বনানীর রেইনট্রিতে দুই ছাত্রী ধর্ষণ মামলায় মীমাংসা করতে হুমকি

  

পিএনএস ডেস্ক : বনানীর রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণ মামলার বাদীকে মীমাংসা করে ফেলার জন্য আসামিপক্ষ চাপ দিচ্ছে। এর বাইরে অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন করে এবং খুদে বার্তা দিয়েও তাঁকে ভয়-ভীতি দেখানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ওই নারী।

মামলার বাদী গত বুধবার বলেন, ‘আমি ভালো নেই। ওদের (আসামি) ফ্যামিলি, বিশেষ করে ফারিয়া খুব বিরক্ত করছে। মিটমাট করে ফেলার জন্য চাপ দিচ্ছে। আমি থানায় উনার নামে (ফারিয়া) দুটো জিডি করার পরও উনি আমাকে বিরক্ত করছেন।’ অপরিচিত নম্বর থেকে তাঁকে হুমকিও দেওয়া হয়েছে।

ফারিয়া মাহাবুব আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদের সাবেক স্ত্রী। বনানী থানায় মামলা দায়েরের সময় ফারিয়া বাদীকে সহযোগিতা করেন এবং তাঁদের অভিযোগের পক্ষে বিবৃতি দেন। এখন তিনি বলছেন, বাদী ধর্ষণের শিকারই হননি। তিনি সাফাতকে ফাঁদে ফেলে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। বাদীর চরিত্র নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

জানতে চাইলে ফারিয়া মাহাবুব বলেন, তিনি চান সবাই ন্যায়বিচার পাক। তিনি যা জানেন আদালতে তা–ই বলবেন।

বনানীর ধর্ষণ মামলা এখন ঢাকার ২ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালে জজ মোহাম্মদ সফিউল আজমের আদালতে বিচারাধীন। মামলার একজন বাদী আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। গত বুধবার (১৮ অক্টোবর) রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আলী আকবর বলেন, মামলার বাদী বলেছেন, হোটেল কক্ষে তাঁদের দুজনকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়েছে। নানা কারণে মামলাটিতে কিছু জটিলতা রয়ে গেছে। ঘটনার এক মাস সাত দিন পর মামলা দায়ের হয়। তা ছাড়া, পুলিশ যে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে, সেখানে রেইনট্রির কর্মীদের সাক্ষী হিসেবে রাখা হয়েছে। আগাগোড়াই রেইনট্রি বলে আসছে, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি। তাঁরা ঘটনার পক্ষে কতটা কী সাক্ষ্য দেবেন বলা যাচ্ছে না।

কৌঁসুলি আরও বলেন, বাদী ও তাঁর বান্ধবী ছাড়াও ওই রাতে হোটেলে তাঁদের আরও দুজন বন্ধু ছিলেন। ওই দুজনের দুই বন্ধুর একজনের সাক্ষ্য নিয়েছে পুলিশ। অন্যজনের নেয়নি। বাদীকে শক্ত হতে হবে ও স্পষ্টভাবে অভিযোগ উত্থাপন করতে হবে। আরও একজন বাদী রয়েছেন। তাঁর জবানবন্দির ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করছে।

ধর্ষণ মামলার বাদীদের আইনগত সহযোগিতা দিচ্ছে বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি। আইনজীবী ফাহমিদা আক্তার বলেন, বাদী আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। আসামিপক্ষের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল তাঁকে আংশিক জেরা করেছেন। ৩১ অক্টোবর জেরা শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

বনানীর রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণ মামলার বাদী বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া দুই ছাত্রী। মামলার এজাহারে তাঁরা বলেছেন, গত ২৮ মার্চ তাঁকে এবং তাঁর এক বন্ধুকে বনানীর রেইনট্রি হোটেলে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করেন আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদ ও তাঁর বন্ধু নাঈম আশরাফ। সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল ওই রাতের ঘটনার ভিডিও ধারণ করেন। বাদী মামলা দায়েরের পর বলেন, আসামিরা ওই রাতের ভিডিও ধারণ করেছিলেন এবং পরে ভয়-ভীতি দেখিয়েছেন। সে কারণে তাঁরা থানায় মামলা করেন।

আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে এই মামলার বিচার চলছে। মামলা দায়েরে পুলিশি অসহযোগিতার পর আসামি গ্রেপ্তারেও পুলিশের বিরুদ্ধে গড়িমসির অভিযোগ ছিল। ব্যাপক সমালোচনার মুখে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়। সাফাত আহমেদ, নাঈম আশরাফ, সাদমান সাকিফ ও গাড়িচালক বিল্লাল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে দেহরক্ষী রহমত অভিযোগ স্বীকার করেননি। গত ১৩ জুলাই পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ গঠন হয়।

‘ধর্ষণ’ নিয়ে বাদী ও আসামি যা বলেছেন

৬ মে মামলাটি তদন্ত করে উইমেন সাপোর্ট সেন্টার। মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ‘হোটেলে আসার পর ওখানে কোনো পার্টির পরিবেশ না দেখে বাদী ও তাঁর বান্ধবী চলে যেতে চান। সাফাত আহমেদ তাঁদের কেক কাটার পর যাওয়ার অনুরোধ করেন। সে সময় বাদী ও তাঁর বান্ধবী ছাড়াও তাঁদের একজন চিকিৎসক বন্ধু ও তাঁর বান্ধবী ছিলেন। তাঁরা সবাই চলে যেতে চাইলে সাফাত আহমেদ, নাঈম আশরাফ ওরফে এইচ এম হালিম বাদীর চিকিৎসক বন্ধুকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজসহ মারধর করে তাঁর গাড়ির চাবি ছিনিয়ে নেন ও তাঁদের (চিকিৎসক ও তাঁর বান্ধবী) একটি কক্ষে আটকে রেখে, ভয়ভীতি দেখিয়ে বলেন, ‘পালাবি না’। তারপর সাফাত ও নাঈম বাদী ও তাঁর বান্ধবীকে একাধিকবার ধর্ষণ করেন। গাড়িচালক বিল্লাল বাদীর চিকিৎসক বন্ধুকে মারধরের ভিডিও ধারণ করেন।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সাফাত বলেন, বাদীর সঙ্গে জন্মদিনের সপ্তাহ দুয়েক আগে তাঁর পরিচয় হয় সাদমান সাকিফের মাধ্যমে। দ্রুতই তাঁরা বন্ধু হয়ে ওঠেন। তিনি দাবি করেন, বাদীর পছন্দে তিনি রেইনট্রি হোটেলে জন্মদিন পালনের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি দুটি কক্ষ বুকিং দিয়েছিলেন। ২৮ মার্চ রাতে তাঁরা মদ খেয়ে বেসামাল ছিলেন। উত্তেজনার বশে বাদীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। রাত দেড়টার দিকে রুম সার্ভিস খাবার দরজায় টোকা দিলে তিনি তাঁর হাত থেকে খাবার নেন।

তখন বাদী রাগ করে হোটেল কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। তাঁর চলে যাওয়াটা স্বাভাবিক ছিল না। অনিরাপদ সম্পর্ক হওয়ায় তিনি (সাফাত) ভয় পান এবং বিপদের কারণ হতে পারে বলে মনে করেন। তিনি সাদমান সাকিফকে ফোন করে হোটেলে ডাকিয়ে আনেন। বাদীর চিকিৎসক বন্ধুকেও বলেন। তিনি বাদীকে জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল খেতে বললেও তিনি অস্বীকৃতি জানান। তখন সাফাত আহমেদ নাঈম আশরাফকে ডেকে আনেন। নাঈম বাদীর চিকিৎসক বন্ধুকে মারধর করতে শুরু করেন। একপর্যায়ে বাদী পিল খান।

নাঈম আশরাফ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেন। তিনি জবানবন্দিতে বলেছেন, তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। সেই সূত্রে তাঁর সঙ্গে বেশ কিছু মডেলের পরিচয় ছিল। তাঁরা সুযোগ পেলে ইচ্ছেমতো এই নারীদের ব্যবহার করতেন। জন্মদিনের অনুষ্ঠানেও বিকেল থেকে দুজন মডেল ছিলেন। পরে তাঁদের অনুরোধে আরও একজন বাড্ডা থেকে যোগ দেন। ধর্ষণের শিকার দুই নারী ও তাঁদের বন্ধুরা হোটেলে আসেন রাত ৯টা সাড়ে ৯টার দিকে। অতিথিদের একজনকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে তিনি হোটেলে ফেরেন রাত দেড়টার দিকে। তিনি ভালো বন্ধু হওয়ার কথা বলে জোর করে বাদীদের একজনের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেন। বাদী তাঁকে বাজে মেয়ে ভাবতে নিষেধ করেন। কিন্তু নাঈম জোর করে তাঁর সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করেন।

কী ছিল ভিডিওতে

মামলার অভিযোগপত্রে ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে মুঠোফোনে ধারণ করা ও পরে ডিলিট করা ক্লিপ উদ্ধার করা হয়। ভিডিও ফাইলে কয়েকজন পুরুষ ও নারীকে কথা বলতে দেখা যায় ও একজন পুরুষকে হাত জোড় করে বসে থাকতে দেখা গেছে।

সাফাত আহমেদ, নাঈম আশরাফ ওরফে হালিম ও সাদমান সাকিফ তিনজনই ভিডিও ধারণের কথা বলেন। আসামি বাদীর চিকিৎসক বন্ধুর সহযোগিতা চাইলেও তিনি সহযোগিতা করছিলেন না। সে কারণে রাত ৪টার দিকে সাফাত আহমেদ পাশের কক্ষ থেকে নাঈম আশরাফকে ডেকে আনেন। তিনি শাহরিয়ারকে তুলে এনে মারধর শুরু করেন। তিনি জবানবন্দিতে বলেছেন, শাহরিয়ারকে বলা হয়, ‘তুই বলবি আমি ইয়াবা ব্যবসা করি। আমার নিকট ২০ পিস ইয়াবা আছে। আমি জীবনে আর কখনো ইয়াবা ব্যবসা করব না।’ সাদমান সাকিফ বলেছেন, তিনি সাফাতের ফোন পান রাত দেড়টার দিকে। হোটেলে এসে দেখেন নাঈম আশরাফ ওরফে হালিম বাদীর চিকিৎসক বন্ধুকে একটি চেয়ারে বসিয়ে মারধর করছে ও গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। তিনি ধর্ষণে সহযোগিতার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। - প্রথম আলো

পিএনএস/জে এ /মোহন

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech