গুজবের দায়ে ৫ সুন্দরীর মুক্তি মিলছেনা অতি সহজে

  

পিএনএস ডেস্ক : রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই কলেজ শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন চলাকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে গ্রেফতার পাঁচ নারী আদালতের নির্দেশে কারাগারে রয়েছেন।

কারাবন্দি এই পাঁচ নারী হলেন- অভিনেত্রী কাজী নওশাবা আহমেদ, ব্যবসায়ী ফারিয়া মাহজাবিন, ইডেন কলেজের ছাত্রী লুৎফন নাহার লুমা, স্কুল শিক্ষিকা নুসরাত জাহান সোনিয়া ও বিএনপি নেত্রী ফাতেমা বাদশা। তাদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ফেসবুকে উস্কানিমূলক ও বিভ্রান্তিমূলক গুজব ছাড়ানোয় তথ্যপ্রযুক্তি আইনে অভিযোগ আনা হয়েছে।

এদিকে রোববার একই আন্দোলনে গ্রেফতার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭ শিক্ষার্থী জামিনে মুক্তি পেয়েছে। কারাবান্দি অন্য শিক্ষার্থীরার ঈদুল আজহার আগেই জামিন পাবেন বলে আশা করছেন তাদের আইনজীবীরা। তবে সড়ক আন্দোলনে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে গ্রেফতার পাঁচ নারীর শিগগিরই জামিন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আন্দোলনকালে পুলিশের ওপর হামলা ও ভাঙচুরের মামলায় জামিনপ্রাপ্ত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্ত কারাবন্দি পাঁচ নারী তথ্যপ্রযুক্তি আইনের অজামিনযোগ্য ধারার মামলায় গ্রেফতার হওয়ায় জামিন পেতে আরো কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠলে রাজধানীর ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন জায়গায় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা শুরু হয়। এরই মধ্যে ফেসবুকে গুজব ছড়ানো হয় যে ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে স্কুল কলেজের কয়েকজন ছাত্রকে হত্যা এবং কয়েকজনকে ছাত্রীকে আটকে রেখে ধর্ষণ করা হচ্ছে। এই গুজবগুলো ছড়ানো হয়েছিল ফেসবুক লাইভে এসে বা সাক্ষাৎকারের মতো করে তৈরি করা সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছেড়ে দিয়ে। দেশের পাশাপাশি বাইরে থেকেও ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে দেশবাসীকে শিক্ষার্থীদের পক্ষে নেমে আসার আহ্বান জানানো হয়।

এই বিভ্রান্তিকর ও উসকানিমূলক প্রচারণায় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা আওয়ামী লীগের ধানমন্ডির কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। সরকারের অভিযোগ এই হামলায় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক কর্মীরাও অংশ নিয়েছে। তবে ওই দিন বিকালেই স্পষ্ট হয়ে যায়, এসব অপপ্রচার। ছাত্রদের দুটি প্রতিনিধি দল আওয়ামী লীগ কার্যালয় ঘুরে এসে তারাও গণমাধ্যমকে জানায়, এসব মিথ্যা। তবে এরপরও সামাজিক মাধ্যমে নানা কথা ছড়ানো হতে থাকে।

মিথ্যা গুজব রটানোর মাধ্যমে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করে নাশকতার পথে ঠেলে দেওয়ার এই ঘটনাটি সরকার বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। ওইদিনই গুজব রটনাকারীদের শনাক্ত করে তাদের গ্রেফতারে অভিজানে নামে পুলিশ।

ধানমন্ডিতে সংর্ঘষের ঘটনার পর ওইদিন ৪ আগস্ট রাতে রাজধানীর উত্তরা থেকে মিডিয়ার চেনামুখ অভিনেত্রী কাজী নওশাবা আহমেদকে আটক করে র‌্যাব। ফেসবুকে লাইভে এসে দুই ছাত্রে মৃত্যুর গুজব ছড়ানোর দায়ে আইসিটি আইনে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এর মধ্যে এ অভিনেত্রীকে দুই দফা রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসবাাদ করা হয়। এর মধ্যে তিনি অসুস্থ হয়ে গেলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

বর্তমানে ওই হাসপাতালে পুলিশ প্রহরায় অসুস্থ নওশাবা চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে একাধিকবার তার জামিনের আবেদন করা হলেও আদালত তা বার বার নাকচ করে দিচ্ছে।

গুজব ছাড়ানোর অভিযোগে গত ৫ আগস্ট পটুয়াখালীর কলাপাড়া থেকে গ্রেফতার করা হয় স্কুল শিক্ষিকা নুসরাত জাহান সোনিয়াকে। তিনি উপজেলার দক্ষিণ টিয়াখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা। নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলন নিয়ে ফেসবুকে বিভিন্ন উস্কানিমূলক পোস্ট এবং অপপ্রচার চালানোর অভিযোগে তার বিরুদ্ধেও তথ্য প্রযুক্তি আইনে মামলা করা হয়েছে। রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো এই শিক্ষিকার আইনজীবীরা আদলতে জামিন আবেদন জানালেও তা নাকচ হয়ে গেছে।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে গুজব ছড়ানোর দায়ে তথ্য প্রযুক্তির মামলায় লুৎফন নাহার লুমাকে গত ১৫ আগস্ট সিরাজগঞ্জ থেকে গ্রেফতার করা হয়। ইডেন কলেজের এই ছাত্রী কোটা সংস্কার নিয়ে আন্দোলনকারী বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক।

রাজধানীর রমনা থানায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে করা মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য আদালত তাকে তিন দিনের রিমান্ডে পাঠায় গত বৃহস্পতিবার। রিমান্ড শেষ হওয়ায় তাকে মঙ্গলবার আদালতে হাজির করা হবে বলে তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন। মামলাটি অযামিনযোগ্য ধারায় হওয়ায় রিমান্ড শেষে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেবেন বলে অনেকটাই নিশ্চিত আসামীপক্ষের আইনজীবীরা।

ফেসবুকে অডিও রেকর্ড প্রচারের মাধ্যমে গুজব রটানার অভিযোগে রাজধানীর পশ্চিম ধানমন্ডি এলাকা থেকে ব্যবসায়ী ফারিয়া মাহজাবিনকে গত ১৬ আগস্ট গ্রেফতার করা হয়। নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সায়েন্সে পড়াশোনা শেষ করে ফারিয়া আদালতের নির্দেশে বর্তমানে তিন দিনের রিমান্ডে রয়েছেন। ধানমণ্ডি এলাকার একটি অভিজাত কফিশপের এই মালিকের বিরুদ্ধে আইসিটি আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এই চার নারীর আগেই নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে গুজব ছড়ানোর দায়ে গ্রেফতার হন চট্টগ্রামের বিএনপি নেত্রী ফাতেমা বাদশা।গত ৩ আগস্ট রাতে চট্টগ্রাম নগরীর ডবলমুরিং থানার সুপারিওয়ালা এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। ফেসবুকে বানোয়াট ভিডিও প্রচার করে চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীদের নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা তৈরিতে উসকানি দেওয়ায় তথ্য প্রযুক্তি আইনের মামলায় ফাতেমা বাদশাকে আসামী করা হয়। চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা দলের সিনিয়র সহসভাপতি তিনি।

নিরাপদ সড়ক দাবির আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গুজব তৈরির ঘটনায় দেশের বিভিন্ন থানায় এখন পর্যন্ত মামলা হয়েছে ৫১টি। তথ্যপ্রযুক্তি অাইনে দায়ের করা এসব মামলায় উল্লেখিত পাঁচ নারী ছাড়াও গ্রেফতারের সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে গেছে। এখনও চলছে গ্রেফতার অভিযান।

আগামীতে যে কোনো পরিস্থিতিতে গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে কেউ যেন বিভান্তি বা নাশকতায় উসকানি দিতে না পারে, সেজন্য আইনের কঠোর ধারাতেই গুজব সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে।আগামীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উসকানি দিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করা থেকে সবাইকে বিরত রাখতে গুজব মামলার আসামীদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা দিতে চায় সরকার।


পিএনএস/এএ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech