কাতারে সবজি রফতানির পরিমাণ কমেছে

  

পিএনএস ডেস্ক: কাতারে সবজি রফতানি কমছে। সদ্য বিদায়ী অর্থবছর (২০১৬-১৭) বাংলাদেশ থেকে কাতারে সবজি রফতানির পরিমাণ ছিল ৫ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটি গত ৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এজন্য রফতানি সংশ্লিষ্টরা কাতার ইস্যুতে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সংকটকে দায়ী করেছেন। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন। গত পাঁচ বছরে কাতারে শুধু সবজি নয়, সব ধরনের পণ্য রফতানিই কমেছে। তবে এ প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ জানান, ‘কাতার ইস্যুতে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সংকট কোনও সমস্যা সৃষ্টি করেনি। ভবিষ্যতেও সমস্যা সৃষ্টি করবে না। এই ইস্যুতে বাংলাদেশের সবজি রফতানি কমবে না।’

কাতার ও সৌদি সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের সম্পর্ক অত্যন্ত চমৎকার উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সে দেশে বাংলাদেশ দূতাবাস ও কমার্শিয়াল কাউন্সিলরকে এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১২-১৩ অর্থবছর বাংলাদেশ থেকে কাতারে সবজি রফতানির পরিমাণ ছিল ৭ দশমিক ৬৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৩-১৪ অর্থবছর রফতানির পরিমাণ ছিলো ১০ দশমিক ০৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৪-১৫ অর্থবছর ছিল ৫ দশমিক ৯৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৫-১৬ অর্থবছর ছিল ১৫ দশমিক ৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং সদ্য সমাপ্ত ২০১৬-১৭ অর্থবছর বাংলাদেশ থেকে কাতারে সবজি রফতানির পরিমাণ ছিল ৫ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন মর্কিন ডলার।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে কাতারসহ বিশ্বের ৪৮টি বাংলাদেশের সবজি কমবেশি রফতানি হয়। এই ৪৮টি দেশের মধ্যে ২০১৬-১৭ অর্থবছর বাংলাদেশে থেকে সবচেয়ে বেশি সবজি রফতানি হয়েছে সৌদি আরব। উল্লিখিত বছর সৌদি আরব সবজি রফতানির পরিমাণ ছিল ২১ দশমিক ০৮ বিলিয়ম মার্কিন ডলার। যদিও এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৫-১৬ অর্থবছরের তুলনায় রফতানি কমেছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছর বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরব সবজি রফতানি হয়েছে ২৫ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সবজি রফতানির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মালয়েশিয়া। ২০১৬-১৭ অর্থবছর মালয়েশিয়ায় সবজি রফতানি হয়েছে ১৪ দশমিক ১২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছর সবচেয়ে কম সবজি রফতানি হয়েছে ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, রাশিয়া, নিউজিল্যান্ড, জর্দান, ভারত, সুইজারল্যান্ড ও বেলজিয়াম। ২০১৬-১৭ অর্থবছর এ সব দেশে বাংলাদেশ থেকে সবজি রফতানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ মার্কিন ডলার।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যে রফতানি করা সবজির প্রায় ৬০ শতাংশ এবং বাকি ৪০ শতাংশ ইউরোপসহ অন্যান্য দেশে যায়। এসব সবজির মধ্যে করলা, কাঁকরোল, টমেটো, পেঁপে, বেগুন, ঢেঁড়স, লাউ, কচুর লতি, কচুরমুখি, মিষ্টি কুমড়া, বরবটি, কাঁঠালের বিচি, শসা, চিচিঙ্গা, লালশাক, পুঁইশাক, ফুলকপি, বাঁধাকপি, কাঁচামরিচ, ধনে পাতা, পটল ও ঝিঙা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া প্রক্রিয়াজাত সবজির মধ্যে ডাঁটা, কচুর লতি, শিমের বিচি, কাঁচকলা, কলার মোচা, কচুশাক ও কাঁঠাল বিচি রফতানি হচ্ছে।

এর বাইরে আলুও রফতানি হচ্ছে। এ পণ্যটি কাতার, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বছর রাশিয়ায় প্রায় ২৫ হাজার টন আলু রফতানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এবার ভারত সরকার বাংলাদেশ থেকে আলু আমদানির আগ্রহ দেখিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে। অথচ এর আগে বিশ্বের ২০টি দেশ থেকে বাংলাদেশকে আলু আমদানি করতে হতো।

রফতানি সংশ্লিষ্টরা বলছেন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী অনেক বাংলাদেশি ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকরিসূত্রে বসবাস করছেন, যারা এই সবজির বড় ভোক্তা। তারাই সবজি রফতানির বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করতে পারেন। এছাড়া ইউরোপেও বাংলাদেশের সবজি ও ফলমূলের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হচ্ছে। শুধু দুবাইয়ে বাংলাদেশি শাক-সবজি ও ফলমূলের চাহিদা রয়েছে প্রতিদিন ৬০ টন, লন্ডনে ৩০ টন।

বর্তমানে নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, মিরসরাই, যশোর, বগুড়া, রাজশাহী, মাগুরা, মৌলভীবাজার, দিনাজপুর, কক্সবাজার, সিলেট ও গাজীপুরের সবজি রফতানি হচ্ছে কাতারসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশে ১ কোটি ৩৮ লাখ টন সবজি উৎপাদিত হয়েছে। আর আলু উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ৮৫ লাখ টন। গত তিন বছরে সবজি উৎপাদন বৃদ্ধির হার ছিল ৬ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, ১৯৬০ সালে যেখানে কৃষি পরিবারের সংখ্যা ছিল ৫০ লাখ, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৬২ লাখ। এই কৃষকদের প্রায় সবাই পারিবারিকভাবেই উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত।

কাতার ইস্যুতে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সংকটে সবজি, ফলসহ কয়েকটি কৃষিপণ্যের রফতানিতে কিছুটা অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। অন্যান্য দেশের মতো তৈরি পোশাক কাতারে বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্য নয়। তবে পোশাকের রফতানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। চলমান সংকটে সেই সম্ভাবনাও মার খাবে বলে আশঙ্কা উদ্যোক্তাদের।

ইপিবি সূত্রে জানা গেছে, নতুন সংকটে সবজি নয়, অনন্য পণ্য রফতানিও ঝুঁকিতে পড়েছে। ইপিবির প্রদর্শিত আয়ের তুলনায় কাতারে পোশাকের প্রকৃত রফতানি সবজির তুলনায় আরও অনেক বেশি। কারণ, চীন-তুরস্কসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশ হয়ে বাংলাদেশের পোশাক যায় কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে। পোশাকের মধ্যে ওভেনের তুলনায় নিট বেশি যায় কাতারে।

জানতে চাইলে বিকেএমইএর সাবেক সহ-সভাপতি মোহম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, ‘কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে রফতানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। হঠাৎ কাতার সংকটে দেশটিতে পোশাক রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তবে সম্প্রতি ওই অঞ্চলে নিটের রফতানি বাড়তে শুরু করেছে।

সবজি রফতানিকারক ব্যবসায়ীদের সংগঠন ফ্রুটস ভেজিটেবল অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আপাতত গত কয়েক দিনে কাতারে সবজি রফতানি কিছুটা বেড়েছে। কারণ, পার্শ্ববর্তী অন্যান্য দেশ থেকে পণ্য ঢুকতে না পারায় সরাসরি বাংলাদেশ থেকেই সবজি ও ফল সংগ্রহ করতে হচ্ছে কাতারকে।’

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে কাতারে রফতানি হয়েছে তিন কোটি ৩৩ লাখ ডলারের বিভিন্ন পণ্য। সদ্য সমাপ্ত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের গত ১১ মাসে (জুলাই-মে) এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দুই কোটি ৫০ লাখ ডলার। তৈরি পোশাক থেকে এসেছে ২৬ লাখ ডলার। এর মধ্যে সবজি রফতানি হয়েছে ৫৬ লাখ ডলার। বিভিন্ন ধরনের ফল রফতানি থেকে এসেছে ৪৩ লাখ ডলার।

উল্লেখ্য, জঙ্গিবাদে অর্থ জোগান দেওয়ার অভিযোগে সম্প্রতি সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি দেশ কাতারের সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। গত ৫ জুন প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো এই সিদ্ধান্তের কারণে কাতারের অর্থনীতিতে সংকটের আলামত দেখা দেয় বলে জানা গেছে। পুঁজিবাজারের সূচক একদিনেই আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন দরে নেমেছিল। তেলের দাম আরও কমেছে।


পিএনএস/আলআমীন

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech