বিশেষজ্ঞদের অভিমত : গ্রেড পরিবর্তন নয় সঠিকভাবে খাতা মূল্যায়ন বেশি জরুরি

  


পিএনএস ডেস্ক: পাবলিক পরীক্ষার গ্রেডিং পদ্ধতি পরিবর্তন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, পরীক্ষক এবং অনেক অভিভাবক বলেছেন, গ্রেডিং পদ্ধতি পরিবর্তন হচ্ছে ভালো কথা কিন্তু তার চেয়েও বেশি জরুরি সঠিকভাবে খাতা মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা। সঠিকভাবে খাতা মূল্যায়ন নিশ্চিত করা ছাড়া শিক্ষার্থীদের প্রতি সুবিচার করা যাচ্ছে না। বঞ্চিত আর বৈষম্যের শিকার হচ্ছে প্রকৃত মেধাবীরা। কমছে শিক্ষার মান। বর্তমানে নানা কারণে সঠিকভাবে খাতা মূল্যায়ন ব্যাহত হচ্ছে বলে জানান পরীক্ষকরা।

জিপিএ পদ্ধতি চালুর পর এক সময় ব্যাপকহারে পাস ও জিপিএ প্রাপ্তির ঘটনা ঘটে সমাপনী থেকে শুরু করে এইচএসসি পর্যন্ত। দেশজুড়ে আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয় শিক্ষার মানের ধস। তখন বিভিন্ন গণমাধ্যমে বের হয়ে আসে পরীক্ষকদের খাতা মূল্যায়নের নানা অনিয়ম। অনেক পরীক্ষক জানান, উপর থেকে তাদের স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া হয় হাত খুলে নম্বর দেয়ার জন্য। তাদেরকে বলা হয় কেউ যেন ফেল না করে। খাতায় যে যাই লিখুক নম্বর দিতে হবে। সবাইকে পাস করাতে হবে। খাতায় কম নম্বর দিলে জবাবদিহি করতে হয়, নানা ধরনের সমস্যা হয়।

তা ছাড়া বর্তমানে দ্রুততম সময়ে পরীক্ষার ফল প্রকাশ করায়ও সঠিকভাবে খাতা মূল্যায়নে সমস্যা হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরা নানাভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী শিকার হচ্ছে কর্তৃপক্ষের নানা ধরনের ভুলভ্রান্তিজনিত হয়রানির।

তবে অনেক পরীক্ষক জানিয়েছেন, তারা উপরের অনৈতিক নির্দেশ পালন করতেন না। কেউ কেউ আবার এসব কারণে খাতা দেখাও বাদ দিয়েছেন। আবার অনেকে নির্দেশ মতো হাত খুলে নম্বর দিয়েছেন ঝামেলা এড়াতে।

এ ধরনের অনৈতিক নির্দেশনাসহ আরো বিভিন্ন কারণে সঠিকভাবে খাতা মূল্যায়ন ব্যাহত হচ্ছে। খাতা মূল্যায়নের সাথে জড়িত শিক্ষকদের অনেকের সৃজনশীল বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণ নেই। তা ছাড়া অনেকের খাতা মূল্যায়ন সম্পর্কেও কোনো ধারণা নেই। আবার সঙ্কট রয়েছে পর্যাপ্ত পরীক্ষকের। খাতা মূল্যায়নের পারিশ্রমিক এবং সময় নিয়েও অসন্তুষ্ট অনেক শিক্ষক।

খাতা দেখা বিষয়ে বিভিন্ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন অনৈতিক নির্দেশনা এখনো অনেক ক্ষেত্রে রয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন কেউ কেউ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন হেড এক্সামিনার জানান, মাঝে মধ্যে বোর্ড থেকে বলে, আরো বেশি কেন পাস করালেন না, আরো কেন নম্বর দিলেন না। বেশি করে নম্বর দিবেন।

তিনি বলেন, আমাদের প্রশিক্ষণের সময় বলা হয়েছে যাদের সৃজনশীল বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণ নেই তারা খাতা দেখতে পারবেন না। কিন্তু বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। বর্তমানে অনেক পরীক্ষক রয়েছেন যাদের সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়ন ও খাতা মূল্যায়ন বিষয়ে কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ নেই। এমনকি সৃজনশীল বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণ নেই এমন শিক্ষকদের হেড এক্সামিনারও করা হচ্ছে। প্রশিক্ষণ না থাকার কারণে তারা খাতা দেখার সময় ভালো মন্দের কোনো পার্থক্য করতে পারছে না। অনেক সময় যে সঠিক লিখে তাকেও নম্বর দেয়, যে ভুল লিখে তাকেও নম্বর দেয়। খাতা দেখার যে নিয়ম রয়েছে তা বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই মানা হয় না।

অনেক পরীক্ষক জানিয়ছেন খাতা দেখার জন্য যে সময় দেয়া হয় তা পর্যাপ্ত নয়। আবার অনেক শিক্ষক অভিযোগ করেন খাতা দেখার জন্য যে সময় দেয়া হয় তাও সঠিকভাবে কাজে লাগান না অনেক শিক্ষক। অনেকে সঠিকভাবে খাতা মূল্যায়ন না করে সবাইকে বেশি নম্বর দিয়ে অতি দ্রুত খাতা জমা দেন।

বরিশাল বোর্ডের একজন শিক্ষক জানান, আড়াই শ’ থেকে তিন শ’ খাতা পেলে প্রথম ১০ দিনে অর্ধেক জমা দিতে হয়। পরের সাত থেকে ১০ দিনে বাকি অর্ধেক দিতে হয়।

আরেকজন শিক্ষক জানান, বাংলা ইংরেজি প্রভৃতি বিষয়ে যারা খাতা দেখেন তাদের বেশি খাতা দেখতে হয়। কিন্তু সে জন্য তাদের সময় বেশি দেয়া হয় না। বাংলা ইংরেজি গণিত খাতা যারা মূল্যায়ন করেন তাদের সাধারণত ৪০০ থেকে ৫০০ খাতা দেয়া হয়। অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের দেয়া হয় আড়াই শ’ থেকে তিন শ’ খাতা। কিন্তু সবার ক্ষেত্রেই বরাদ্দকৃত সময় একই।

অপর দিকে গত বছর থেকে সরকার খাতা দেখা বিলের ওপর ১০ শতাংশ টাকা কেটে রাখার নিয়ম চালু করায় বর্তমানে ক্ষুব্ধ শিক্ষকরা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা টি আলী কলেজের শিক্ষক খোদেজা ইয়াসমীন যিনি বোর্ডের খাতা দেখেন, তিনি বলেছেন বাংলা ইংরেজিসহ বিভিন্ন বিষয়ে পরীক্ষকদের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি। তা ছাড়া খাতা দেখার জন্য সময়ও বেশি দেয়া দরকার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিউটের শিক্ষক শাহ্ শামীম আহমেদ বলেন, পরীক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্য হলো একজন শিক্ষার্থী কতটুকু শিখল তা জানার চেষ্টা করা। সে জন্য সবার আগে দরকার সঠিকভাবে প্রশ্ন প্রণয়ন। এরপর খাতা মূল্যায়নের জন্য দরকার মার্কিং স্কিল নির্ধারণ, যার ভিত্তিতে একজন পরীক্ষক খাতায় নম্বর দেবেন। কিন্তু বর্তমানে এসব নিয়ম সঠিকভাবে পালন হচ্ছে না।

তিনি বলেন, গ্রেডিং পদ্ধতিতে শ্রেণী ব্যবধান কমিয়ে আনার প্রস্তাব ভালো। কিন্তু সবচেয়ে বেশি জরুরি শিক্ষার্থীদের খাতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন। তা না হলে গ্রেডিং পদ্ধতি দিয়ে শিক্ষার মান বাড়ানো যাবে না।

অষ্টম শ্রেণী থেকে এইচএসসি পর্যন্ত পাবলিক পরীক্ষায় গ্রেডিং পদ্ধতিতে বর্তমানে ৮০ বা তার উপর পেলে জিপিএ৫ বলা হয়। এটি পরিবর্তন করে বর্তমানে ৯০ বা ৮৫ থেকে ১০০ পেলে এক্সিলেন্ট প্রবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমানে এক গ্রেড থেকে আরেক গ্রেডের ব্যবধান ১০। এটি কমিয়ে ৫ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech