বিটকয়েনে লেনদেনকারীদের খুঁজছে গোয়েন্দারা

  

পিএনএস ডেস্ক: ভার্চুয়াল মুদ্রা বিটকয়েন বাংলাদেশে অবৈধ। তারপরও অবৈধ এই ‘ক্রিপ্টোকারেন্সি’র ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। এ কারণে রীতিমতো দুশ্চিন্তায় পড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা এ নিয়ে কয়েকটি বৈঠক করেছেন। দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে এ বিষয়ে সর্তক থাকতে বলা হয়েছে। অবৈধ বিটকয়েন ব্যবহার রোধ করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগকে অথবা অন্য কোনও বিভাগকে মনিটরিংয়ের দায়িত্ব দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। অচিরেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ এক কর্মকর্তা এই তথ্য জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ও গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের কর্মকর্তারা বিটকয়েনে লেনদেনকারীদেরকে খুঁজতে শুরু করেছেন। এ নিয়ে কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন বিটিআরসিও। এই তিনটি সংস্থার কর্মকর্তারা এ নিয়ে চারবার আনুষ্ঠানিক বৈঠকও করেছে।

প্রকৃতপক্ষে বিটকয়েন লেনদেন হয় ওপেন সোর্স ক্রিপ্টোগ্রাফিক প্রোটোকলের মাধ্যমে। এর লেনদেনের জন্য কোনও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যাংকের প্রয়োজন হয় না। যার ফলে একে নিয়ন্ত্রণ করারও কোনও সংস্থা পৃথিবীতে নেই।

বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ)তথ্য অনুযায়ী, ফ্রিল্যান্সারদের অনেকেই বিটকয়েন কিনে রেখেছেন। এছাড়া দেশের বাইরে যারা নিয়মিত যাতায়াত করেন, তাদের অনেকেই জড়িয়ে পড়ছেন এই বিটকয়েনে। অবৈধ বিটকয়েনের সঙ্গে নিজের অজান্তেই জড়িয়ে পড়ছেন দেশের কিছু সেলিব্রেটিরাও। বেশ কিছু এজেন্ট প্রতিষ্ঠান তারকা ক্রিকেটারসহ সেলিব্রেটিদের বিটকয়েনসহ কিপ্টোকারেন্সিতে লেনদেন করতে উৎসাহ যোগাচ্ছে।

এদিকে বিটকয়েন ব্যবহার করে কোনও ধরনের লেনদেন না করতে সবাইকে সতর্ক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বিটকয়েন পৃথিবীর অন্য কোনও দেশেরও স্বীকৃত বা বৈধ মুদ্রা নয়। এ ধরনের মুদ্রায় লেনদেন ঝুঁকিপূর্ণ। এই মুদ্রার লেনদেনে মানি লন্ডারিং ও জঙ্গিবাদে অর্থায়ন প্রতিরোধ সম্পর্কিত আইনের লঙ্ঘন হতে পারে।

এ বিষয়ে বিএফআইইউ-এর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিটকয়েনের বিষয়ে কঠোর নজরদারি করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সব ব্যাংকগুলোকে মনিটরিং করতে বলে দেওয়া আছে। অচিরেই এ ব্যাপারে সার্কুলার জারি করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈধভাবে বিটকয়েন কেনার সুযোগ নেই। এটা ধরতে কাজ করছে গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট।’

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘অবৈধ বিটকয়েনে যারা লেনদেন করছেন তাদেরকে খোঁজা হচ্ছে। আমরা এরই মধ্যে দু-একটির সন্ধানও পেয়েছি। বেশকিছু ওয়েব পেজ আছে, সেগুলো কতটুকু অথেনটিক সেটা পর্যালোচনা করা হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ক্রিপ্টোকারেন্সির তদন্ত সহজ নয়, একটু জটিল। যেহেতু বিটকয়েন বাংলাদেশে অবৈধ, সেহেতু এ ধরনের অবৈধ লেনদেন যারা করছে তাদের বিষয়ে আরও খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে এ নিয়ে কয়েকটি বৈঠক হয়েছে।’

মুদ্রা হিসেবে স্বীকৃতি না পেলেও বিটকয়েন দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। ফলে অনেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিটকয়েনের জন্য নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড ২০১৭’ সম্মেলনের এক সেমিনারে বাংলাদেশ ব্যাংকের উপদেষ্টা এস কে সুর চৌধুরী বলেছিলেন, ‘চলতি বছরের জুনের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটির কাজ হবে বাংলাদেশে কিভাবে দ্রুত ডিজিটাল মুদ্রার প্রচলন করা যায়, তা খতিয়ে দেখা।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অনলাইনে ডলার-পাউন্ড-ইউরোর পাশাপাশি কেনাকাটা করা যায় বিটকয়েনে। তবে অন্যান্য মুদ্রাব্যবস্থায় যেমন সে দেশের সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক জড়িত থাকে, বিটকয়েনের ক্ষেত্রে তা নয়। ২০০৯ সালে সাতোশি নাকামোতো ছদ্মনামের কেউ কিংবা একদল সফটওয়্যার ডেভেলপার নতুন এই ভার্চুয়াল মুদ্রা বা ‘ক্রিপ্টোকারেন্সি’র প্রচলন করে। নাকামোতোর উদ্ভাবিত সেই ক্রিপ্টোকারেন্সির নাম দেওয়া হয় বিটকয়েন।

ইলেকট্রনিক মাধ্যমে অনলাইনে দু’জন ব্যবহারকারীর মধ্যে এটি সরাসরি (পিয়ার-টু-পিয়ার) আদান-প্রদান হয়। লেনদেনের নিরাপত্তার জন্য ব্যবহার করা হয় ‘ক্রিপ্টোগ্রাফি’ নামের পদ্ধতি। নিজের পরিচয় প্রকাশ না এই পদ্ধতিতে লেনদেন করা যায়। অন্যদিকে, লেনদেনের ব্যয়ও খুব কম। তবে বিটকয়েনের জনপ্রিয়তার বড় একটি কারণ হলো— বিটকয়েনে বিনিয়োগ করলে কয়েক গুণ লাভ হবে, এমন ধারণা। সম্প্রতি বিটকয়ন মুদ্রাটি আলোচনায় উঠেও এসেছে এ কারণেই। গত এক বছরে এই ভার্চুয়াল মুদ্রাটির দাম হু হু করে বেড়েছে। ফলে অনেকেই এই বিটকয়ন কেনার দিকে ঝুঁকছেন।

এ প্রসঙ্গে গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘বিটকয়েন মূলত ইন্টারনেট সিস্টেমে একটা নির্দিষ্ট অংকে প্রোগামিং করা আছে, যা চাইলে কেনা যায়। তবে এটি কোনও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা কোনও দেশের জারি করা মুদ্রা নয়। ইন্টারনেট সিস্টেমকে ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তি এই সিস্টেমকে ডেভেলপ করেছে। এটাকে এক ধরনের জুয়া খেলা বলা যেতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘এই মুদ্রার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে, এর কোনও কর্তৃপক্ষ নেই। এ কারণে এটা অবৈধ। তবে জুয়াড়িদের কাছে এটা জনপ্রিয়। একসময় এর দাম ছিল একশ ডলার। এক বছরের মধ্যে তা বেড়ে হয় এক হাজার ডলার। এখন এর দাম ১৯ হাজার ডলারে উঠে গেছে। যে কারণে লোভে পড়ে অনেকেই এই মুদ্রায় বিনিয়োগ করছে। কিন্তু হঠাৎ করে এর পেছনের লোকেরা বাজার থেকে সরে গেলে বিপদে পড়বেন অনেকেই।’

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র জি এম আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘বিটকয়েন বাংলাদেশে অবৈধ। এই মুদ্রা দেশের কোনও নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিত নয়। অবৈধ বিটকয়েনে লেনদদেন হলে মানুষের আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এ ধরনের অবৈধ মুদ্রার ব্যাপারে সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে দেশে বিটকয়েনের লেনদেন হচ্ছে, যা কোনও নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিত নয়। ফলে মানুষের আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এ ধরনের অবৈধ মুদ্রার লেনদেন না করতে সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এতে আরও বলা হয়েছে, অনলাইনভিত্তিক ভার্চুয়াল মুদ্রা বিটকয়েন, ইথেরিয়াম, রিপ্পেল ও লিটকয়েনসহ বিভিন্ন বিনিময় প্ল্যাটফর্মে লেনদেন হচ্ছে। এসব ভার্চুয়াল মুদ্রা কোনও দেশের বৈধ কর্তৃপক্ষের ইস্যু করা বৈধ মুদ্রা নয়। ফলে এর বিপরীতে কোনও আর্থিক দাবির স্বীকৃতিও নেই। ভার্চুয়াল এসব মুদ্রার লেনদেন বাংলাদেশ ব্যাংক বা অন্য কোনও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদিত না হওয়ায় তা আইন দ্বারা সমর্থিত নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নামবিহীন বা ছদ্মনামে প্রতিসঙ্গীর সঙ্গে অনলাইনে ভার্চুয়াল মুদ্রায় লেনদেনের দ্বারা মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ সম্পর্কিত আইনের লঙ্ঘন হতে পারে। সম্ভাব্য আর্থিক ও আইনগত ঝুঁকি এড়াতে বিটকয়েনের মতো ভার্চুয়াল মুদ্রায় লেনদেন বা এসব লেনদেনের প্রচার থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এদিকে, ‘বিটকয়েন এক্সচেঞ্জ: বিটকয়েন বাই অ্যান্ড সেল বাংলাদেশ’ নামে ফেসবুকে একটি পেজ খোলা হয়েছে। লোকাল বিটকয়েনস ডটকম নামে একটি ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, বিকাশ, রকেটসহ মোবাইল ব্যাংকিং ও সাধারণ ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিটকয়েন কেনাবেচা করা যাচ্ছে।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন


পিএনএস/আলআমীন

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech