এলটিইউ থেকে বাদ পড়ছে শীর্ষস্থানীয় অনেক প্রতিষ্ঠান

  



পিএনএস ডেস্ক: ২০১৩ সালেও প্রায় ৭১ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করে ন্যাশনাল টিউবস লিমিটেড। ২০১৬ সালে তা নেমে আসে মাত্র ২৬ কোটি টাকায়। এতে কমে যায় পণ্য বিক্রির বিপরীতে ভ্যাট পরিশোধের পরিমাণও। কয়েক বছর আগেও ন্যাশনাল টিউবস বার্ষিক ১০-১২ কোটি টাকা ভ্যাট পরিশোধ করলেও সর্বশেষ হিসাব বছরে দিয়েছে মাত্র ২ কোটি ১৪ লাখ টাকা।

ব্যবসায়িক মন্দার কারণে ভ্যাট পরিশোধ অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় ন্যাশনাল টিউবসকে বৃহত্ করদাতার তালিকা থেকে বাদ দেয়ার প্রস্তাব করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বৃহত্ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ)। কারণ এনবিআরের নিয়ম অনুযায়ী, ৫ কোটি টাকার নিচে ভ্যাট পরিশোধকারী কোম্পানির এলটিইউর তালিকায় থাকার সুযোগ নেই।

ব্যবসায়িক মন্দায় ভ্যাট পরিশোধ ৫ কোটি টাকার নিচে নেমে আসায় শীর্ষস্থানীয় আরো বেশকিছু প্রতিষ্ঠানও এলটিইউ তালিকা থেকে বাদ পড়তে যাচ্ছে। এনবিআর সূত্রমতে, একমি এগ্রোভেট অ্যান্ড বেভারেজ, লিবরা ইনফিউশন, পারটেক্স ফার্নিচার, স্টার পার্টিকেল, বসুন্ধরা পেপার মিলস নিউজপ্রিন্ট ইউনিট, মিরাকল ইন্ডাস্ট্রিজ, অটবি ফার্নিচার, গ্লোবাল হেভি কেমিক্যাল লিমিটেড, মিউচুয়াল গ্রুপ ও অ্যাপোলো ইস্পাতের দুই ইউনিট এর মধ্যে অন্যতম।

এলটিইউ কমিশনার মতিউর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, এনবিআরের স্থায়ী আদেশ ০১/মূসক/২০১২ অনুযায়ী, তিন বছর ধরে বার্ষিক ন্যূনতম ৫ কোটি টাকার ভ্যাট পরিশোধ করলে তাদের এলটিইউর অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। বর্তমানে এলটিইউতে ১৬০টি প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত থাকলেও ৩২টি প্রতিষ্ঠান এর বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে যাচ্ছে না। কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা ব্যবসা মন্দার কারণে ৫ কোটি টাকা ভ্যাট পরিশোধ করতে পারছে না। কিছু প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা বন্ধও হয়ে গেছে। এসব প্রতিষ্ঠান বাদে ৫ কোটি টাকার বেশি ভ্যাট পরিশোধকারী নতুন প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব করা হয়েছে।

ব্যবসায়িক মন্দায় ভ্যাট পরিশোধ ৫ কোটি টাকার নিচে নেমে এসেছে এলটিইউর তালিকাভুক্ত অ্যাপোলো ইস্পাত কমপ্লেক্সের সিআর কয়েল ইউনিট ও স্টিল ইউনিট-২ এর। অ্যাপোলো ইস্পাতের এ দুটি ইউনিট সর্বশেষ ২০১৬-১৭ অর্থবছর ভ্যাট পরিশোধ করেছে ১ কোটি টাকা। যদিও তার আগের অর্থবছর দুই প্রতিষ্ঠান মিলে সাড়ে ১২ কোটি টাকা ভ্যাট পরিশোধ করেছিল। ব্যবসার ধরন পরিবর্তন ও মন্দার কারণে ভ্যাট কমে গেছে বলে এনবিআরের তরফ থেকে বলা হলেও রডের ওপর ট্যারিফ ভিত্তিতে ভ্যাট আদায় ও কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়ায় এমনটি হয়েছে বলে দাবি কোম্পানিটির।

অ্যাপোলো ইস্পাতের কোম্পানি সচিব সোহেল আমিন বলেন, সিআর কয়েল ইউনিটের বিক্রি কমিয়ে নিজেদের কারখানায় ব্যবহার বাড়ানোয় ভ্যাট পরিশোধ কমেছে। পাশাপাশি সর্বশেষ হিসাব বছরে কয়েকটি আমদানি আদেশ বাতিল হওয়ায় স্থানীয় কাঁচামালে পণ্য উত্পাদন হয়েছে। এতে এনবিআরকে ভ্যাট পরিশোধ কম হয়েছে।

এলটিইউর তালিকা থেকে বাদ পড়তে যাওয়া আরেক কোম্পানি লিবরা ইনফিউশন। সর্বশেষ অর্থবছর ২৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা বিক্রির বিপরীতে ৪ কোটি ৫ লাখ টাকা ভ্যাট পরিশোধ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। যদিও ২০১১ সালে কোম্পানিটির বার্ষিক টার্নওভার ছিল ৩৭ কোটি ৯২ লাখ টাকা।

এলটিইউর বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে যাচ্ছে না একসময় বড় অংকের ভ্যাট পরিশোধ করে আসা পারটেক্স গ্রুপের দুই প্রতিষ্ঠান— পারটেক্স ফার্নিচার ও স্টার পার্টিকেল বোর্ড। সর্বশেষ তিন বছরে পারটেক্স ফার্নিচার গড়ে ৩ কোটি ও স্টার পার্টিকেল ৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা করে ভ্যাট পরিশোধ করেছে। গত বছরের শেষ দিকে কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে স্টার পার্টিকেল বোর্ড। তবে দুই প্রতিষ্ঠানই নতুন করে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বলে জানান এর কর্মকর্তারা।

ব্যবসা মন্দায় আছে আসবাব খাতের এক সময়ের বৃহত্ প্রতিষ্ঠান অটবি লিমিটেড। মূল উদ্যোক্তা নিতুন কুন্ডুর মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে ব্যবসায়িক মন্দায় পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১১ সালে বিদ্যুতে বিনিয়োগ করে লোকসান ও ২০১৪ সালে সাভারে কারখানায় আগুন লাগার পর ব্যবসায় পিছিয়ে পড়েছে তারা। গত তিন বছরে গড়ে ২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা করে ভ্যাট পরিশোধ করেছে কোম্পানিটি।

বসুন্ধরা পেপার মিলের তিন ইউনিটের মধ্যে নিউজপ্রিন্ট ইউনিটটির ভ্যাট পরিশোধ ৫ কোটি টাকার নিচে নেমে এসেছে। নিউজপ্রিন্টের চাহিদা কমে যাওয়া ও আমদানিনির্ভরতায় পণ্য বৈচিত্র্যে মনোযোগ দিয়েছে বসুন্ধরা গ্রুপ। পেপার মিলের মূল ইউনিট ও টিস্যু পণ্যের উত্পাদন বাড়িয়ে এটি কমিয়েছে কোম্পানিটি। ফলে কাঙ্ক্ষিত ভ্যাট না পেয়ে নিউজপ্রিন্ট ইউনিটটিকে এলটিইউ থেকে বাদ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। আইপিও প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, ২০১৩ সালে এ ইউনিটের উত্পাদন ছিল ৫৯ হাজার টন, ২০১৫ সালে তা ৩৬ হাজার টনে নেমে আসে।

মিরাকল ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবসা না কমলেও প্রবৃদ্ধি সংকটে রয়েছে কোম্পানিটি। সর্বশেষ তিন বছরে এনবিআরকে গড়ে ১৬ লাখ টাকা করে ভ্যাট পরিশোধ করেছে তারা। এছাড়া ২০১২-১৩ সালে গড়ে ৭-৮ কোটি টাকা ভ্যাট পরিশোধ করেছিল দিপা ফুড প্রডাক্টস ও ফারজানা অয়েল রিফাইনারিজ। গত তিন বছরে তা ৫ কোটি টাকার নিচে নেমে আসায় এ তিন প্রতিষ্ঠানকেও তালিকা থেকে বাদ দেয়ার প্রস্তাব করেছে এলটিইউ।

ব্যবসায়িক মন্দার কথা স্বীকার না করলেও ভ্যাট পরিশোধে ধারাবাহিক নয় একমি এগ্রোভেট অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড। গত তিন বছরে বার্ষিক গড়ে ২ কোটি ৫১ লাখ টাকা ভ্যাট পরিশোধ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। যদিও কয়েক বছর আগে প্রতিষ্ঠানটি এর কয়েক গুণ ভ্যাট পরিশোধ করত বলে জানিয়েছেন এনবিআর কর্মকর্তারা।

ভ্যাট পরিশোধে বেশ পিছিয়ে পড়েছে মিউচুয়াল গ্রুপও। গ্রুপের মিউচুয়াল ফুড প্রডাক্টস ও মিল্ক প্রডাক্টস ইউনিট গত তিন বছরে ভ্যাট পরিশোধ করেছে গড়ে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা করে।
উল্লেখ্য, বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজস্ব আহরণ সহজ করতে ও বৃহত্ করদাতাদের বেশি সেবা দিতে ২০০৪ সালে এলটিইউ গঠন করা হয়। বিভিন্ন খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এর অন্তর্ভুক্ত করা হয় সে সময়। এর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানের টার্নওভার ও ভ্যাট পরিশোধের পরিমাণ শুরু থেকেই কম ছিল। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান শুরুতে বড় ধরনের ভ্যাট পরিশোধ করলেও ব্যবসা মন্দায় এলটিইউর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এখন আর তা পারছে না। সূত্র: বণিক বার্তা

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech