সরাইলের কর্মসংস্থান কর্মসূচির প্রকল্পের অনিয়মের তদন্ত শুরু

  

পিএনএস, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রতিনিধি মোঃরাকিবুর রহমান রকিব : অবশেষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলায় এক কোটি ৭৬ লক্ষ ৪৮ হাজার টাকা সরকারি বরাদ্দে "অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচির" বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের তদন্ত শুরু করেছেন সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। বৃহস্পতিবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তি। তবে এই তদন্ত কাজ চলছে ভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

এদিকে এই কর্মসূচির এখানকার বিভিন্ন প্রকল্পের অনিয়ম ধামাচাপা দিতে এবং নিজেদের গাফিলতির দায় এড়াতে বিশেষ করে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা নানা কূটকৌশল অব্যাহত রেখেছেন। তারা সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও সেক্রেটারির সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে অনিয়ম ঢাকতে নানা পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। অনেক প্রকল্পে কাজের শুরুতে কর্মসূচির তালিকাভূক্ত শ্রমিকদের দিয়ে কোনো কাজ না করালেও শুধুমাত্র অনিয়মের প্রমাণ ঠেকাতে এখন তড়িঘড়ি ভেকু মেশিনে মাটি কাটা হচ্ছে। আর এই তীক্ন বুদ্ধি, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি-সেক্রেটারিদের দিয়েছেন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের সুচতুর দায়িত্বশীল কর্তাবাবুরা। এমনটিও জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট অনেকে।

উল্লেখ্য, গত ২৭ এপ্রিল কর্মসংস্থান কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ এই উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকভাবে। প্রকল্প নেওয়া হয় ৪৪টি। শ্রমিক সংখ্যা ২২০৬ জন। কিন্ত কাগুজে কলমে কর্মসূচির কাজ শুরু হলেও কিছু প্রকল্প ছাড়া বেশিরভাগ প্রকল্পে শ্রমিক দিয়ে কাজই করা হয়নি। অথচ উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের উপ-সহকারি প্রকৌশলী ও উপজেলার এ কর্মসূচি কাজের তদারকি কর্মকর্তা মোঃ সালাউদ্দিন দাবি করেছিলেন ৪৪ প্রকল্পেই শতভাগ শ্রমিকের উপস্থিতিতে পুরোদমে কাজ চলছে। পরে স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীদের সরেজমিন সচিত্র প্রতিবেদনে উঠে আসে এখানকার কর্মসূচি প্রকল্পগুলোর সকল অনিয়ম। খোদ উপজেলা চেয়ারম্যান সম্প্রতি এক সাক্ষাতকারে তিনি নিজেও স্বীকার করেন, এখানকার কর্মসংস্থান কর্মসূচির কাজের অনিয়মের বিষয়টি।


সরাইল উপজেলায় কর্মসংস্থান কর্মসূচিতে যত অনিয়ম


*প্রকল্প বাছাই :

এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রকল্প বাছাইয়ে জনগুরুত্তপূর্ন বিষয়টি প্রাধান্য দেওয়া হয়নি। প্রকল্পে এলাকার এমন কিছু রাস্তা তালিকাভূক্ত করা হয়েছে, যা জনসাধারণের চলাচলে আপাদত জরুরি নয়। অথচ সেই এলাকাতেই জনগুরুত্তপূর্ন রাস্তার বেহাল অবস্থা। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের আর্থিক ফায়দা বিবেচনা করেই এসব রাস্তা তারা প্রকল্পের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করিয়েছেন। আবার এই কর্মসূচিতে এমন কিছু রাস্তা নেওয়া হয়েছে, সেই রাস্তায় আগে সরকারের অন্যান্য বরাদ্দে মেরামত কাজ ইতিমধ্যে করানো হয়েছে।

*শ্রমিক বাছাই ও তালিকাভুক্তি

প্রকল্পের কাজে এলাকার হতদরিদ্র বেকার শ্রমিকদের অন্তর্ভূক্ত করার নিয়ম থাকলেও এখানকার প্রকল্পগুলোতে হতদরিদ্র পরিবারের শ্রমিক, সংখ্যায় শতভাগ নেই। স্থানীয় অসাধু জনপ্রতিনিধিরা স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে যার যার এলাকার শ্রমিক তালিকায় নিজেদের নিকটাত্মীয় ও বিভিন্ন পেশার নারী ও পুরুষদের নাম অন্তর্ভূক্ত করেছেন, শুধুই নিজেদের পকেট ভারী করতে।

মূলত প্রকল্পের তালিকায় কাগুজে-কলমে এসব স্বচ্ছল ব্যক্তিরা শ্রমিক হিসেবে বিবেচিত হলেও তারা কখনোই প্রকল্পের কাজে উপস্থিত থাকেন না। অথচ "চিলড্রেন ব্যাংক হিসাব" এর মাধ্যমে তাদের মজুরির টাকা উত্তোলন করে থাকেন প্রকল্প সভাপতি-সেক্রেটারি। অনেক প্রকল্পে শ্রমিক তালিকাভুক্ত করতে প্রকৃত হতদরিদ্র অনেক শ্রমিকের কাছ থেকে ১০০০ টাকা করে ঘুষ নিয়েছেন প্রকল্প সভাপতি-সেক্রেটারি। অসুস্থতায় কোন নারী ও পুরুষ শ্রমিক একদিন কাজে না আসলে, সেইদিনের ২০০টাকা মজুরি উত্তোলন করলেও শ্রমিককে দেওয়া হয় ১০০টাকা। আর বাকি ১০০টাকা নেন প্রকল্প সভাপতি-সেক্রেটারি। শ্রমিকদের কাছ থেকে মাস্টাররোল (বিল প্রস্তুত) বাবদ ১০০টাকা করে নেওয়া হয়। প্রকল্প কাজে খাল বা নালার পানি সেচে প্রত্যেক শ্রমিকের কাছ থেকে ৫০টাকা করে নেওয়া হয়। শ্রমিকদের জব কার্ড ও ব্যাংক হিসাব থেকে মজুরির টাকা উত্তোলনের চেক বই আগেই প্রকল্প সভাপতি-সেক্রেটারি নিয়ে জিম্মি করে রাখেন। যাতে অসহায় শ্রমিকেরা মুখ খুলার সাহস না পান।

*ব্যাংক থেকে শ্রমিক মজুরি উত্তোলন

শ্রমিক তাঁর মজুরির টাকা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে নিজে উপস্থিত থেকে উত্তোলন করার কথা। কিন্তু এখানে এই নিয়মের পুরোটাই উল্টো। মজুরি উত্তোলনের দিন কিছু শ্রমিক ব্যাংকে উপস্থিত থাকলেও সকল শ্রমিকের মজুরির টাকা একসঙ্গে উত্তোলন করেন সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের সভাপতি-সেক্রেটারি। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের অসাধু অফিসারের সাথে প্রকল্প সভাপতি-সেক্রেটারি আগেই অনৈতিক এক চুক্তি করেন। পরে ব্যাংকের জনৈক ব্যক্তি সকল শ্রমিকের মজুরির চেক প্রস্তত করেন। কিছু শ্রমিক সেই চেকে টিপসহি বা স্বাক্ষর প্রদান করলেও বাকি চেকে শ্রমিকের পরিবর্তে প্রকল্প সভাপতি-সেক্রেটারি স্বাক্ষর বা টিপসহি দিয়ে থাকেন। পরবর্তীতে চুক্তি অনুযায়ী প্রতি শ্রমিকের মজুরি প্রদান বাবদ ৩০০টাকা করে ঘুষ কেটে রেখে সকল শ্রমিকের মজুরির টাকা একসঙ্গে প্রকল্প সভাপতি-সেক্রেটারির অনুকূলে দিয়ে দেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ক্যাশিয়ার। তবে এসব মজুরির টাকা প্রদানে দু'একটি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক তাদের সাধ্যমতো নিয়মনীতি অনুসরণের চেষ্টা করে থাকেন।

প্রকল্পে ভূয়া শ্রমিকদের মজুরির টাকা বন্টন

প্রকল্প কাজের তালিকায় শ্রমিক হিসেবে নাম আছে, তবে তারা কাজ করেন না। এমন শ্রমিকদের মজুরির টাকা বন্টন হয়। প্রকল্পের পাঁচজন শ্রমিকের মজুরি (জনপ্রতি ৮,০০০ করে মোট ৪০,০০০টাকা) পান উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। দুইজন শ্রমিকের মজুরির টাকা নেন সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান। আর বাকি শ্রমিকদের মজুরির টাকা বাগিয়ে নেন প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি-সেক্রেটারি সহ অন্যান্যরা।

এ ব্যাপারে সরাইল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোঃ সাইফুল ইসলাম জানান, অনিয়মের অভিযোগ পেয়ে উপজেলার কর্মসূচির একটি প্রকল্প বাদে সকল প্রকল্পের বিল প্রদান বন্ধ রাখা হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অবগত আছেন। তবে অনিয়মের বিষয়গুলো তদন্ত চলছে। কর্মসূচির কোন শ্রমিকের টাকা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের কেউ নেন, এমন অভিযোগ সঠিক নয়।

পিএনএস/মোঃ শ্যামল ইসলাম রাসেল

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech