ওবামা কেয়ার বাতিল হচ্ছে, মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর উঠছে, ট্রাম্পের বক্তব্যে অশনি সংকেত

  



পিএনএস ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম সাংবাদিক সম্মেলনে আবারও জোর দিয়ে বলেছেন, ওবামাকেয়ার তিনি বাতিল করবেন, মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণ করবেন। গত বুধবার নিউইয়র্কের ট্রাম্প টাওয়ারে অনুষ্ঠিত এই সংবাদ সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রায় সব কথারই পুনরাবৃত্তি করেছেন যা তিনি বলেছিলেন নির্বাচনী প্রচারণার সময়। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি কী কী পদপেক্ষ নিতে চলেছেন তা দেখার জন্য যখন তাকিয়ে আছে গোটা বিশ্ব, ঠিক সে সময়ে তাঁর এই বক্তব্য পর্যবেক্ষক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। নির্বাচনী প্রচারণায় অনেক কথাই বলেছিলেন ট্রাম্প। সে সময় তা নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি। অনেকের মধ্যেই আশা ছিল নির্বাচনী বৈতরণী পার হতেই হয়তো এই সব বিতর্কিত বক্তব্য দিয়েছেন রিপাবলিকান প্রার্থী। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র নয় দিন আগে অনুষ্ঠিত তার এই প্রথম সাংবাদিক সম্মেলনে এটাই স্পষ্ট হয়ে গেল যে তিনি তার নির্বাচনকালীন বক্তব্যে অটল রয়েছেন।

সাংবাদিক সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি জনগনকে স্বাস্থ্যসেবা দিতে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার গৃহীত পদক্ষেপ যা ওবামাকেয়ার নামে পরিচিত তা বাতিল করবেন। ট্রাম্প মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দাদের তথ্য সঠিক নয়। এতে প্রকারান্তরে তিনি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতি তার অনাস্থার কথাই বোঝাতে চেয়েছেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি গণমাধ্যম সম্পর্কে কটূক্তি করেন এবং সিএনএন এর একজন সাংবাদিককে প্রশ্ন করার সুযোগ দেননি। এ নিয়ে ওই সাংবাদিকের সাথে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের বাহাস হয়।

ট্রাম্প তাঁর ভাষণে মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে যত শিগগির সম্ভব সেখানে দেয়াল তোলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। ক্ষমতা গ্রহণের পরই তিনি এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবেন বলে জানান। ট্রাম্প বলেন, দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি ওবামাকেয়ার বাতিল করবেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের বিশাল বিত্ত-বৈভব ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ভবিষ্যত সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে তাঁর পরিকল্পনার কথা বলেন। তিনি জানান, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় এখন তার ব্যবসা তার দুই ছেলে দেখবে। তিনি বলেন, নিরাপত্তার বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনেক পিছিয়ে। হ্যাকিং থেকে দেশকে নিরাপত্তা দিতে যুক্তরাষ্ট্র সবার থেকে পেছনে রয়েছে। ট্রাম্প ঈশ্বরের থেকেও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার কথা জানান। তিনি বলেন, আমার নেতৃত্বাধীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আরও বেশি করে সমীহ করে চলবে পৃথিবীর সব দেশ। রাশিয়ার সঙ্গে কোনরকম চুক্তি হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুতিন আমাকে পছন্দ করলে তা আমাদের সম্পদ, কোন দায় নয়। মার্কিন নির্বাচনে হ্যাকিংয়ে রাশিয়া জড়িত ছিল এমন অভিযোগ বরাবর অস্বীকার করে এলেও নিজের প্রথম সংবাদ সম্মেলনে অনেকটা স্বীকার করার ভঙ্গিতে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বলেন, তবে শুধু রাশিয়াই নয়, আরও অনেক দেশই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ টার্গেটে হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটিয়েছে এবং তাদের সে চেষ্টা এখনও অব্যাহত রয়েছে। আর সাইবার সিকিউরিটি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের অবহেলাই তাদের সার্ভার হ্যাক হওয়ার জন্য দায়ী বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, এর আগে চীন আমাদের দেশের প্রায় ২২শ’ অ্যাকাউন্ট হ্যাক করেছিল। আমরা কোনও নিরাপত্তাই দিয়ে উঠতে পারিনি সে সময়। হ্যাকিং করা খুবই খারাপ। এটা করা উচিত নয় বলেও উল্লেখ করেন ট্রাম্প।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মিডিয়ার কড়া সমলোচনা করেন। সংবাদপত্র তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালালেও বিভিন্ন সংবাদ সংস্থাকে তিনি ধন্যবাদ জানান। সিএনএন-এর একজন সাংবাদিক নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে প্রশ্ন করতে চাইলে ট্রাম্প সে সুযোগ না দিয়ে সিএনএন সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করেন এবং ওই সাংবাদিকের সাথে সরাসরি বাহাসে জড়িয়ে পড়েন। সিএনএন-এর ওই সাংবাদিক নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টের এমন আচরণ ‘ঠিক নয়’ বলে ট্রাম্পের মুখের ওপর মন্তব্য ছুঁড়ে দেন।

সংবাদ সম্মেলনটি শুরু হয় ট্রাম্পের মুখপাত্র সিন স্পাইসারের বক্তব্যের মাধ্যমে। তিনি প্রথমেই রাশিয়া ও ট্রাম্পকে জড়িয়ে যৌন কেলঙ্কারির অভিযোগ তোলা ব্ল্যাকমেইলিং ট্যাপের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, এটি আসলে ‘রাজনৈতিক শিকারের অপচেষ্টা’।

এ বিষয়ে ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে বলেন, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যদি ওই টেপ সংবাদ মাধ্যমের হাতে দিয়ে থাকে তাহলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। এমন হলে এটা তাদের জন্য অনেক বড় একটা কলঙ্ক হয়ে থাকবে। ট্রাম্প বলেন, এসবই বানোয়াট সংবাদ। ২০১৩ সালের মিস ইউনিভার্সকে সঙ্গে নিয়ে রাশিয়া সফর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সে সময় যে হোটেলে ছিলাম সেখানে আমি খুবই সতর্ক ছিলাম। কারণ ওসব কক্ষে গোপন ক্যামেরা থাকতে পারে। প্রসঙ্গত, ট্রাম্প মস্কো সফরের সময় একটি পাঁচ তারকা হোটেলে অবস্থান করেছিলেন। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ওই সময়ে তাঁর অবেধ যৌন কার্যকলাপের ভিডিও রেকর্ডটি রাশিয়ার হাতে রয়ে গেছে। তবে রাশিয়া এ অভিযোগ ‘বানোয়াট ও অর্থহীন প্রলাপ’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

প্রথম সাংবাদিক সম্মেলনে দেয়া ট্রাম্পের বক্তব্য নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। পর্যবেক্ষক মহল বলছেন, সংবাদ সম্মেলনে দেয়া ট্রাম্পের বক্তব্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যত সম্পর্কে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টির ইঙ্গিতবাহী। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লরেন্স ট্রাইব সংবাদ সম্মেলনে পেশ করা ট্রাম্পের পরিকল্পনা সম্পর্কে বলেন, ‘আমি হা হয়ে গেছি। ট্রাম্পের পুরো কাজকারবারই তো জালিয়াতিতে ভরা।’ সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রধান নৈতিকতা বিষয়ক আইনজীবী রিচার্ড পেইন্টার বলেছেন, ‘ট্রাম্পের পরিকল্পনা আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। প্রেসিডেন্ট ওবামার নৈতিকতা আইনজীবী নরম্যান এইসনও বলেছেন, ট্রাম্পের অনেক পরিকল্পনাই যুক্তরাষ্ট্রের আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech