২০১৬ সালে দেশের সার্বিক অর্থনীতি খুব একটা ভাল যায়নি

  

পিএনএস, এবিসিদ্দিক : গত হলো ২০১৬ সাল। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা খুব একটা ভাল যায়নি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে খানিকটা ইতিবাচক দিক থাকলেও নেতিবাচক অবস্থায়ই কেটেছে অর্থনৈতিক অবস্থা। বিনিয়োগে ভাটার টান রয়েই গেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে। ব্যাংকে পাহাড় পরিমাণ অলস টাকা। খেলাপী ঋনের পরিমান বেড়েছে। রফতানি আয় পূর্ববর্তী অর্থবছরের চেয়ে কিছুটা বাড়লে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী গেলো বছরে কমেছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী ছয় মাসে কিছুটা পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে। জ¦ালানী তেলে দাম কমানো হলে সাধারণ মানুষ কোন সুফল পায়নি।

অপরদিকে গ্যাস- বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির চাপ জনগনের উপর পড়েছে। পণ্যমূল্য বৃদ্ধি অব্যাহতই আছে বা বছর জুড়ে ছিল। জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়ছেও এনিয়ে আছে নানা বিতর্ক। জনশক্তি রফতানি ও রেমিট্যান্স বেড়েছে। বিদ্যুৎ খাতে অগ্রগতি হলেও কমছে গ্যাসের উৎপাদন। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের (জুলাই-নভেম্বর) পাঁচ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে ২৩ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকার বা ১৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ১৭ হাজার ১১ কোটি টাকা বা ১০ শতাংশ। এর মধ্যে মোট ১ হাজার ৩৬৫টি প্রকল্পের আওতায় ব্যয় হয়েছে ১৬ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা।

বাকিটা অন্য উন্নয়ন খাতে। ১০ বৃহৎ প্রকল্প নিয়ে সরকারের প্রত্যাশা অনেক। দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে প্রকল্পগুলো জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের তাগিদ রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার।সে জন্যই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সম্ভাব্য স্বল্পতম সময়ে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সেগুলো ফার্স্ব ট্র্যাক প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। কিন্তু ফার্স্ট ট্র্যাকে থাকা বাংলাদেশের ১০ প্রকল্পের মধ্যে শুধু পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে যথেষ্ট অগ্রগতি রয়েছে। বাকি ৯ প্রকল্প বাস্তবায়নে পদ্মা সেতু ছাড়া বাকি প্রকল্পগুলোর সর্বশেষ অবস্থা খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফ্রার্স্ট ট্র্যাকে অন্তর্ভুক্ত কক্সবাজারে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প আদৌ বাস্তবায়িত হবে কি না তা নিয়ে দ্বিধায় আছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা।

ব্যাংকিং খাতে খুব একটা ভাল যানি ২০১৬ সালে। রিজার্ভ চুরির ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই বেসরকারি খাতের তিন ব্যাংকের কার্ড জালিয়াতি করে টাকা তুলে নেওয়া হয়। দুটি ঘটনাতেই সরাসরি বিদেশিদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। ২০১৬ সালে খেলাপি ঋণও লাগামহীন বাড়তে থাকে। রিজার্ভ চুরির ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের পদত্যাগের পর দুর্বল হয়ে পড়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। যার প্রভাবে পুরো ব্যাংক খাত হয়ে পড়েছে নিয়ন্ত্রণহীন। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের হিসাব থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরি হয়।

এ ঘটনায় দায় স্বীকার করে পদত্যাগে বাধ্য হন তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান। সরিয়ে দেওয়া হয় দুই ডেপুটি গভর্নরকেও। চুরি হওয়া অংশের কিছু ফেরত পাওয়ার পর বাকি রয়েছে ৬ কোটি ৫৮ লাখ ডলার। তা ফেরত পাওয়া নিয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টও আলোর মুখ দেখেনি। বাংলাদেশ দায়ী করছে বিদেশিদের আর তারাও বাংলাদেশের ওপর দায় চাপাচ্ছে। রিজার্ভ চুরির ঘটনা এখন সারা বিশ্বে বড় সাইবার চুরি হিসেবে পরিচিত। ব্যাংকে লাইন দেওয়ার পরিবর্তে সহজেই টাকা তুলতে গ্রাহকেরা এটিএম ব্যবহার করছেন।

তবে ৬ ফেব্রয়ারি তিন ব্যাংকের কার্ড জালিয়াতির ঘটনা সবার মাঝে ভীতি ছড়িয়ে দেয়। এদিন বেসরকারি খাতের ইস্টার্ন, সিটি ও ইউসিবিএলের চার এটিএম বুথে স্কিমিং মেশিন দিয়ে কার্ড জালিয়াতি করা হয়। পরে নতুন কার্ড তৈরি করে গ্রাহকের হিসাব থেকে টাকা তুলে নেয় বিদেশিরা। এ ঘটনায় বিদেশিদের পাশাপাশি ব্যাংক কর্মকর্তাদেরও সম্পৃক্ততা পায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ২০১৫ সালের পর ২০১৬ সালেও অগ্রণী ব্যাংক নিয়ে বিপাকে ছিল অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক। আমানতকারীদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করায় গত ২৯ জুন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ আবদুল হামিদকে অপসারণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাঁর বিরুদ্ধে ৯০৬ কোটি টাকা অনিয়মের অভিযোগ আনা হলেও পরে ৭৯২ কোটি টাকা অনিয়মের জন্য অভিযোগ গঠন করা হয়। এমডিকে অপসারণের পর অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ৩০ জুন জ্যেষ্ঠ ডিএমডি মিজানুর রহমান খানকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এমডির দায়িত্ব দেওয়া হয়। সকালে দায়িত্ব পাওয়ার পর বিকেলে দুর্নীতি দমন কমিশন তাঁকে আটক করে। খেলাপি ঋণ এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে ২০১৫ সালে নানা উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণ নীতিমালা ও তদারকি করার কথা থাকলেও নিজেই গ্রাহকদের ঋণ পুনঃ তফসিল করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান নিজের গ্রুপের ঋণে বিশেষ সুবিধা দাবি করলে ২০১৫ সালে ৫০০ কোটি টাকার বেশি সব গ্রহীতার জন্যই ঋণ পুনর্গঠন নীতিমালা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এ সময়ে ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ বিশেষ সুবিধায় পুনর্গঠন করা হয়। ফলে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ কমে আসে। তবে ২০১৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়েই খেলাপি ঋণ বেড়ে হয় ১১ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা। ফলে গত জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৩ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ৬৫ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। এ ছাড়া অবলোপন করা হয় ৪২ হাজার ৩২১ কোটি টাকার ঋণ। দুটোকে হিসাবে নিয়ে ২০১৬ সালে ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায় ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ।

২০১৬ সাল বিনিয়োগের ভাটার মধ্যেই কেটেছে। বিদেশি বড় কোন বিনিয়োগ নেই। যা আছে কাগজপত্রে। দেশিয় বিনিয়োগ প্রায় শূণ্যের মধ্যেই কেটেছে বছরটি। উল্লেখ্য-প্রতি বছর বিদেশীদের যে পরিমাণ প্রতিশ্রুতি আসে, বাস্তবায়ন হয় তার ১০ শতাংশেরও কম। বেশিরভাগ কোম্পানিই নিবন্ধন করে প্রত্যাশিত সুযোগ-সুবিধা না পেয়ে চলে যায়। হাতেগোনা দু-একটি কোম্পানি বিনিয়োগ করলেও আয়ের বড় অংশই ওইসব দেশের শ্রমিকরা রেমিটেন্স আকারে দেশে নিয়ে যায়। অর্থাৎ বিদেশী কোম্পানি দেশের মানুষের কর্মসংস্থানেও খুব বেশি কাজে আসছে না।

বিনিয়োগের এই দুরবস্থা সরকারও স্বীকার করছে। কিন্তু সরকার স্বস্তির জন্য বিনিয়োগের যেসব তথ্য প্রচার করছে, তাও কাগজে সীমাবদ্ধ। কতটুকু বাস্তবায়ন হয়, সরকারি কোনো সংস্থা তার হিসাবও রাখে না। বিনিয়োগ বোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা শুধু নিবন্ধনের কাজ করে। কী পরিমাণ বাস্তবায়ন হয়, ওই হিসাব তাদের কাছে নেই। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিনিয়োগের সরকারি তথ্যে শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। তাদের সহজ কথা- পরিবেশ নেই, তাই বিনিয়োগ হয় না। বিনিয়োগ না হওয়ার কারণেই দেশের বাইরে অর্থ পাচার হচ্ছে।

বছরটিতে দ্রব্য মূল্যবৃদ্ধি লেগেই ছিল বা আছে। ববি’র হিসাবে মূল্যস্ফীতি কমলেও বাজার দর বেড়েছেই চলছে। রাষ্ট্রায়ত্ব বাণিজ্য সংস্থা টিসিবি’র বাজার দরে দেখানো হয়েছে গত একবছরে(২০-১২-২০১৫/২০-১২-২০১৬) সুরু চালের দাম ৮ দশমিক ৭০, মাঝারি ৬ দশমিক ১২, মোটা চালের দাম বেড়েছে ১০ দশমিক ৬১ শতাংশ। গত এক বছরের ব্যবধানে আটা-ময়দার দাম কিছুটা কমলেও গত একমাস যাবত আবার বাড়ছে। গত একবছরের ব্যবধানে সয়াবিন তেলের দাম (লুজ) বেড়েছে ১০ দশমিক ৫৬ শতাংশ, পাম তেল ২৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ। একবছরের ব্যবধানে ৪৭ দশমিক ৭৮শতাং, আর লবনের দাম বেড়েছে ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এমনি ভাবে প্রতিটি ভোগ্য পণ্যের দাম বাড়ছে। তারপরও বলা হচ্ছে যে, মূল্যস্ফীতি কমছে।

এটা হিসাবের গড় মিল না লোক ভুলানো তথ্য? কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) হিসাব অনুযায়ী, ২০০৫ সালে প্রতি কেজি কাটারিভোগ চালের দাম ছিল ৩২ টাকা, মিনিকেট ২৪ টাকা, নাজিরশাইল ২৩ টাকা, আমন পাইজাম ২২ টাকা ও পারিজা চালের দাম ছিল ১৯ টাকা। এসব চালের গড় দাম ছিল ২৪ টাকা। ২০০৬ সালে প্রতি কেজি কাটারিভোগ চালের দাম ছিল ৩৮ টাকা, মিনিকেট ২৮ টাকা, নাজিরশাইল ২৬ টাকা, আমন পাইজাম ২৩ টাকা ও পারিজা চালের দাম ছিল ২০ টাকা। এসব চালের গড় দাম ছিল ২৭ টাকা। আর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে বলা হয়েছিল ২০০৬ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ, খাদ্যের মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

এদিকে ২০১৬ সালের প্রথম ১১ মাসে (জানুয়ারি-নভেম্বর) প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে। এর মধ্যে গত অর্থবছরের শেষ ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) আদায় হয়েছে ৯৭ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা। আর পরের পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) ৪৯ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় করেছে এনবিআর। রাজস্ব আদায় ছাড়াও এ বছর এনবিআর বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।

এনবিআরের জন্য ২০১৬ সালের সুখবর হলো, বিশ্বব্যাংকের লজিস্টিক পারফরম্যান্স সূচক (এলপিআই) ২০১৬-তে বাংলাদেশ দুই বছরের ব্যবধানে ৩১ ধাপ এগিয়েছে। ২০১৬ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬০টি দেশের মধ্যে ৮৭তম। ২০১৪ সালে অবস্থান ছিল ১০৮তম। মূলত শুল্কায়ন ব্যবস্থাপনায় অটোমেশন পদ্ধতির উন্নতি হওয়ায় বাংলাদেশের উন্নতি হয়েছে। প্রতি দুই বছর পরপর এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রবৃদ্ধি কিছুটা ওঠানামার মধ্যে থাকলেও শেষ পর্যন্ত পণ্য রপ্তানি আয় সন্তোষজনকই ছিল। বছরের প্রথম নয় মাসের মধ্যে সাত মাসই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

পিএনএস/মো: শ্যামল ইসলাম রাসেল

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech