শীর্ষ ঋণখেলাপিদের খুঁজে পাচ্ছে না বেসিক ব্যাংক

  


পিএনএস ডেস্ক: শীর্ষ ঋণখেলাপিদের খুঁজে পাচ্ছে না বেসিক ব্যাংক। বেশিরভাগই পলাতক। ব্যাংকের শীর্ষ ১০০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের কাছে আটকে আছে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা। জালিয়াতি করে নেওয়া এসব ঋণ পরিশোধ না করে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানপ্রধান এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ফলে বিপুল অঙ্কের এ ঋণ আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এসব ঋণের অনুমোদন দিয়েছিল আবদুল হাই বাচ্চুর নেতৃত্বাধীন পর্ষদ। ২০১০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ব্যাংকটির বিভিম্ন শাখার মাধ্যমে এসব ঋণ দেওয়া হয়।

বেসিক ব্যাংকের জুনভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ১৩ হাজার ৯৪৭ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে সাত হাজার ৩৯০ কোটি টাকা খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ, মোট ঋণের ৫৩ শতাংশই খেলাপি। এর মধ্যে শীর্ষ ১০০ খেলাপির কাছে রয়েছে পাঁচ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা। আর শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছে দুই হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের মধ্যে গুলশান, দিলকুশা, শান্তিনগর, আগ্রাবাদ ও প্রধান শাখায় রয়েছে ছয় হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা। মোট খেলাপি ঋণের যা প্রায় ৮৬ শতাংশ।

আবদুল হাই বাচ্চুর সময়ে অস্তিত্বহীন ও নামসর্বস্ব অনেক প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সাম্প্রতিক এক বৈঠকে এরকম ৫৭টি প্রতিষ্ঠানের একটি তালিকা দেয় বর্তমান কর্তৃপক্ষ। গত দেড় বছরে এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫০টি প্রতিষ্ঠানের সুবিধাভোগীকে পাওয়া গেছে বলে সংসদীয় কমিটিকে জানান ব্যাংকটির এমডি খোন্দকার মো. ইকবাল। বাকি সাতটি প্রতিষ্ঠানের এখনও পরিচয় পাওয়া যায়নি।

এসব ঋণ আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন এ মজিদ গণমাধ্যমকে বলেন, খেলাপিদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ে বর্তমান কর্তৃপক্ষ কোনো ত্রুটি করছে না। সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত আছে। বিশেষ করে ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের বিষয়টি একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে বর্তমান পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকটির ৩৫৭ গ্রাহকের প্রায় চার হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। এতেও আশানুরূপ ফল আসেনি। পুনঃতফসিল করা ঋণ আবার খেলাপি হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে দুদকের মামলার পর থেকে অধিকাংশই পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

শীর্ষ খেলাপি কারা :বেসিক ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির অন্যতম সৈয়দ হাসিবুল গনি গালিব ও সৈয়দ মাহবুবুল গনি। শীর্ষ খেলাপিদের সাতটির সঙ্গে এ দু'জনসহ পরিবারের সদস্যদের সংশ্নিষ্টতা রয়েছে। তাদের কাছে ব্যাংক পাবে ৩৬০ কোটি টাকা। এর মধ্যে মেসার্স এমারেল্ড স্পেশালাইজড কোল্ডস্টোরেজের কাছে পাওনা ৮৩ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুল গনি, পরিচালক সৈয়দ হাসিবুল গনি গালিব ও এমডি সৈয়দ আবদুস শাফি। পরিচালক হিসেবে আরও আছেন সৈয়দ এনামুল গনি, সৈয়দ রেজাউল গনি, সৈয়দ মারহাবুল গনি ও সৈয়দ হাসান আল আরাফাহ। বাকি ছয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘুরেফিরে তাদের সংশ্নিষ্টতা রয়েছে। ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় দুদকের মামলায় তারা সবাই এখন পলাতক বা জেলে। তাদের মালিকানার এমারেল্ড অটো ব্রিকসের কাছে ব্যাংক পাবে ৮৫ কোটি টাকা। মেসার্স এমারেল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজের কাছে ৭৪ কোটি, সৈয়দ ট্রেডার্সের কাছে ৬৯ কোটি, ভয়েস এন্টারপ্রাইজের কাছে ৩১ কোটি ও এমারেল্ড ড্রেসেসের কাছে ১৮ কোটি টাকা।

অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে অভিনব কায়দায় বেসিক ব্যাংক থেকে ৩০৭ কোটি টাকা ঋণ নেন ওয়াহিদুর রহমান নামের এক ব্যক্তি। ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় করা দুদকের মামলার অন্যতম আসামি তিনি ও তার স্ত্রী আসমা খাতুন। কোনো ধরনের জামানত ছাড়াই মা টেক্স নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে এখন ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে ১১১ কোটি টাকা। ফিয়াজ এন্টারপ্রাইজ ৯৪ কোটি ও নিউ অটো ডিফাইনের কাছে ১০২ কোটি টাকা। এর আগে বেসরকারি খাতের কয়েকটি ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণের ঋণ নিয়ে আর ফেরত না দেওয়ায় দীর্ঘদিন ব্যাংক খাতের আলোচিত নাম ওয়াহিদুর রহমান। দীর্ঘদিন ধরে তিনি পলাতক। ধারণা করা হয়, ঋণের অধিকাংশই দেশের বাইরে পাচার করেছেন তিনি।

বেসিক ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপিদের আরেক প্রতিষ্ঠান ওয়েলটেক্স গ্রুপ। গ্রুপটির মালিকানাধীন তিনটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংকের পাওনা রয়েছে ১৮৮ কোটি টাকা। দিলকুশা শাখার খেলাপি এসব প্রতিষ্ঠানের এমডি মাজেদুল হক চিশতী। তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করে ফারমার্স ব্যাংকের নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যানের পদে থাকা বাবুল চিশতীর ভাই। প্রতিষ্ঠান তিনটির মধ্যে দ্য ওয়েলটেক্সের কাছে ব্যাংক পাবে ১২৯ কোটি টাকা। আর আবিদ ডাইং মিলসের কাছে ৪৪ কোটি এবং আনান সকসের কাছে ১৫ কোটি টাকা।

ইয়াসির আহমেদ খান নামের এক ব্যক্তি তিনটি প্রতিষ্ঠানের নামে বেসিক ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ১১৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এর মধ্যে ভাসাবি ফ্যাশনের নামে ৫০ কোটি, তাহমিনা নিটওয়্যার ৩৮ কোটি টাকা ও তাহমিনা ডেনিমের নামে নেওয়া হয় ৩০ কোটি টাকা। জুয়েল নামের এক ব্যক্তির নামে-বেনামে সৃষ্ট প্রতিষ্ঠান শিফান শিপিং লাইনের কাছে ব্যাংকের পাওনা রয়েছে ৮৮ কোটি ৪২ লাখ, এস রিসোর্স শিপিং লাইনের কাছে ৭৮ কোটি ২২ লাখ ও এস সুহি শিপিং লাইনের কাছে ৬৭ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এসএফজি শিপিং লাইনের সৈয়দ গোলাম হোসেনের কাছে ব্যাংকের গুলশান শাখার পাওনা রয়েছে ৭৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। সুরমা স্টিল অ্যান্ড স্টিল ট্রেডিং কোম্পানির মালিক মহিউদ্দিন শেখের কাছে রয়েছে ৭৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।

শীর্ষ ২০ খেলাপির তালিকার অন্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে শান্তিনগর শাখার গ্রাহক আরআই এন্টারপ্রাইজের মো. ফখরুল আলম। তার কাছে ব্যাংক পাবে ১৩২ কোটি টাকা। গুলশান শাখার ডেল্টা সিস্টেমসের কাছে ১২৮ কোটি টাকা। জামালপুরের ম্যাপ পেপার বোর্ড মিলসের মোশাররফ হোসেনের কাছে শান্তিনগর শাখার পাওনা রয়েছে ১১৮ কোটি টাকা। গুলশান শাখার প্রোফিউশনস টেক্সটাইলের কাছে পাবে ১১২ কোটি টাকা। আগ্রাবাদ শাখার গ্রাহক কনফিডেন্স শুর কাছে ১০৮ কোটি টাকা। গুলশান শাখার এআরএস এন্টারপ্রাইজের মো. ছাবির হোসেনের কাছে ১০২ কোটি টাকা। দিলকুশা শাখার আরকে ফুডের আবদুল কুদ্দুসের কাছে ৯৮ কোটি টাকা। গুলশান ও কারওয়ান বাজার শাখার গ্রাহক টেকনো ডিজাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের কাছে ৯৭ কোটি টাকা। গুলশান শাখার মেসার্স মণিকা ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনালের মো. মনির হোসেনের কাছে ৮৩ কোটি টাকা। একই শাখার এসএ ট্রেডার্সের কাছে ৮৩ কোটি টাকা এবং প্রধান শাখার অনলাইন প্রোপার্টিজ লিমিটেডের কাছে ব্যাংক পাবে ৭৮ কোটি টাকা।

বেসিক ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে গুলশান, মতিঝিল ও পল্টন থানায় ১৫৬ জনকে আসামি করে ৫৬টি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ব্যাংকটির শীর্ষ খেলাপিদের বেশিরভাগই এসব মামলার আসামি কিংবা বেসিক ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতিতে জড়িতদের বিষয়ে জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী প্রকাশিত তালিকাভুক্ত। দেশের শীর্ষ ১০০ খেলাপির তালিকায় তাদের নাম রয়েছে। তবে কোনো মামলায় আবদুল হাই বাচ্চুকে আসামি করা হয়নি। তবে গত ২৪ জুলাই শান্তিনগর শাখার গ্রাহক সৈয়দ ট্রেডার্সের ৪০ কোটি টাকার ঋণ অনিয়মের এক মামলায় ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের আইনের আওতায় আনতে ও তদন্ত করে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে দুদককে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ঋণ জালিয়াতি, নিয়োগ-পদোম্নতিতে অনিয়মসহ বিভিম্ন কারণে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ২০১৪ সালের জুনে বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় সরকার। অবশ্য তার আগেই পদত্যাগ করেন আবদুল হাই বাচ্চু। ওই বছরের মে মাসে তখনকার এমডি কাজী ফখরুল ইসলামকে অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কৌশলও কাজে আসছে না :মূল টাকা বাঁচানোর লক্ষ্যে সুদ মওকুফ সুবিধা দিয়ে হলেও খেলাপি ঋণ আদায়ের চেষ্টা করছে বেসিক ব্যাংক। নামমাত্র ডাউনপেমেন্ট নিয়ে পুনঃতফসিল করা হয়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। খেলাপিদের তদারকির জন্য একটি গোয়েন্দা ইউনিট গঠন করা হয়েছে। ব্যাংকের আদায় ও আইন বিভাগকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি সহকারী ব্যবস্থাপক থেকে উচ্চ পর্যায়ের প্রত্যেক কর্মকর্তার আওতায় পাঁচজন করে খেলাপি গ্রাহককে দেওয়া হয়েছে। ঋণ গ্রহীতাদের বাড়ি-বাড়ি পাঠানো হচ্ছে কর্মকর্তাদের। অনেক খেলাপি গ্রাহককে শনাক্ত করে টেলিফোন বা অফিসে ডেকে কথা বলেছেন চেয়ারম্যান ও এমডি। এর পরও পরিস্থিতির কোনো উম্নতি হয়নি। গত আড়াই বছরে ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে আদায় হয়েছে মাত্র ৪১৬ কোটি টাকা।

মামলায় আটকে আছে ৫ হাজার ২৬২ কোটি টাকা :অর্থ আত্মসাৎ, ঋণ জালিয়াতি, খেলাপি ঋণের বিপরীতে অর্থঋণ আদালতে করা ৩২৬টি মামলার বিপরীতে ব্যাংকের আটকে আছে পাঁচ হাজার ২৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে তিন হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণের বিপরীতে অর্থঋণ আদালতে ২০৯টি মামলা করেছে ব্যাংক। জালিয়াতি করে দেওয়া ৪৫০ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে মামলা হয়েছে ২৯টি। অন্যান্য বিভিম্ন মামলায় আটকে আছে বাকি অর্থ।

মুনাফায় ফিরতে কমানো হচ্ছে বেশি সুদের আমানত :খরচ কমিয়ে মুনাফায় ফিরতে আগে নেওয়া বেশি সুদের আমানত কমাচ্ছে ব্যাংকটি। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত শাখা ব্যবস্থাপক সম্মেলনে বেশি সুদের আমানত কমানোর তাগাদা দেওয়া হয়েছে। গত জুনের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, ব্যাংকটি ১৪ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকা আমানতের মধ্যে তুলনামূলক বেশি সুদের মেয়াদি আমানত রয়েছে ১০ হাজার ৬৮ কোটি টাকা। গত এক বছরে মোট আমানত ৩৩৫ কোটি টাকা বেড়েছে। অথচ মেয়াদি আমানত কমানো হয়েছে ৭০৪ কোটি টাকা। এর পরও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মাত্র ২০ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা করেছে ব্যাংকটি। আগের বছরের প্রথম ছয় মাসে অবশ্য ৪৬ কোটি টাকা লোকসান হয়েছিল। চলতি বছরের এই মুনাফার বড় অংশই এসেছে নতুন বিতরণ করা দুই হাজার ৬৪১ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে।

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech