বিকাশের ২৮৮৭ এজেন্টের লেনদেন স্থগিত

  

পিএনএস ডেস্ক: অর্থ পাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন, চাঁদাবাজি আর প্রতারণার অবৈধ লেনদেনের সহজ মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে মোবাইল ব্যাংকিং ‘বিকাশ’। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বারবার নির্দেশনা দেয়া সত্ত্বেও তা অমান্য করছে প্রতিষ্ঠানটি। তাই আইন লঙ্ঘনের দায়ে বিকাশের অবৈধ দুই হাজার ৮৮৭টি এজেন্টের লেনদেন স্থগিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) সম্প্রতি মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের বিধান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন নির্দেশনা লঙ্ঘন করায় বিকাশের বিরুদ্ধে এ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

বিএফআইইউ বলছে, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের বিধান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন নির্দেশনা লঙ্ঘন করায় বিকাশের দুই হাজার ৮৮৭টি এজেন্ট হিসাবের লেনদেন স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে এজেন্ট কর্তৃক একই পরিচয়পত্রের বিপরীতে পরিচালিত একাধিক ব্যক্তিগত হিসাব ৩০ দিনের মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়াও পরবর্তী তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য কয়েকটি (কতিপয়) হিসাবের তথ্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে দেয়া হয়েছে।

সংস্থাটি আরও বলছে, ‘বিকাশ’ মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে অপহরণ, জঙ্গি অর্থায়ন, বিদেশ থেকে অবৈধভাবে প্রেরিত রেমিট্যান্সের (হুন্ডি) অর্থ বিতরণসহ বিভিন্ন অপরাধের অর্থ লেনদেনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিএফআইইউ সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে প্রথম পর্যায়ে এ পদক্ষেপ নিয়েছে।

বিএফআইইউ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে পাওয়া অনিয়ম, রেমিট্যান্স কমার পেছনে কারণ, বিকাশের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থা হতে প্রাপ্ত তথ্য এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ করে বিকাশের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

অন্যান্য মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে বর্তমানে অনুসন্ধান এবং ব্যবস্থা গ্রহণ বিবেচনাধীন রয়েছে বলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে বিকাশের অনেক এজেন্টের অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যায়। পরে রাত ৯টার দিকে আবার বন্ধ হওয়া বেশকিছু অ্যাকাউন্ট সচল হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন গ্রাহক তার জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে বিকাশ, রকেট, শিওর ক্যাশ, মাইক্যাশসহ প্রতিটি কোম্পানির জন্য একটির বেশি হিসাব খুলতে পারবেন না। এ নিয়ম মানছে না দেশের মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলো। তার মধ্যে অন্যতম ‘বিকাশ’।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমাদের নির্দেশনা সত্ত্বেও একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে একাধিক হিসাব খুলেছে। এতে করে বিকাশসহ অন্যান্য এজেন্ট আইন লঙ্ঘন করছে। তাই মোবাইল ব্যাংকিংয়ে একটি পরিচয়পত্রের বিপরীতে একাধিক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে গ্রাহকের প্রকৃত সংখ্যা ও পরিচয় জানা যাবে। প্রতারণাও বন্ধ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, একাধিক সিম ও পরিচয়পত্রের মাধ্যমে একাধিক হিসাব খুলে অর্থ আত্মসাৎ করছে প্রতারকচক্র। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্দেশিত কেওয়াইসি ফরম যথাযথভাবে পূরণ না করেও এজেন্ট হচ্ছেন অনেকেই। যা প্রতারণার অন্যতম হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে দুবাই ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাঠানোর নামে অপহরণসাপেক্ষে মুক্তিপণ আদায় করছে বেশকিছু অসাধুচক্র। এ অর্থ আদায় করা হয়েছে ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে।

এদিকে দেশের জেলা ও উপজেলা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে মোবাইল ব্যাংকিং সিস্টেম বিকাশের মাধ্যমে হুন্ডির শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। যার প্রভাব পড়েছে প্রবাসী আয় রেমিট্যান্সে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিকাশের লঘুসহ সাইনবোর্ড, ব্যানারে অর্থ লেনদেনে করছে। যার কোনো অনুমোদন নেই। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাই হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বিকাশ এজেন্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাটি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বলেন, মালয়েশিয়া, কাতারসহ বেশ কয়েকটি দেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ‘বিকাশ’ এর নাম ব্যবহার করে অবৈধ লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ এটি। তাই এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিকাশের অবৈধ লেনদেনের এ কর্যক্রম বন্ধের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিকাশসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে যেসব অনিয়ম হচ্ছে তা নিজ উদ্যোগে বন্ধ করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রযোজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে নিরাপত্তা জোরদারে এ বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য নীতিমালা করা হয়েছে। এসব নিয়মনীতি যারা না মানবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জুন ২০১৭ সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে প্রতিদিন গড় লেনদেনের পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকা। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে দৈনিক গড় লেনদেনের সংখ্যা ৬০ লাখ ৬৪ হাজার। বর্তমানে এমএফএস এজেন্ট সংখ্যা সাত লাখ ৫৮ হাজার এবং মোট গ্রাহক সংখ্যা ৫ কোটি ৩৭ লাখ। এমএফএস প্রদানরত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৭টি।

পিএনএস/হাফিজুল ইসলাম

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech