩ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে, যা মূলধনের প্রায় ৫৯ শতাংশ। এতে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে ব্যাংকের মূলধন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, এই ঋণ বিতরণে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম ও ব্যাংক কোম্পানি আইন লংঘন করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ঋণ ইস্যুকারী শাখা (স্থানীয় কার্যালয়) মোট ৫০২ কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ করতে পারে না। কিন্তু সেখানে ঋণ দেয়া হয়েছে সীমার অনেক বেশি। এ ঘটনায় দায়-দায়িত্ব চিহ্নিত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে ৪ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এ তথ্য।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, এই ঋণের বিপরীতে জামানতের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। মাদার টেক্সটাইল থেকে জামানত গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যাংক ব্যবস্থাপনা কর্তৃক নিয়ম লংঘন করা হয়েছে। ঋণ বিতরণেও গুরুতর অনিয়ম হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিআরপিডির সার্কুলার ভঙ্গ করে ঋণ দেয়া হয়েছে। এছাড়া বিধিবহির্ভূতভাবে এই প্রতিষ্ঠানকে ওভারড্রাফট (ওডি) ঋণ ও আইপিবি সুবিধা দেয়ার জন্য রূপালী ব্যাংককে কঠোরভাবে সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. ইউনুসুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, একক ব্যক্তি হিসেবে ব্যাংকের মোট মূলধনের ১৫ শতাংশের বেশি ফান্ডেড ঋণ দেয়া হলে এটি অনিয়ম। যদি ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ ধরনের ঋণ অনুমোদন করা হয় তাহলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চিঠি ও তদন্ত প্রতিবেদন আমার কাছে এখনও আসেনি। আসার পর এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

এ বিষয়ে রূপালী ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. আতাউর রহমান প্রধান যুগান্তরকে বলেন, নতুনভাবে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে সে ব্যাপারে খেয়াল রাখা হচ্ছে। এখন চাইলে সব টাকা একসঙ্গে গ্রাহকের কাছ থেকে ফেরত আনা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ব্যাংকের মূলধন বেশি থাকার সময় হয়তো ঋণটি দেয়া হয়। এখন মূলধন কমে যাওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই ঋণটি দেয়া হয়েছে আগের ব্যবস্থাপনা পরিচালনা পর্ষদের সময়।

যোগাযোগ করা হলে মাদার টেক্সটাইল মিলসের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুলতান আহমেদ ঋণ অনিয়ম অস্বীকার করে বুধবার যুগান্তরকে বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্ত বা অভিযোগ সঠিক নয়। এই ঋণের বিপরীতে দ্বিগুণ জামানত ব্যাংকে জমা আছে। তাও আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে। তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতা বুঝে আবার অনেক ক্ষেত্রে না বুঝে সার্কুলার দিয়ে থাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে সমস্যা হয় উদ্যোক্তাদের।

একক সীমার চেয়ে ঋণ বেশি : ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী একক ব্যক্তি খাতে ঋণসীমা নির্ধারিত। এতে ব্যাংকের মোট মূলধনের ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ফান্ডেড এবং ২০ শতাংশ নন-ফান্ডেড ঋণ দেয়ার বিধান রয়েছে। ফান্ডেড ঋণ হিসেবে মাদার টেক্সটাইল ঋণ পেতে পারে সর্বোচ্চ প্রায় ১৭১ কোটি টাকা। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে মোট ঋণের পরিমাণ হচ্ছে প্রায় ৬৭৩ কোটি টাকা। অপরদিকে ব্যাংকের মোট মূলধনের পরিমাণ হচ্ছে ১১৩৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাদার টেক্সটাইলকে দেয়া ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ব্যাংকের মূলধনের ৫৯ দশমিক ১৭ শতাংশ।

জামানতের ঘাটতি : এদিকে জামানতের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও মাদার টেক্সটাইলকে বিপুল অংকের ঋণ দিয়েছে রূপালী ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে তা উঠে আসে। ঋণের বিপরীতে জামানতের তাৎক্ষণিক বিক্রয় মূল্য একটি সার্ভে কোম্পানির মাধ্যমে নিরূপণ করে মাদার টেক্সটাইল মিলস। সেখানে বন্ধককৃত ২৫ একর জমি এবং প্রকল্পে অবস্থিত ইমারত ও যন্ত্রপাতির মোট মূল্য দেখানো হয় প্রায় ৫৯৪ কোটি টাকা। পাশাপাশি একই জামানতের তাৎক্ষণিক বিক্রয় মূল্য ব্যাংকের মাধ্যমে নিরূপণ করে পাওয়া গেছে ৩১৬ কোটি টাকা। কিন্তু মাদার টেক্সটাইলকে ফান্ডেড ও নন-ফান্ডেড মিলে মোট ঋণ দেয়া হয়েছে প্রায় ৭৪২ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব হিসাবে জামানত ঘাটতির পরিমাণ হচ্ছে প্রায় ১৪৮ কোটি টাকা। পাশাপাশি ব্যাংকের হিসাবে ঘাটতি ৪২৫ কোটি টাকা।

এছাড়া রূপালী ব্যাংকের শিল্প ঋণ বিভাগের সার্কুলার অনুযায়ী গ্রাহক বা প্রতিষ্ঠানের একক মালিকানাধীন সম্পত্তির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ঋণের পরিমাণ হবে সম্পত্তির তাৎক্ষণিক বিক্রয় মূল্যের ৭৫ শতাংশ এবং তৃতীয় পক্ষের মালিকানাধীন সম্পত্তির ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ। ওই হিসাবে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব কোম্পানি কর্তৃক জামানতের তাৎক্ষণিক বিক্রয় মূল্য ৫৯৪ কোটি টাকার ৭৫ শতাংশ অর্থাৎ ৪৪৫ কোটি টাকা ঋণ পেতে পারে। ফলে ব্যাংকের নিজস্ব সার্কুলার অনুযায়ী মাদার টেক্সটাইলের জামানত ঘাটতি হচ্ছে (৭৪২ কোটি টাকা-৪৪৫ কোটি টাকা) ২৯৭ কোটি টাকা।

ঋণ আদায় নিয়ে অনিশ্চয়তা : প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৯, ২০১১, ২০১৩ ও ২০১৫ সালের নেয়া ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ গ্রাহকের মোট স্থিতি প্রায় ৬৩৫ কোটি টাকা ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর এবং ২০৩০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পুনঃতফসিল করেছে। ফলে ৫টি ঋণের কিস্তি ২০২২ সাল পর্যন্ত এবং বাকি ৫টি ঋণের কিস্তি পরিশোধের মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়। পুনঃতফসিলের কারণে ঋণ আদায় ধীরগতির চক্রে পড়ে যাবে বলে আশংকা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এভাবে বারবার ঋণ পুনঃতফসিলের কারণে আদায় অনিশ্চিত হতে পারে। এজন্য ডাউন পেমেন্টের কিস্তির পরিমাণ, ঋণ পরিশোধের মেয়াদ এবং প্রথম কিস্তি পরিশোধের তারিখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পুনঃতফসিল ঋণ আদায়ে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে তা যথাযথ বিশ্লেষণ করতে পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এছাড়া ২০১৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ১০ কোটি টাকার সাময়িক ওভারড্রাফট (ওডি) ঋণ সুবিধা দেয়া হয়। এর মেয়াদ ছিল একই বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। যদিও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামানতসহ অর্পিত ক্ষমতাবলে সর্বোচ্চ ৩ কোটি টাকা প্রদান করতে পারেন। এক্ষেত্রে ক্ষমতাবহির্ভূতভাবে ১০ কোটি টাকার ওডি ঋণ দেয়া হয়েছে।

অপরদিকে ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী কোনো গ্রাহকের আইবিপি মেয়াদোত্তীর্ণ থাকলে পুনরায় তাকে আইবিপি সুবিধা দেয়া যাবে না। কিন্তু মাদার টেক্সটাইলের নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ১৩টি মেয়াদোত্তীর্ণ আইবিপির বিপরীতে ১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ছিল। এরপরও এ গ্রাহককে ২ কোটি ৪২ লাখ টাকার নতুন আইবিপি সুবিধার অনুমোদন দেয়া হয়। মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও নতুন এই সুবিধা প্রদানে ব্যাংকের নিজস্ব সার্কুলার লংঘন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।


পিএনএস/বাকিবিল্লাহ্

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech