ইলিশ নিধনের উৎসব চলছে পদ্মায়!

  

পিএনএস ডেস্ক :‘আজ বিক্রি হইছে হাজার টেহা। কাল হইছিল ছয় শ টেহা। মাছ পাইলেও নৌকাপ্রতি তিন শ টেহা দেয়্যান লাগবো, না পাইলেও ওই টেহা দেয়্যান লাগবো।’ মাছ ধরে বিক্রি করার এ গল্প করছিলেন পদ্মাতীরবর্তী চকরাজাপুর এলাকার এক জেলে। আড়াল থেকে কথাগুলো শোনার পর কাছে গিয়ে নাম-পরিচয় জানার আগেই সাংবাদিক পরিচয় জেনে সটকে পড়েন তিনি। ওই বাজারে চায়ের দোকানে বসে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে মাছ ধরে বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে আরেক জেলে বলেন, ‘অন্য সময় এখানকার পদ্মায় ইলিশ মাছ পাওন যায় না। সুযোগ বুইঝা সব কিছু করবার লাগে। বহুতজনেই পদ্মায় ডিমওয়ালা মা ইলিশ আর জাটকা ধরে বিক্রি করতাছে। আমাগো জায়গা-জমিন যা ছিল নদীতে ভাইঙ্গা গেছে, মাছ না ধরে করুম কী?’

মৎস্য অধিদপ্তরের নিষেধ থাকা সত্ত্বেও প্রজনন মৌসুমে পদ্মা নদীতে চলছে ইলিশ নিধনের মহোৎসব। পরে ইলিশ ক্রয়-বিক্রয়কে কেন্দ্র করে সরগরম হয়ে ওঠে চারঘাট-বাঘার পদ্মার তীরবর্তী এলাকা। বাঘা-চারঘাটে প্রায় ২০টি গ্রুপ উপজেলার কালিদাসখালি, চকরাজাপুর, দিয়াড়কাদিরপুর, চৌমাদিয়া, আতারপাড়া, আলাইপুর, কিশোরপুর, মীরগঞ্জ ও চারঘাটের পিরোজপুর, ইউসুফপুর, সাহাপুর, চন্দনশহরসহ মুক্তারপুর এলাকায় মা ইলিশ ধরে বিক্রি করে। দিনের চেয়ে রাতে ইলিশ শিকার হয় বেশি। বিকেল ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে এক দফা নদীতে জাল ফেলে সন্ধ্যায় জাল তুলে মাছ নিয়ে আসে নদীর তীরে। রাতে আরেক দফা নদীতে জাল ফেলে সকালে নদীতীরের ঝোপ-জঙ্গলে, কচুরিপানার মধ্যে লুকিয়ে রাখা ছাড়াও মাছ মজুদ করা হয় বিভিন্ন বাড়িতে। মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল বা অটোরিকশায় গিয়ে এসব মাছ কিনছেন ক্রেতারা। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৮টায় সরেজমিনে দেখা গেছে, পদ্মা থেকে ইলিশ শিকার করে আসা ট্রলারগুলো সারিবদ্ধভাবে কালিদাসখালি মৌজায় চকরাজাপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ঘাটে নোঙর করে আছে। নোঙর করা প্রতিটি ট্রলারের খন্দ (ট্রলারে মাছ সংরক্ষণ করার বাক্স) থেকে দু-তিনজন জেলে ইলিশ মাছ বের করে দিচ্ছেন। অন্য জেলেরা সেগুলো থেকে ছোট-বড় ইলিশ আলাদা করে ঝুড়িতে তুলে দিচ্ছেন। এসব ঝুড়ি মাথায় করে গোপন স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন কেউ কেউ।

আলাইপুর ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, নদীপারের দক্ষিণ-পশ্চিমের দিকে পদ্মা নদীতে মা ইলিশ শিকার করছে জেলেরা। অনেক ক্রেতাই ঘাট থেকে ইলিশ কিনে বাড়িতে নিয়ে যান। মৎস্য অধিদপ্তরের অভিযানে নৌকাসহ জেলেরা আটক হলেও থেমে নেই ইলিশ ধরা। অধিকাংশ সময় অভিযান পরিচালনার আগেই খবর পৌঁছে যায় জেলেদের কাছে। রহমান খান নামের এক জেলে জানান, সারা বছর এ কাজ করেই সংসার চালান। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করান এ কাজ করেই। সাহাবাজ নামের আরেকজন জানান, এলাকার বেশির ভাগ জেলে প্রতিদিনের রোজগার দিয়েই তাঁদের সংসার চালান। মাছ সরবরাহ ভালো থাকলে তাঁদের আয়ও ভালো হয়। মাছ না ধরলে পরিবার পরিজন নিয়ে দুই বেলা দুমুঠো খাবার জোগাতেই হিমশিম খেতে হয়। তাঁরা জানান, নিষিদ্ধ সময়ে মাত্র ২০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়। যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘হাট-বাজারে কোথাও ইলিশ বিক্রি হয় না। তবে চুরি করে কিছু জেলে মাছ ধরে বিক্রি করছে, এটা সত্য। অভিযান চালিয়ে ৭ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত ১০০ কেজি মাছ, ৫০ হাজার ৭০০ মিটার জাল ও একটি নৌকা জব্দ করা হয়েছে।

চারঘাটের মৎস্য কর্মকর্তা সেলিম আকতার বলেন, ‘সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি। জলসীমা অনেক বেশি হওয়ার পরও কমসংখ্যক জেলেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মাছ শিকারে নেমেছে। তবে অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

পিএনএস/এএ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech