তিনি যেখানেই যান ‘শ্লীলতহানির’ দোষে বদলি হন

  


পিএনএস ডেস্ক: সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই প্রধান শিক্ষক যেখানেই যান সেখানেই শ্লীলতাহানি আর দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। গত ১৮ বছরে তার বিরুদ্ধে দুজন সহকারী শিক্ষিকা, একজন ছাত্রী, একজন ছাত্রীর মা ও এক অষ্টাদশী তরুণীর শ্লীলতাহানির চেষ্টার অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। দুবার অভিযোগ ওঠে উপবৃত্তির টাকা আত্মসাতের। এসব অভিযোগে তাকে কমপক্ষে পাঁচবার শাস্তিমূলক বদলি করা হয়।

কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার পুটিকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোখলেছুর রহমান এভাবে একের পর এক অপকর্মে জড়িয়ে মহৎ পেশাটির জন্য বদনাম আনলেও শিক্ষা প্রশাসন নীরব। তবে তারা স্বীকার করছেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে তাদের কাছে। তদন্তও চলছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নানা অভিযোগে মোখলেছুরের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ছাড়াও বিচারিক আদালতে মামলা হয়েছে। তার চাকরিজীবনের প্রতিটি কর্মস্থলে একটা না একটা অপকর্ম ঘটিয়েছেন। আর এ কারণে জনরোষের মুখে সেখান থেকে শাস্তিমূলক বদলি হয়েছে তার। ফলে উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষায় এখন এক আতঙ্কের নাম প্রধান শিক্ষক মোখলেছুর রহমান।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, উপজেলা প্রশাসন ও প্রাথমিক শিক্ষা অফিস রহস্যজনকভাবে তার অপকর্মের বিষয়ে উদাসীন। মোখলেছুর রহমানের নানা অনৈতিক কর্মকা-ের শাস্তি কেবল বদলির মধ্যে সীমাবদ্ধ। তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ করেও শিক্ষা বিভাগ কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় হতাশ ভুক্তভোগীরা। উল্টো শিক্ষা কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগকারীদের হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ কারণে মোখলেছুর তার অপকর্ম চালিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছেন বলে মনে করছেন তারা।

প্রধান শিক্ষক মোখলেছুরের যত অপকর্ম
অনুসন্ধানে জানা যায়, অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক মোখলেছুর রহমান যেখানেই চাকরি করেছেন সেখানেই অপকর্ম ঘটিয়েছেন, আর স্থানীয় সালিস বৈঠকের মাধ্যমে টাকা-পয়সা দিয়ে নিজেকে রক্ষা করছেন।

তার অপকর্ম প্রথম বেরিয়ে পড়ে ১৯৯৮ সালে। এ সময় তিনি ভীমশর্মা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। সেখানে এক সহকারী শিক্ষিকাকে লাইব্রেরি রুমে জড়িয়ে ধরে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন। বিষয়টি জানাজানি হলে তাকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয় নওদাবস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

সময়মতো স্কুলে উপস্থিত না হওয়া এবং এলাকার লোকজনের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ায় তাকে ২০০০ সালে নওদাবস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বদলি করা হয় রামহরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এখানে এসে স্কুলের এক শিক্ষার্থীর মায়ের সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। একদিন স্থানীয় লোকজন তাকে হাতেনাতে আটক করে। পরে সালিস বৈঠকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হয় তার।

এ ঘটনার পর তাকে ফরকেটহাট বিশেষ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়। এখানে বিদ্যালয়ের পাশের বাড়িতে সাইকেল রাখার সুবাদে সখ্য গড়ে তোলেন ওই বাড়ির এক অষ্টাদশী মেয়ের সঙ্গে। মেয়েটিকে তার শ্যালকের সঙ্গে বিয়ের কথা বলে সিঙ্গারডাবড়ীহাটস্থ নিজ বাড়িতে নিয়ে যান তিনি। এখানে মেয়েটির শ্লীলতাহানির সময় লোকজনের হাতে ধরা পড়েন। এ সময় তাৎক্ষণিক ৬০ হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে রক্ষা পান তিনি। এ ঘটনার পর টানা ১৫ দিন স্কুলে অনুপস্থিত থাকেন মোখলেছুর।

এবার তাকে বদলি করা হয় সুন্দরগ্রাম পুটিকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এই স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে ২০০২ সালে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পরে হাতেনাতে ধরা পড়েন। স্থানীয় লোকজন তাকে উত্তম-মধ্যম দিয়ে রুমে তালাবদ্ধ করে রাখে। পরে রাজারহাট থানার পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। থানা ৩০ হাজার টাকা নিয়ে মাঝপথে মোখলেছুরকে ছেড়ে দেয় বলে অভিযোগ করেন ওই স্কুলের তৎকালীন সভাপতি ও বর্তমান রাজারহাট প্রেসক্লাব সভাপতি এস এ বাবলু। এ ব্যাপারে আদালতে মামলা হলে দুই মাস স্কুলে অনুপস্থিত থাকেন প্রধান শিক্ষক। পরে হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে আসেন। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে রফাদফা করে স্কুলে যোগদান করেন তিনি।

২০০৭ সালে তাকে বদলি করা হয় চর খিতাব খাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা আতœসাৎ করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এ অভিযোগে ২০১৩ সালে তাকে আবার শাস্তিমূলক বদলি করা হয় ঘড়িয়ালডাঙ্গা পুটিকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

সর্বশেষ এই স্কুলের এক সহকারী শিক্ষিকার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক ব্যবহার ও অশ্লীল কথাবার্তা বিষয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন ২০১৫ সালে। মৌখিক অভিযোগ করে উল্টো হয়রানির শিকার হতে হয় শিক্ষিকাকে। পরে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অডিওতে ধারণ করা কথাবার্তাসহ লিখিত অভিযোগ করা হয় শিক্ষা বিভাগে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে প্রধান শিক্ষক সহকারী শিক্ষিকাকে লাথি মেরে স্কুল থেকে বের করার হুমকি দেন প্রকাশ্যে। এতে তোলপাড় শুরু হয়েছে এলাকায়।

প্রধান শিক্ষক মোখলেছুর রহমান তার বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি বারবার ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে আসছেন। বিভাগীয় তদন্ত ও আদালতেও তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন। এবারও তিনি তদন্তে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারবেন বলে দাবি করেন।

মোখলেছুর রহমানের ব্যাপারে জানতে চাইলে রাজারহাট উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আকতারী পারভীন জানান, অভিযুক্ত ওই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে সহকারী শিক্ষিকার শ্লীলতাহানির চেষ্টাসহ উপবৃত্তির টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এর আগে উপবৃত্তির টাকা আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়। আর এখন শ্লীলতাহানির চেষ্টার অভিযোগের দালিলিক প্রমাণাদি নিয়ে তদন্ত চলছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এনামুল হক জানান, পুটিকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোখলেছুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও নৈতিক স্খলনের একাধিক অভিযোগ রয়েছে। সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম শাহজাহান সিদ্দিকী বিষয়টি তদন্ত করছেন। তদন্ত প্রতিবেদন পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, বিষয়টি দেখার দায়িত্ব শিক্ষা বিভাগের। এখানে উপজেলা প্রশাসনের করার কিছুই নেই। সূত্র: ঢাকাটাইমস

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech