বিশ্বের ৮৫ ভাগ জ্বালানীর চাহিদা মেটানো হচ্ছে তেল গ্যাস ও কয়লা থেকে

  

পিএনএস, এবিসিদ্দিক : বিশ্বের জ্বালানীর মোট চাহিদার শতকরা ৮৫ ভাগই তেল, গ্যাস ও কয়লা পূরণ করেছে। ৩৭ ভাগ চাহিদা পূরণ হয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানী বা ফসিল ফুয়েলের মাধ্যমে। ২৩ ভাগ জ্বালানী চাহিদা মিটেছে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে এবং ২৫ ভাগ বিশ্ব জ্বালানীর চাহিদা পূরণ হয়েছে প্রাকৃতিক কয়লা থেকে। কয়লার মজুদ ও উত্তোলণের প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে কয়েক’শ বিলিয়ন টন কয়লা জনকল্যাণে তেমন কোনো কাজেই আসছেনা। বিশ্ব চাহিদার শতকরা ২৫ ভাগ কয়লা থেকেই উৎপন্ন হচ্ছে পৃথিবীর মোট ৫৭ ভাগ বিদ্যুৎ।

এ কথাও সত্য যে, পৃথিবীর মোট কার্বন নিঃসরণের শতকরা ৪৩ ভাগই হচ্ছে কয়লা পুড়ানোর কারণে, যা জলবায়ু পরিবর্তনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। আর এই ৪৩ ভাগ কার্বন নিঃসরিত হচ্ছে ২.৭ বিলিয়ন টন কয়লা পুড়ানোর ফলে। কার্বন পুড়ানোর দিক থেকে ভারত প্রথম ও চীন নবম স্থান দখল করে আছে। পৃথিবীর প্রায় শতকরা ১৭ ভাগ বিদ্যুৎ উৎপন্ন হচ্ছে পারমানবিক তাপ শক্তির বিকিরণের ফলে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানীর মোট চাহিদার ২৫ ভাগই পূরণ হচ্ছে নিজস্ব জীবাশ্ম জ্বালানীর খনির উৎপাদন থেকে এবং শতকরা ৭০ ভাগ জ্বালানীই যুক্তরাষ্ট্র আমদানি করে থাকে পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদ সমৃদ্ধ দেশগুলো থেকে। তেল সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে মধ্য প্রাচ্যের খ্যাতি বিশ্ব জুড়ে।

পৃথিবীর ৬১ ভাগ তেল খনি এ অঞ্চলে অবস্থিত। রাশিয়ায় পৃথিবীর মোট জীবাশ্ম জ্বালানীর মজুদ রয়েছে ২.৪ ভাগ। যুক্তরাষ্ট্র, মধ্য প্রাচ্য ও রাশিয়ায় প্রাকৃতিক সম্পদের মোট মজুদের পরিমাণ রয়েছে প্রায় ৯০ ভাগ। বাকি ১০ভাগ রয়েছে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে। তাই পেট্রোডলারের রাজনীতির উত্থান পতন এই দেশগুলোর ইচ্ছা অনিচ্ছার উপরই অনেকটা নির্ভরশীল। অতিস¤প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালির্ফোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে একদল গবেষক গবেষণালব্দ ফলাফল থেকে ভবিষ্যত বাণী করেছে আগামি শতাব্দীতে পৃথিবীর জীবাশ্ম জ্বালানী বা ফসিল ফুয়েলের আধার ধীরে ধীরে প্রায় শূণ্যের কাছাকাছি এসে যাবে।

অবশিষ্ট জ্বালানী মজুদ থেকে যা উৎপাদন হবে তা দিয়ে পৃথিবীর চাহিদার মাত্র ১০ ভাগ পূরণ করা সম্ভব হবে। তাই খনিজ সম্পদ ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনার উপরই জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞ মহল। বিকল্প জ্বালানীর উদ্ভাবন নিয়ে হৈচৈ শুরু হয়েছে গোটা পৃথিবীতে । স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্র বিকল্প জ্বালানীর উদ্ভাবন নিয়ে গবেষণার জন্য কয়েক বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বিশ্ব রাজনীতির নেতৃত্বে টিকে থাকার জন্য।

এখন পর্যন্ত তেল কূপ থেকে উৎপাদিত আবিষ্কৃত তেলের মোট মজুদ রয়েছে ২০০ ট্রিলিয়ন ব্যারেল। পৃথিবীর প্রতিবছর মোট তেলের চাহিদা রয়েছে ৩১ বিলিয়ন ব্যারেল। আর তেলের মূল্য প্রতিবছরই ক্রম বৃদ্ধি হারে বেড়ে চলছে। গত পাঁচ বছরে তেলের মূল্য বেড়েছে প্রায় দ্বিগুন। ২০০৫ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ছিল ৫৫ইউএস ডলার, যা বর্তমানে ৯০ ডলারের গড়িয়েছে।

একদিকে তেলের দামের বৃদ্ধিতে বিশ্ব অর্থনীতিতে গড়পড়তা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে তেলের মজুদ নিঃশেষ হওয়ার পথে যা বিশ্বকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে। গত ৩০ বছরে নতুন তেল কূপ খনন বা রিজার্ভ তেমন একটা আবিষ্কৃত হয়নি। দু’চারটা নতুন তেল কূপের সন্ধান পাওয়া গেলেও এ থেকে রেকর্ড সংখ্যক উৎপাদন যোগ হয়নি কিন্বা আশা করা যায়নি। ভূবিজ্ঞানিদের গবেষণায় এটা স্পষ্ট যে, পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদের মজুদ নিম্ন মুখী। তবে অতিস¤প্রতি ব্রাজিল তার উপসাগরে বিপুল পরিমাণে প্রাকৃতিক তেলের মজুদ আবিষ্কৃত হয়েছে বলে দাবি করছে।

ফলে ব্রাজিলের অবস্থানও বিশ্ব দরবারে শক্ত ভীত রচনা করতে যাচ্ছে বলে ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। যা হয়তো বিশ্বকে নতুন করে আশান্বিত করে তুলবে। এখন পর্যন্ত পৃথিবী তিনটি বড়ো ধরণের এ্যানার্জি ক্রাইসিসের মুখোমুখি হয়েছে। ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তেল উৎপাদন নিম্ন মুখী হওয়া শুরু করে যা ১৯৯০ সাল পর্যন্ত স্থিতি অবস্থায় বিরাজ করেছে। ২০০৬ সালে মেক্সিকোতে হঠাৎ করেই তেল উৎপাদনের হার কমা শুরু করে, যা অদ্যাবধি স্থিতি অবস্থায় রয়েছে।

১৯৭৩ সালের তেলের উৎপাদনের বিপরীতে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহ দিতে না পারায় ওপেকভুক্ত দেশ সমুহে দারুন অস্থিরতা তৈরি হয় ফলে সরবরাহের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসে। ১৯৭৯ সালে পৃথিবী পুনরায় এ্যানার্জি ক্রাইসিসের মুখোমুখি হয় এবং ১৯৯০ সালে তেলের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় অর্থনীতির বাজারে চরম মন্দাভাব দেখা দেয়। বর্তমান তেলের যে মজুদ রয়েছে তা দিয়ে হয়তো ভালোভাবে আগামি ৪০ বছর চলা যেতে পারে। এর মধ্যে যদি নতুন কোন আধার আবিষ্কার করা না যায় বা নতুন কোন তেলকূপ খনন করা না যায় তবে তা পৃথিবীকে গভীর এক সংকটে ফেলে দেবে। যা থেকে উত্তরণে এখনই বিকল্প ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটাতে হবে। ভূজ্ঞিানীদের গবেষনায় এটা ¯পষ্ট যে, কেবল প্রতিবছর ৩-৫ ভাগ জ্বালানী ব্যবহারজনিত অজ্ঞতার কারণে অপচয় হচ্ছে, যা দিয়ে পৃথিবী চাহিদার অনেকাংশই পূরণ করা সম্ভব। বিশেষ করে বাংলাদেশের মোট চাহিদার বেশি পৃথিবীজুড়ে অপচয় হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাৎসরিক তেল ব্যবহারের হার পৃথিবীর প্রায় ২৫ভাগ। জাপানে ব্যহৃত হয় শতকরা ১৪ ভাগ। স্পেনে ব্যবহৃত হয় ১৩.৮ ভাগ। মেক্সিকোতে শতকরা ৬ ভাগ, ব্রাজিলে ৩.৫ ভাগ, চীনে ১.৫ ভাগ এবং ভারত ব্যবহার করে মাত্র ০.৮ ভাগ (সূত্র: সিমন্স এ্যান্ড কোম্পানি ইন্টারন্যাশনাল)। বিশ্বজুড়ে তেলের চাহিদা মেটাতে গিয়ে প্রতিদিনকার চাহিদা দাঁড়িয়েছে ৩১ বিলিয়ন ব্যারেল এবং এ চাহিদা প্রতিবছর ৩.৮ ভাগে উন্নীত হচ্ছে। বিশ্বের এমন ক্রান্তিলগ্নে বিকল্প জ্বালানীর কথা জোড়েশোড়েই ধ্বনিত হচ্ছে।

বায়ু, পানি ও সৌরালোকের ব্যবহারের দিকেই নজর দিচ্ছে তাবৎ দুনিয়ার ভূবিজ্ঞানিরা। এর মধ্যে সূর্যের আলোর ব্যবহারের নানান কৌশলও নিরূপন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সোলার প্যানেল দুনিয়াজুড়েই খুব পরিচিত শব্দ হয়ে উঠছে। সূর্যের আলোর বিশাল এই শক্তির উৎস নিয়ে রীতিমতো গবেষণা ও প্রয়োগের সহজলভ্য দিক উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করছে পৃথিবীর বড়ো বড়ো বিজ্ঞানীরা। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউস থেকে শুরু করে বড়ো বড়ো বাণিজ্যিক ভবনে সোলার প্যানেলের ব্যবহার বিশ্বকে বিকল্প জ্বালানীর ব্যবহারের উদাত্ত আহবান জানাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে যুক্তরাজ্য, চীন, জাপান, ভারত ও ইউরোপিয় অঞ্চলে সৌর শক্তির ব্যবহারের রীতিমতো প্রতিযোগীতা শুরু হয়েছে।

এমনকি বাংলাদেশও বিকল্প জ্বালানীর দিকে ঝুঁকছে ভালোভাবেই। সরকারি হিসেব মতে, ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রায় ৪০লাখ পরিবারের মধ্যে সোলার প্যানেল সাপ্লাই দেয়া হয়েছে। আগামি বছর দু’য়েকের মধ্যে আরো ৪০লাখ পরিবারকে সোলার প্যানেলের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস, প্রাকৃতিক তেল ও ইউরেনিয়ামের মজুদের সীমাবদ্ধতা ও অনবায়ণযোগ্য হওয়ায় এ সম্পদের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে হবে। কেননা প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধ মজুদ একদিন না একদিন নিঃশেষ হয়ে যাবে। তাই পৃথিবীকে বিকল্প শক্তির দিকে ধাবিত হতে হবে। যে শক্তি হবে নবায়ণযোগ্য। আর তাই সৌরশক্তির সহজলভ্যতা পৃথিবীকে নতুন করে সাহস যুগাতে পারে।

বিশ্বায়নের যুগে একদিকে অনবায়ণযোগ্য শক্তির নিঃশেষ হয়ে যাওয়া, তার উপর গ্রিনহাউস গ্যাসের আধিক্য পৃথিবীকে অস্থির করে তুলছে। এখনো পৃথিবীজুড়ে কয়েক’শ বিলিয়ন টন কয়লার মজুদ রয়েছে কিন্তু কার্বন নিঃসরণ ভয়ানকভাবে পৃথিবীকে গ্রাস করে ফেলছে। যা পৃথিবীর অস্তিত্বকে মারাতœক হুমকির মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। হয়তো পৃথিবীর অস্তিত্বের কথা বিবেচনায় এনে অবশিষ্ট কয়লার মজুদ অব্যবহৃতই থেকে যাবে অনেক বছর। পরিবেশ প্রতিবেশসহ জীব বৈচিত্রের কথা বিবেচনা এনে গ্রিন পৃথিবী বির্নিমাণে কার্বন সমৃদ্ধ কয়লা মানুষের কল্যাণে খুব বেশিদিন আর ব্যবহার করা যাবেনা ।

তাই নবায়ণযোগ্য শক্তির পুন:সংযোজন একান্তই অপরিহার্য্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। সূর্যালোকের ব্যবহারে মানুষকে আবার অভ্যস্ত হতে হবে টিকে থাকার লড়াইয়ে। শুধু সূর্যালোক নয়, মানুষকে সংশ্লিষ্ট হতে হবে বায়ুর ব্যবহারে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়ায়। জলবিদ্যুতের দিকেও সমানহারে ঝুঁকে পড়তে হবে আধুনিকতা ও সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে। সামনের দিনগুলোতে যে জাতি যতোবেশি বিকল্প শক্তির উৎস সন্ধানে সফল হবে সে জাতি ততবেশি প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাবে তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। তাই পৃথিবী এখন বিকল্প শক্তির সন্ধানে মরিয়া।

পিএনএস/মো: শ্যামল ইসলাম রাসেল

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech