লাগামহীন নিত্যপণ্যের বাজার : রাঘব বোয়ালরা অধরা

  

পিএনএস, নিজস্ব প্রতিবেদক : লাগামহীন নিত্যপণ্যের বাজার। মুনাফালোভী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে সীমাহীন দুর্ভোগে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ধুমায়িত হচ্ছে। নানা সংকটের অজুহাতে অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের কারণে গেল বছরজুড়েই নিত্যপণ্যের বাজার ছিল অস্থির। বাজারে মূল্য কারসাজির সাথে জড়িত রাঘব বোয়ালরা অধরা থাকায় নতুন বছরের শুরুতেই তাদের কাছে জিম্মি হতে চলেছে দেশের সাধারণ মানুষ।

বিগত বছরগুলোতে বাজার নিয়ন্ত্রণে ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তাদের দৃশ্যমান কোনো কর্মকাণ্ড না থাকায় মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। বাজার মনিটরিংয়ের অভাবে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির জাঁতাকলে পিষ্ঠ সাধারণ মানুষ দুষছেন সরকারের দায়িত্বশীলতার পরিচয় না দেয়াকে। এ ব্যাপারে সরকারের নিষ্ক্রিয় ভূমিকাকে জনগণ সুনজরে দেখছে না। সরকার নীরব কেন?-এটা সাধারণ দুর্ভোগগ্রস্ত মানুষের ক্ষুব্ধ প্রশ্ন।

গেল বছরের শেষ দিকে এসে ট্রিপল সেঞ্চুরি করা পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা কিছুটা কমলেও এখনো তা ১৫০-এর ঘরেই রয়েছে। তবে হঠাৎ হঠাৎ তা ১৮০ ঘরে গিয়েও দাঁড়ায়। অতি মুনাফালোভীদের কারণে সরকারি নানা উদ্যোগও যেন কোনো কাজে আসছে না।

এবার দাম বাড়ার তালিকায় এসেছে রসুন। সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে আমদানি করা রসুনের দাম ৫০ থেকে ৬০ টাকা বেড়ে এখন তা ডাবল সেঞ্চুরি পার করেছে। এদিকে কেজিতে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে দেশি রসুনের দাম। রসুনের পাশাপাশি বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে সব ধরনের আদা। গত কয়েকদিন মসলা, ভোজ্যতেল ও চালের বাজার অস্থিতিশীল।

বিভিন্ন অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো কোনো সংস্থা নির্দিষ্ট উপলক্ষ ছাড়া অন্য সময় কোনো অভিযান চালায় না। আবার পণ্যমূল্যের সুনির্দিষ্ট আইন নেই বলে অভিযান চালিয়েও লাভ নেই। বিশেষ করে যারা মূল্য কারসাজি করে, সেই রাঘব বোয়ালদের ধরতে না পারলে শুধু খুচরা ব্যবসায়ীদের জেল-জরিমানা করে কোনো কাজ হবে না। বাজার নিয়ন্ত্রণে মাঠে থাকা সরকারি বিভিন্ন সংস্থার দাবি- তারা প্রতিনিয়ত মাঠে থেকে বাজার নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।

বিগত বছরগুলোর চেয়ে বাজার তদারকি অভিযান প্রায় দ্বিগুণ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু কিছু মুনাফালোভী ব্যবসায়ীর সাথে তারা পেরে উঠছেন না। বাজার ব্যবস্থায় সরকারের জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বাজার বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা। শুধু দেশীয়ভাবে কেনাকাটা নয়, আমদানির ক্ষেত্রেও নজর দেয়া প্রয়োজন।

তারা বলছেন, শুধু অভিযান চালিয়ে সমাধান হচ্ছে না। মূল্যবৃদ্ধিতে কারা সম্পৃক্ত তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। কিন্তু তেমন কিছু দৃশ্যমান না হওয়া অসৎ ব্যবসায়ীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। রাজধানীর বাজার নিয়ন্ত্রণে সিটি কর্পোরেশনের একটা বড় দায়িত্ব থাকলেও তাদের মাঠে খুব একটা দেখা যায় না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, আমরা রমজান ছাড়া নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে মাঠে থাকি না। মাঝে পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধির সময় অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তবে সেটা জোরালো ছিল না।

তিনি আরও বলেন, যারা খুচরা বিক্রেতাদের জেল-জরিমানা করে তো বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না। বিশেষ করে যারা বড় বড় ব্যবসায়ী তাদের আমরা ধরে জেল-জরিমানা দিতে পারছি না। তাহলে বাজার কীভাবে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে? তার বক্তব্যের চিত্রই যেন দেখা যাচ্ছে বাজারে। মূল্যবৃদ্ধির দৃশ্যমান কোনো কারণ না থাকলেও গত দুই সপ্তাহ ধরে নিত্যপণ্যের বাজারে মূল্যবৃদ্ধি চলছে। ব্যবসায়ীরাও দাম বাড়ার কোনো কারণ দেখাতে পারছেন না।

পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতার মধ্যেই অন্য নিত্যপণ্যের গায়েও তার আঁচ লেগেছে। এক মাসের মধ্যে ২ দফা দাম বেড়েছে চালের বাজারে। চালের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এবার দাম বাড়ার তালিকায় যোগ হয়েছে মসলা। গত দেড় মাস ধরে দফায় দফায় দাম বেড়েছে রান্নায় অতি প্রয়োজনীয় এ পণ্যের। খুচরায় কোনো কোনো মসলার দাম বেড়েছে দ্বিগুণ। এছাড়া আরও অন্তত ১০ রকম নিত্যপণ্যের মূল্য অব্যাহতভাবে বেড়েছে। এগুলো হলো- চাল, ডাল, আটা, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, রসুন, দারুচিনি, এলাচ, শুকনো মরিচ ও আদা।

সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে সাধারণ মানের মিনিকেট ও নাজিরশাইলের দাম বেড়েছে ১১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। আর সরু চালের মূল্যবৃদ্ধি প্রায় ৭ শতাংশ। এদিকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, আমাদের কাজ কমেনি বরং বেড়েছে। প্রতিদিন ৪টি থেকে ৫টি টিম মাঠে থাকে।

গত বছরের জুলাই থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৯০০টি অভিযান চালানো হয়েছে। যখন বাজারে কোনো পণ্যের চাহিদা বেশি থাকে তখন ব্যবসায়ীদের মধ্যে দাম বাড়ানোর তৎপরতা দেখা যায় উল্লেখ করে মঞ্জুর মোহাম্মদ বলেন, অনৈতিক মুনাফার জন্য কিছু ব্যবসায়ী চেষ্টা করে। তাদের নিয়ন্ত্রণে আমরা প্রতিনিয়ত অভিযান চালাচ্ছি। মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সমিতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত বসা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সরকারের বিভিন্ন সংস্থার দাবি তারা মাঠে থেকে মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে কাজ করছে। তারপরও কেন বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না- জানতে চাইলে কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান জানিয়েছেন, নিয়ন্ত্রণ বলতে তারা তো শুধু প্রত্যক্ষ করছেন। প্রত্যক্ষের ওপর তো আর বাজার নির্ভর করে না। বাজারে কেউ যদি অসৎ উপায় অবলম্বন করে থাকে, আর এটা যদি ওনারা চিহ্নিত করে থাকেন তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু ব্যবস্থা নেয়া কিংবা কেউ চিহ্নিত হয়েছে বলে আমরা দেখছি না।

পিএনএস//জে এ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন