ভয়ঙ্কর ইলেকট্রিক শকে নিষ্ঠুর নির্যাতন

  

পিএনএস ডেস্ক: জেরার মুখে র‌্যাব জানতে পারে, কমলাপুরে যুবলীগ নেতা খালেদের একটি ডেরা রয়েছে। সেখানে তিনি যান বিশেষ বিশেষ সময়ে। নিতান্তই ব্যক্তিগত কাজে। র‌্যাবের দল সেই আস্তানার খোঁজে অভিযান চালায়। আস্তানার খোঁজও মিলে যায়। গত বুধবার গ্রেফতারের পর ব্যাপক জেরার মুখে খালেদ তার এই আস্তানার তথ্য দেয় র‌্যাবের কাছে। রাজধানীর কমলাপুরের রেল স্টেশনের ঠিক উল্টো দিকে ইস্টার্ন কমলাপুর টাওয়ার। সেই টাওয়ারের চতুর্থ তলাতেই মিলে গেল ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার আস্তানা। র্যা বের দল সেখানে ঢুকেই হতবাক। বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা ধরনের মোটা লাঠি, বেসবল খেলার ব্যাট। একটি বিশেষ গোপন কক্ষে ঢুকেই আবিষ্কার করে এক ভয়ঙ্কর টর্চার সেল। টর্চারের বিভিন্ন সরঞ্জামাদি দেখে র্যারব কর্মকর্তারা আঁতকে ওঠেন। দুটি ৫ ভোল্টের ইলেকট্রিক শক দেওয়ার যন্ত্র। রয়েছে আরও নানা যন্ত্রপাতি। অত্যাচারের কায়দাকানুন এবং যন্ত্রপাতি দেখে র্যাঁব কর্মকর্তারা নিশ্চিত যে, এখানেই মানুষজনকে ধরে নিয়ে এসে নির্যাতন করত খালেদ। চাঁদা দিতে কোনো ব্যক্তি অস্বীকৃতি জানালে তাকে এ টর্চার সেলে এনে অমানুষিক নির্যাতন করা হতো। অভিযানে অংশ নেওয়া একজন সদস্য জানান, ওই টর্চার সেলের কক্ষের দেয়ালের কিছু স্থানে ছোপ ছোপ রক্তের দাগও মিলেছে। র্যা ব-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল শফিউল্লাহ বুলবুল বলেন, খালেদ অস্ত্র-গুলিসহ গ্রেফতারের পর আমরা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এমন ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে টর্চার সেলের সন্ধান পাই ও অভিযান পরিচালনা করি। অভিযানে টর্চার সেল থেকে ইলেকট্রিক শক দেওয়ার অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, গায়ের চামড়া জ্বলে-জ্বালাপোড়া করে এমন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, বিপুল পরিমাণ লাঠিসোঁটা, হকিস্টিক দেখতে পাই। সেগুলো আমরা জব্দ করি। তিনি বলেন, এখানে যা দেখছি লোম শিউরে ওঠার মতো অবস্থা।

র‌্যাব জানায়, টর্চার সেলে নির্যাতনের অনেক ধরনের যন্ত্রপাতি আমরা পেয়েছি।

উচ্চ মাত্রায় সুদসহ পাওয়া টাকা আদায় সব ধরনের কাজে ব্যবহার করা হতো এই টর্চার সেল। রাত গভীর পর্যন্ত খালেদের টর্চার সেলে অভিযান চলমান রয়েছে। এখানে যা দেখছি লোম শিউরে ওঠার মতো অবস্থা হয়েছে আমাদের।

র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। মতিঝিল-ফকিরাপুল ক্লাবপাড়ায় ক্যাসিনো থেকে শুরু করে কমপক্ষে সাতটি সরকারি ভবনে ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি জমি দখলের মতো নানা অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। ২০১২ সালের পর ঢাকার এক অংশের নিয়ন্ত্রণ আসে খালেদের হাতে। নিজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সর্বোচ্চ শক্তি ব্যবহার করেন তিনি। অভিযোগ থেকে জানা যায়, রাজধানীর মতিঝিল, ফকিরাপুল এলাকায় কমপক্ষে ১৭টি ক্লাব নিয়ন্ত্রণ করেন এই যুবলীগ নেতা। এর মধ্যে ১৬টি ক্লাব নিজের লোকজন দিয়ে আর ফকিরাপুল ইয়াং ম্যানস নামের ক্লাবটি সরাসরি তিনি পরিচালনা করেন। প্রতিটি ক্লাব থেকে প্রতিদিন কমপক্ষে এক লাখ টাকা নেন তিনি। এসব ক্লাবে সকাল ১০টা থেকে ভোর পর্যন্ত ক্যাসিনোতে চলে জুয়া। সেখানে মাদকের ছড়াছড়ি। পাওয়া যায় ইয়াবাও।

খিলগাঁও-শাহজাহানপুর হয়ে চলাচলকারী লেগুনা ও গণপরিবহন থেকে নিয়মিত টাকা দিতে হয় খালেদকে। প্রতি কোরবানির ঈদে শাহজাহানপুর কলোনি মাঠ, মেরাদিয়া ও কমলাপুর পশুর হাট নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। খিলগাঁও রেল ক্রসিংয়ে প্রতিদিন রাতে মাছের একটি হাট বসান এই নেতা। সেখান থেকে মাসে কমপক্ষে এক কোটি টাকা আদায় করেন তিনি। একইভাবে খিলগাঁও কাঁচাবাজারের সভাপতির পদটিও দীর্ঘদিন তিনি ধরে রেখেছেন। শাহজাহানপুরে রেলওয়ের জমি দখল করে দোকান ও ক্লাব নির্মাণ করেছেন।

যেভাবে খালেদের উত্থান : যুবলীগ নেতা খালেদের বাড়ি কুমিল্লায়। তিনি শান্তিনগরের হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে পড়াশোনা করেছেন। ওই সময় কলেজে তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে পুলিশের সঙ্গে তার সংঘর্ষ বাধে। পুলিশের গুলিতে তার একটি পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই থেকেই তাকে ল্যাংড়া খালেদ নামে অনেকে চেনে। ১৯৮৭ সালে ফ্রিডম মানিক ও ফ্রিডম রাসুর নেতৃত্বে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে হামলা হয়। এ দুই নেতার হাত ধরেই খালেদের উত্থান। ২০০২ সালে বিএনপির নেতা মির্জা আব্বাসের ভাই মির্জা খোকনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন খালেদ। ২০১১ সালে মোহাম্মদপুরে ঢাকা মহানগর উত্তরে সহসভাপতি গিয়াস উদ্দিন বাবু ওরফে লীগ বাবু খুন হন। ওই খুনের সঙ্গে খালেদের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগ আছে।

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech