বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে মৌলিক গবেষণা কতটা হচ্ছে?

  


পিএনএস ডেস্ক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ইন্সটিটিউট। এই ইন্সটিটিউটের একজন শিক্ষক তৌহিদুল হক। গত তিন বছর ধরে একটি সামাজিক বিষয়ে গবেষণা করছেন। তিনি এই গবেষণার মাধ্যমে নতুন একটি থিউরি আবিষ্কার করার চেষ্টা করছেন। খবর বিবিসির।

তিনি বলছেন গবেষণাটি সফলভাবে শেষ করতে পারলে, এই থিউরিটি হবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি সামাজিক বিষয়ের নতুন জ্ঞানের আবিষ্কার।

তৌহিদুল হক বলছিলেন ‘আমি যেটা নিয়ে কাজ করছি সেটার নাম ‘LOR Theory’ । মানুষের আচরণ থেকে কিভাবে অপরাধ মূলক আচরণ প্রতিহত করা যায়, আইন, সামাজিক নিয়মকানুন, মানুষের প্রতি সম্মানবোধ এই তিনটি বিষয়কে সমন্বিত করে কিভাবে মানুষের আচরণের মধ্যে সুস্থ ও স্বাভাবিকতা আনা যায় -এটাই এই গবেষণার মূল উপজীব্য।’

তৌহিদুল হক গবেষণাটি করছেন সম্পূর্ণ নিজের খরচে। একটি মৌলিক গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার জন্য ধারাবাহিক চেষ্টা এবং অর্থের জোগান থাকা একটি অপরিহার্য বিষয়।

তৌহিদুল হক বলছিলেন যদি আর্থিক সহায়তা না পান তাহলে গবেষণার শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের অর্থ ব্যয় করে কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন।

তবে এই ধরণের ঘটনা হাতে গোনা। বাংলাদেশে অনুমোদিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ৪২ টি আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ৯৫টি। মোট ১৩৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন কয়েক হাজার। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পাঠদান, জ্ঞান চর্চা এবং নতুন জ্ঞানের আবিষ্কার এই তিনটা বিষয়কে বৈশিষ্ট্য হিসেবে ধরা হয়।

কিন্তু পাঠদান, জ্ঞান চর্চা হলেও নতুন জ্ঞানের আবিষ্কার বা মৌলিক গবেষণা কতটা হচ্ছে বা মৌলিক গবেষণার সংস্কৃতি কি আছে?

বাংলাদেশের অন্যতম বড় একটি বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলছিলেন ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয় কিন্তু দুর্ভাগ্য হল সেগুলোর প্রচারণা কম। প্রত্যেকটি একাডেমিক কাউন্সিলে আমরা প্রচুর মৌলিক গবেষণা কাজের প্রতিবেদন পায়। তবে বড় একটা ঘাটতি হল বাজেট। সরকারিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য বড় অংকের বাজেট নেই’।

শিক্ষকদের পদোন্নতির জন্য মৌলিক গবেষণা থাকা বাধ্যতামূলক। এই বাধ্যবাধকতা থেকে বেশিরভাগ শিক্ষক গবেষণা করেন।

তবে সেই গবেষণা কতটা মৌলিক বা মান সম্মত হচ্ছে কিনা সেটার নির্ধারণ করছে কে বা কারা?

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমের তত্ত্বাবধান করে থাকে। গবেষণা বিভাগের সদস্য ড. দিল আফরোজা বেগম বলছিলেন গবেষণার প্রস্তাব ইউজিসির কাছে পাঠাতে হবে।

তবে তারো আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকটি ধাপ পার হয়ে আসতে হয়।

তিনি বলছিলেন ‘একটি গবেষণা কাজের মধ্যে কোথাও থেকে কপি করা হয়েছে কীনা সেটা প্রথমে সুপারভাইজার, এরপর ডিফেন্স কমিটি, তারপর বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক কাউন্সিল দেখবে। এদের কাছ থেকে গবেষণার বিষয় অ্যাপ্রুভ হওয়ার পর আমাদের কাছে আসে। যদি কোন মৌলিক গবেষণা নিয়ে অভিযোগ উঠে সেটা ইউজিসির কাছে রিপোর্ট না করা পর্যন্ত আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি না’।

ড. দিল আফরোজা বেগমের কথা অনুযায়ী কোন গবেষণা নিয়ে অভিযোগ উঠলে সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি ধাপে প্রমাণ করতে পারলেই হয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় সূক্ষ্ম একটা ফাঁক থাকার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না।

বিশ্ববিদ্যালয়র শিক্ষক নিয়োগ,পদোন্নতি নিয়ে একটি গবেষণা করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ।

প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছিলেন পদোন্নতির জন্য গবেষণা বাধ্যতামূলক হলেও তাদের গবেষণায় যে তথ্য তারা পেয়েছেন সেটা হতাশাজনক।

তিনি বলছিলেন ‘দেখা গেছে মৌলিক কোন গবেষণা না থাকার পরেও রাজনৈতিক যোগসাজশ,দলীয়করণ এসবের মাধ্যমে পদোন্নতি হচ্ছে। যার ফলে সত্যিকার মৌলিক গবেষণা এখন প্রাধান্য পায় না’।

যেখানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাজেটের স্বল্পতা একটা বড় কারণ হিসেবে দেখছে, সেখানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কোন বাজেট পায় না সরকার থেকে। তাহলে সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কাজের কি অবস্থা?

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের গবেষণা বিভাগের পরিচালক ড. সুমন রহমান বলছিলেন খুব বড় পরিসরে না হলেও স্বল্প পরিসরে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মৌলিক গবেষণা হচ্ছে।

তিনি বলছিলেন ‘ইউজিসির একটা বাধ্যবাধকতা আছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর উপর যে মৌলিক গবেষণা থাকতে হবে। সে কারণে গবেষণা করতে হয়। তবে হাতে গোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় সেটা করছে। অবশ্যই সেটা উল্লেখ করার মত না। বাজেট একটা বিষয়। আমাদের আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে রিসার্চ প্রজেক্টের টাকা আনতে হয়। যেই যোগ্যতা অনেকের নেই’।

শিক্ষক এবং গবেষকরা বলছেন ২০ বা ৩০ বছর আগে যে মৌলিক গবেষণার সংস্কৃতি বাংলাদেশর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছিল সেটা এখন প্রায় বিলুপ্ত হচ্ছে।

যেখানে মৌলিক গবেষণার এত ঘাটতি সেখানে সার্বিক শিক্ষাক্ষেত্রে কি প্রভাব ফেলছে?

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড.ইফতেখারুজ্জামান বলছিলেন ‘মৌলিক গবেষণার সংস্কৃতি আস্তে আস্তে লোপ পাচ্ছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার গুনগত যে মান সেটার স্বল্প মেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব হতাশাজনক, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অশনিসংকেত। এই অর্থে যে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের যে স্বপ্ন সেটা ধূলিসাৎ হয়ে হতে পারে যদি বিশ্ববিদ্যালয় গুলো নতুন জ্ঞান সৃষ্টির ভাণ্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারে। আমরা সেদিকেই ধাবিত হচ্ছি’।

ইউজিসি বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বলছে চলতি অর্থবছরে ২০১৭-১৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে মাত্র ৪ কোটি টাকা।

এছাড়া ইউজিসির ‘HEQEP’ নামে একটি প্রকল্প রয়েছে যেখানে বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্পের জন্য অর্থ দেয়া হয়।

বিশ্বের নানা দেশে গবেষণা কাজে যেখানে প্রচুর পরিমাণে অর্থ বরাদ্দ থাকে সেখানে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য কেন এত কম বরাদ্দ?

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলছিলেন ‘আমাদের যে পরিমাণ অর্থ থাকা উচিত সেটা নেই। এবং ৪ কোটি টাকা মোটেই যথেষ্ট নয়। এ কারণে অন্যান্য খাত থেকে কমিয়ে আমরা এই খাতে দেয়। যে মৌলিক গবেষণা হচ্ছে সেটাতে আমরা সন্তুষ্ট নয়। তবে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। ২০৩০ সালে পর্যন্ত আমরা স্ট্রাটেজি প্ল্যান নিয়েছি, যেখানে আরো অর্থ বরাদ্দ হবে। যার উদ্দেশ্য হবে জ্ঞান চর্চা এবং নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি’।

বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে বেশ কয়েকটা গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যারা বিজ্ঞান,কৃষি এবং সামাজিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মৌলিক গবেষণা করছে।

তবে অবশ্যই সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাভুক্ত নয়। ইউজিসি বলছি মৌলিক গবেষণা কম হওয়ার পেছনে আরো দুইটি কারণ রয়েছে।

একটি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব। আবার অর্থ যোগার করে সেসব যন্ত্র কিনতে পারলেও সেগুলো চালনা বা মেইনটেনেন্স এর জন্য দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে।

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech