শারীরিক পরিশ্রমের প্রয়োজনীয়তা

  

পিএনএস (জালাল উদ্দিন আহমেদ মাসুদ) : আমাদের এই রহস্যময় মানবদেহ অনেকগুলো অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সমন্বয়ে তৈরি করেছেন মহান সৃষ্টিকর্তা।প্রত্যেকটা অঙ্গেরই আলাদা আলাদা কাজ রয়েছে। বলা বাহুল্য, আমাদের দেহের কিছু কিছু স্ট্রাকচার রয়েছে যেগুলো যত বেশি ব্যবহার করা হয় তাদের কার্যক্ষমতা আরো বেড়ে যায়।

কিন্তু আমরা আজকাল এতোটাই রোবটিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে, আমরা এই অঙ্গগুলোকে কাজেই লাগাচ্ছি না।

আমরা ভুলেই গেছি যে পা দুটো দেয়া হয়েছে হাটার জন্য।আমাদের এই অলসতার জন্য দেখা দেখা দিচ্ছে নানা ধরনের কঠিন রোগ। যা আমরা সচেতন হলেই অনেকাংশে হ্রাস করা সম্ভব।

বিশ্বব্যাপী মানুষের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান রিস্ক ফ্যাক্টর হল অপর্যাপ্ত শারীরিক কর্মকান্ড।

ক্যান্সার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিসসহ অন্যান্য অসংক্রামক রোগের অন্যতম রিস্ক ফ্যাক্টর হল অপর্যাপ্ত শারীরিক কর্মকান্ড। অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসহ আরো অনেক স্বাস্থ্য উপকারিতা র‍য়েছে শারীরিক পরিশ্রমের।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক জরিপে দেখা যায় বিশ্বব্যাপী মোট তরুণ জনশক্তির প্রায় ৮০ ভাগই শারীরিক সক্রিয়তা/কর্মকান্ড অপর্যাপ্ত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদস্য রাষ্ট্র সমুহ ২০২৫ সালে মধ্যে অপর্যাপ্ত শারীরিক কর্মকান্ড ১০% নামিয়ে আনার একটি প্রকল্পে একমত পোষন করেছে।অর্থাৎ মানুষের ফিজিকাল এক্টিভিটি বাড়ানোর পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে।

এবার আসা যাক শারীরিক পরিশ্রম বলতে আসলে কি বুঝায়?

যে কোনো প্রকার শারীরিক আন্দোলন বা নড়াচড়া যেটাতে আমাদের দেহের ঐচ্ছিক পেশি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে এবং পেশির কাজের জন্য ক্যালরি বা শক্তির অপচয় ঘটে তাকেই শারীরিক পরিশ্রম বা ফিজিকাল এক্টিভিটি বলে। আমাদের শারীরিক শ্রমের মূল উদ্দেশ্যই হল অতিরিক্ত মেদ বা ক্যালরি বার্ন করা।

যেমনঃ দৈনিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা,হাটাচলা,গৃহস্থালির কাজ, ভ্রমন, বিনোদনমূলক কাজ, শরীরচর্চা ইত্যাদি সবই শারীরিক পরিশ্রমের অন্তর্ভুক্ত। মাঝারি এবং উচ্চমাত্রার শারীরিক কর্মকান্ড আমাদের স্বাস্থের অনেক উন্নতি সাধন করে।

কতটুকু শারীরিক পরিশ্রম করা প্রয়োজন?

বিশ্ব সাস্থ সংস্থার মতে,
যাদের বয়স ৫-১৭ বছর : তাদের প্রতিদিন অন্তত ৬০ মিনিট মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার শারীরিক পরিশ্রম করা উচিত।আরো বেশি করলে বাড়তি স্বাস্থ্য উপকারিতা তো আছেই। তাছাড়া আমাদের পেশি এবং হাড়কে শক্তিশালী করে এরকম কর্মকান্ড/এক্সারসাইজ সপ্তাহে অন্তত তিনবার করা উচিত।

যাদের বয়স ১৮ বছরের বেশি : তাদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি অথবা ৬০ মিনিট উচ্চমাত্রার শারীরিক কর্মকান্ড করা উচিত।কেউ চাইলে দুটোর কম্বিনেশন ও করতে পারেন।বাড়তি হেলদ্ বেনফিট পাওয়ার জন্য মাঝারি কর্মকান্ড ৩০০ মিনিট পর্যন্ত বাড়াতে পারেন।পেশি এবং হাড়কে স্ট্রেনদেন করে এরকম এক্সারসাইজ সপ্তাহে কমপক্ষে দু’বার করা উচিত।

শারীরিক পরিশ্রমের উপকারিতা এবং অপর্যাপ্ত শারিরীক কর্মকান্ডের ঝুকি::

নিয়মিত মাঝারি মাত্রার শারীরিক কর্মকান্ডের চমৎকার স্বাস্থ্য উপকারিতা রয়েছে,,এক্ষেত্রে একটা প্রবাদ বলা যেতে পারে, নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো। অর্থাৎ একদম শারীরিক কর্মকান্ড না করার থেকে অল্প করাও ভালো।

শারীরিক পরিশ্রমের অনেক উপকারিতা রয়েছে যেমন:

- এটা পেশির শক্তি বৃদ্ধি করে

- শসনতন্ত্র ও হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা বাড়ায়

- পর্যাপ্ত শারীরিক কর্মকান্ড উচ্চ রক্তচাপ,হৃদরোগ,

স্ট্রোক,ডায়াবেটিস,কতিপয় ক্যান্সার(স্তন ক্যন্সার,কোলন ক্যান্সার) এর মত মারাত্নক রোগের ঝুকি কমায়

- হাড়ের শক্তি বৃদ্ধি করে

- শরীরের সামগ্রিক কার্যকলাপের উন্নতি সাধন করে

- হতাশা দূর করে

- হঠাত করে পড়ে যাওয়া এবং কোমর ও মেরুদন্ডের ফ্র‍্যাকচার এর ঝুকি কমায়

- দেহের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে

অপর্যাপ্ত শারীরিক কর্মকান্ড বিশ্বব্যাপী মৃত্যুঝুকির অন্যতম কারণ।যারা শারীরিক কর্মকান্ড করেন না তাদের মৃত্যঝুকি শারীরিক ভাবে সক্রিয়দের তুলনায় প্রায় ২০-৩০% বেশি।

শারীরিক পরিশ্রম কমার কারন: : নগরায়নের সাথে সম্পর্কিত কিছু পারিপার্শ্বিক ফ্যাক্টরকে মানুষের শারীরিক পরিশ্রমের প্রতি অনিহার কারন হিসেবে দায়ী করা হয়। যেমনঃ

- বাসার বাইরে বের হলে অপরাধমূলক কার্যকলাপ বা সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার আশংকা

-রাস্তায় অতিমাত্রার ট্রাফিক

-বায়ুদূষণ, বাহিরের অস্বাস্তকর পরিবেশ

-পার্ক,খেলাধুলার জায়গার অভাব

-পর্যাপ্ত ফুটপাতের অভাব,বিনোদনের অভাব ইত্যাদি।

-তাছাড়াও আমাদের অলসতা,প্রযুক্তিনির্ভরতাও অনেকাংশে দায়ী
কিভাবে মানুষের শারীরিক কাজকর্ম বাড়ানো যায়?

প্রথমেই মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।সাধারণ মানুষকে এটার উপকারিতা সম্পর্কে অবহিত করতে হবে এবং শারীরিক ভাবে নিষ্ক্রিয় থাকার কুফল সম্পর্কে বুঝাতে হবে। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন পদক্ষেপ এর মাধ্যমেই এটা অর্জন করা সম্ভব।
বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে যেমনঃ

- অল্প জায়গার জন্য গাড়িতে না উঠে যতটুকু সম্ভব হাটা,নিজের গৃহস্থালির কাজকর্ম করা ইত্যাদি।

- সাইক্লিং এর প্রতি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা
- অফিসে বা ওয়ার্কিং প্লেসে এমনভাবে পলিসি তৈরি করা যেটা শারীরিক শ্রমকে উদ্ভুধ্য করে- স্কুল এবং কলেজে পর্যাপ্ত খোলা জায়গার ব্যাবস্থা থাকা যাতে করে ছাত্ররা তাদের অবসর সময় সক্রিয়ভাবে(খেলাধুলা করে) কাটাতে পারে- ছাত্রছাত্রীদের পর্যাপ্ত শারীরিক শিক্ষা দিতে হবে
- পর্যাপ্ত খেলাধুলা ও বিনোদনের ব্যাবস্থা।

আমরা একটু সচেতন হলেই অনেক ভাল এবং সুস্থ থাকতে পারি।আসুন সবাই সচেতন হই এবং অপরকে জানাই।

জালাল উদ্দিন আহমেদ মাসুদ
শিক্ষার্থী : ৪র্থ বর্ষ
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ

পিএনএস/জে এ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech