চাকরির বাজারে হুমকি রোবট!

  


পিএনএস ডেস্ক: মানব শ্রম আর অফুরন্ত কাঁচামালের কল্যাণে আঠার শতকের মাঝামাঝিতে বিশ্বজুড়ে যে শিল্প বিপ্লবের সূচনা একুশ শতকে এসে তা এখন পরিপূর্ণ ডিজিটাল রূপায়ণের দিকে যাচ্ছে। আর এতে মানুষ নয়, নির্ভরতার বড় উৎস হয়ে উঠছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা রোবট।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহার হচ্ছে রোবট। এতে কম্পানিগুলোর একদিকে যেমন ব্যয় সাশ্রয় হচ্ছে অন্যদিকে কাজের গতিও বাড়ছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে অদক্ষ চাকরি থেকে শুরু করে এমনকি জ্ঞানভিত্তিক উচ্চ দক্ষতার চাকরিও এখন রোবটের কাছে হাতছাড়া হচ্ছে।

উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, স্বচালিত প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পথে অনেকটাই সফল কম্পানিগুলো। অদূর ভবিষ্যতে আর ট্যাক্সি ভাড়া করতে হবে না, কিংবা বাস, ট্রাক চালাতে চালকের প্রয়োজন হবে না। রেস্টুরেন্ট-শপিং মলে মানুষকে স্বাগত জানাচ্ছে রোবট, চিকিৎসাক্ষেত্রে রোবটিক সার্জারির অগ্রগতি এবং ক্যান্সার শনাক্তকরণ ও হার্টের পরিস্থিতি বুঝতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে ৭০০ পেশার মধ্যে ৪৭ শতাংশ স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে উচ্চ ঝুঁকিতে। চলতি বছর ম্যাককিনসে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে প্রযুক্তির যে অগ্রগতি চলছে তাতে বিশ্বের অর্ধেক কাজই একসময় স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি দ্বারা সম্পাদিত হবে। তবে ম্যাককিনসের গবেষকরা এখনো মনে করেন বিশ্বের মাত্র ৫ শতাংশ চাকরি পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় হবে।

পিডাব্লিউসির আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও ব্রিটেনে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ চাকরি স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে শেষ হয়ে যাবে। বিশেষ করে পরিবহন, গুদামজাতকরণ, ম্যানুফ্যাকচারিং এবং পাইকারি ও খুচরা বাজারে চাকরি বেশি লোপ পাবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি বিশ্বের শ্রমশক্তিতে কী পরিমাণ প্রভাব ফেলবে তা এসব প্রতিবেদনে এখনো পুরোপুরি উঠে আসেনি। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা এবং সিলিকন ভ্যালিতে কারনেগি মেলন ইউনিভার্সিটির অনুষদ সদস্য ভিভেক ওয়াদওয়া বলেন, ‘এসব গবেষণায় কর্মসংস্থানে প্রযুক্তির প্রভাবকে এখনো ছোট করে দেখা হচ্ছে। আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ চাকরি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। ’

গত বছর ওয়ার্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডাব্লিউইএফ) এক পূর্বাভাসে বলা হয়, রোবট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জাগরণে শ্রমবাজার থেকে অন্তত ৫১ লাখ মানুষ চাকরি হারাবে। আগামী পাঁচ বছরে বিশ্বের শীর্ষ ১৫ দেশ থেকে এ কর্মসংস্থান হারানোর ঘটনা ঘটবে।

সম্প্রতি সিঙ্গাপুরের রাস্তায় নেমেছে চালকবিহীন ট্রাক। সিঙ্গাপুরের জুরং আইল্যান্ডে কেমিক্যাল শিল্প এলাকায় ট্রাকটি পণ্য পরিবহন শুরু করেছে। ক্যাটোয়েন নাটি নামক শিল্প কম্পানিটি জানায়, তারা ছয় মাস পরে আরো ১১টি চালকবিহীন ট্রাক কাজে লাগাবেন পণ্য পরিবহনে। ১২টি ট্রাকের মাধ্যমে বছরে ৩০ লাখ টন পণ্য পরিবহন করা যাবে। ক্যাটোয়েন নাটির সিইও কয়েন কারডন বলেন, চালকবিহীন ট্রাক নামানোর ফলে কম্পানির খরচ যেমন কমবে তেমনি সক্ষমতাও বাড়বে।

জাপানের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক মিজুহু ফিন্যানশিয়াল গ্রুপ তাদের বৈশ্বিক কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। কম্পানিটি দেশ ও বৈশ্বিক কার্যক্রম থেকে এক-তৃতীয়াংশ কর্মী ছাঁটাই করবে আগামী এক দশকে। আর তার স্থলাভিষিক্ত করা হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। জাপানের স্থানীয় দৈনিক ইয়োমিউরি পত্রিকা জানায়, বর্তমানে থাকা ৬০ হাজার কর্মী থেকে ১৯ হাজার কর্মী ছাঁটাই করবে ব্যাংকটি। এ নিয়ে কম্পানির এক মুখপাত্র বলেন, ক্লারিক্যাল চাকরিগুলো আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অন্যান্য প্রযুক্তি দিয়ে পূরণ করব।

যন্ত্রমানব নিয়ে মানুষ যখন উদ্বেগে। সে আশঙ্কার পক্ষে আরো এক ধাপ এগিয়ে মত দিয়েছেন চীনা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আলীবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা। সম্প্রতি চীনের একটি বাণিজ্যিক সম্মেলনে দেওয়া এক বক্তব্যে জ্যাক মা বলেন, ‘৩০ বছরের মধ্যেই প্রাতিষ্ঠানিক খাতে সেরা সিইও বিবেচনায় টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদের দখল নিতে যাচ্ছে কোনো রোবট। ’

এ সময় যারা প্রযুক্তির আসন্ন উত্থানকালের প্রস্তুতি নিয়ে রাখেনি তাদের সামনে অন্ধকার ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আগামী তিন দশকের মধ্যেই পৃথিবীতে আনন্দের চেয়ে নিরানন্দ অনুভূতিই বেড়ে যাবে অনেকখানি। ’

জ্যাক মা বলেন, ‘মানুষের তুলনায় রোবটরা অনেক দ্রুতগতিসম্পন্ন ও বিচক্ষণ। তারা কখনো প্রতিযোগীদের ওপর রেগে গিয়ে আবেগতাড়িত কোনো কর্মকাণ্ডেও লিপ্ত হবে না। মানুষের অসাধ্য কাজগুলোকে সহজসাধ্য করে তুলবে যন্ত্র। এসব যন্ত্র একই সঙ্গে মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রুতে রূপান্তরিত হওয়ার বদলে মানুষের সহযোগীই হয়ে উঠবে। ’

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্বকে বদলে দেবে, যেমনিভাবে বিশ্বে বড় পরিবর্তন এনে দিয়েছে যুগান্তকারী ইন্টারনেট। এ মন্তব্য করেছে এনভিআইডিআইএর অংশীদার সংস্থা ইএমইএর ভিপি রিচার্ড জ্যাকসন। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী থেকে আধুনিক ব্যবসা বাণিজ্যে নেমে এসেছে। বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দৈনন্দিন ব্যবসায় এখন এটিকে কাজেও লাগাচ্ছে।

জ্যাকসন বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু নিজে একটি শিল্প হবে না, বরং প্রতিটি শিল্পের আবশ্যকীয় অংশে পরিণত হবে। প্রথম অবস্থায় এটিকে গ্রহণ করা নিয়ে অনেকেই দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগতে পারে। অনেক প্রতিষ্ঠান তাকিয়ে আছে অন্যরা কিভাবে এটিকে কাজে লাগাচ্ছে তা দেখতে। বিষয়টি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। ইন্টারনেট যখন প্রথমে আসে তখনো অনেকেই এর ব্যবহার ঠিকভাবে করে উঠতে পারেনি। আর এখন ইন্টারনেট ছাড়া ব্যবসা কল্পনা করা যায়। তেমনিভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও আমাদের কাছে ক্রমান্বয়ে অপরিহার্য হয়ে উঠছে। মানুষের কাজের ধরন বদলে দেবে এটি। এএফপি, রয়টার্স।

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech