কানার হাতে কুড়াল পড়লে যা হয়…

  

পিএনএস (মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম প্রধান) : পিঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের অবস্থা খুবই করুণ। বর্তমান সমাজের বৃহৎ অংশের অবস্থা আসলেই নাজুক। হাতে গোনা কিছু লোক এবং হালে নানা কারণে কাঁচা পয়সার মালিক বনে যাওয়া একটি শ্রেণী ছাড়া বাকিরা সমাজের সঙ্গে তাল মিলাতে গিয়ে চরম হিমসিম খাচ্ছেন।

বাজারে নতুন পিঁয়াজ এসেছে। পাতাসহ পিঁয়াজ আসে আরো মাসখানেক আগে। অনেকেই পিঁয়াজের বদলে পাতা বেটে তরকারিতে খাচ্ছেন। পিঁয়াজ পাতার দামও চড়া। দেড়শ টাকা থেকে শুরু হয়েছিল, এখন নেমে এসেছে ৮০ টাকা কেজিতে। পাতার গোড়ায় কিছুটা পিঁয়াজও থাকছে। এখন যে পিঁয়াজ বাজারে আসছে, এগুলোর পুরোটাই অপুষ্ট।

পিঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির ফলে নানা অনাচারের সঙ্গে চুরি ভয়ও পাচ্ছেন উৎপাদনকারী কৃষকরা। চুরির ভয়ে তারা রাত জেগে পিঁয়াজ ক্ষেত পাহারা দিচ্ছেন। হালে তারা যে দাম পাচ্ছেন, সেটার বড় অংশ চলে যাচ্ছে দিনমজুরদের টাকা পরিশোধে। তারা আশঙ্কা করছেন, যে হারে দেশের বাইরে থেকে পিঁয়াজ আমদানি করা হচ্ছে, তাতে পিঁয়াজের ভরা মৌসুমে তারা ক্ষতির শিকার হবেন।

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়ার মাঝে রাজধানী ঢাকা, বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ যত শহর-বন্দর হাট-বাজার এমনকি মুদি দোকান ছিল, কোথাও কখনো পিঁয়াজের বিন্দুমাত্র অভাব দেখা যায়নি, পড়েনি সংকট। সরকারি সংশ্লিষ্ট খাতের হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকার খবর মিডিয়ায় এসেছে। আমদানিকারক ও পাইকারদের গুদামও ছিল ভরপুর।

সব জায়গার সর্বত্র পিঁয়াজের জয়জয়কার থাকার পরও তাৎক্ষণিক আমদানি করা হয়। আপদকালে দেয়নি কেবল আমাদের অতি সুহৃদ হিসেবে বহুল সুবিধাপ্রাপ্ত কাছের দেশ ভারত। দেশটি পিঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগ শতভাগ কাজে লাগায় একশ্রেণীর অসৎ ব্যবসায়ী চক্র। দায়িত্বশীলদের রহস্যজনক অবহেলায় তারা অনৈতিক কাজটি করে।

সবশেষে যেভাবে বা কারণেই হোক পিঁয়াজ আমদানি করা হয়। নৌ ও বায়ুপথে আনা হয়। কিন্তু বিধি বাম, টিসিবির পিঁয়াজ ছাড়া ক্রেতারা ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি দামে কিনতে বাধ্য হয়। আমদানির প্রভাব মোটেও বা বিন্দুমাত্র পড়েনি ক্রেতাপর্যায়ে। ফলে তেলওয়ালার মাথায় তেল দেওয়ার মতো সুবিধা পায় অসৎ ব্যবসায়ীরা। বাপের বেটা মতো তারা ইচ্ছেমতো মূল্য আদায় করে।

ক্ষুব্ধ এক ক্রেতা লাইনে দাঁড়িয়েও পিঁয়াজ সংগ্রহ করতে না পেরে মন্তব্য করেন, কানার হাতে কুড়াল দিলে এমনই হয়। সচিবালয় আর জাতীয় প্রেস ক্লাবের মাঝখানে ভদ্রলোকের মন্তব্যটি যেন গোগ্রাসে গিলে উপস্থিত জনতা। তাকিয়ে দেখলেন একজন- কেউ আবার তার মন্তব্যে ভিন্ন মত প্রকাশ করে কিনা। না, তেমন বীর কাউকে নাকি দেখা যায়নি। বরং কজন সায় দেয়।

বিপদে সাধারণ মানুষের পাশে যাদের ঢাল হিসেবে দাঁড়ানোর কথা, তাদের কথাবার্তা, কার্যক্রম ও আচরণে সুফল পাননি পিঁয়াজ ক্রেতারা, সর্বস্তরের খাদক সম্প্রদায়। ফলে প্রকাশ্যে নিজেদের পকেট মোটাতাজা করে পিঁয়াজের পর অন্যদিকে নজর দেওয়ার শক্তি পেয়ে ষোলোআনা কাজে লাগায় সিন্ডিকেট নামের গণদুশমনরা। আযব এ ডাকাতি নীরবে প্রত্যক্ষ করেছে অসহায় দেশবাসী।

আশার কথা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘মন্ত্রিসভায় যারা ভালো করবে না তাদের দায়িত্বে পরিবর্তন আনা হবে। এছাড়া যারা নিজ নিজ কাজে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদেরও সরিয়ে দেওয়া হবে।’ ৯ ডিসেম্বর সচিবালয়ে তিনি একথা বলেন। আসলেই দায়িত্ব নিয়ে সংকটে যারা সুফল দেখাতে ব্যর্থ, তাদের স্বপদে মানায় না।

সমাজে একটা প্রবাদ আছে, আর সেটা হলো- বিড়াল কাঠের হোক, ইঁদুর মারলেই চলবে। আমাদের তথা জনসাধারণের বেশি কিছু চাহিদা নেই, কেবল সমস্যা-সংকটে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করলেই হলো। পিঁয়াজের ঊর্ধ্বগামীসহ হরেকরকম জ্বালাতন ক্রেতাদের বাবার নাম ভুলিয়ে দিলেও ব্যর্থতার দায় নিয়ে যারা সরে যাননি, তাদের সরানো সময়ের দাবি।

পিঁয়াজসহ বাজারে নিত্যপণ্যের দামও আকাশ ছোঁয়া। যার প্রভাব পড়ছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের উপর। এতে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের খাবিখা অবস্থা। আয়ের সঙ্গে ব্যয় মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের ত্রাহি অবস্থা। আবার বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির খবরে তাদের মাথায় বাজ পড়ার উপক্রম। এ অবস্থায় কানার হাতে কুড়াল না দিয়ে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে দক্ষ ও পরীক্ষিতদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো অতীব জরুরি?

প্রতিবেদক : বিশেষ প্রতিনিধি- পিএনএস

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন