পাকিস্তানকে দোষ দিলেই ভারতের সন্ত্রাসবাদের হুমকি বন্ধ হবে না

  

পিএনএস ডেস্ক: ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ গত ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে পাকিস্তানের ওপর চড়াও হয়ে বলেছেন, বিশ্বকে ইসলামাবাদ দিচ্ছে ‘সন্ত্রাসী’, আর নয়া দিল্লি উচ্চমানের চিকিৎসক ও প্রকৌশলী তৈরি করছে। সুষমা বলেন, ‘ভারত কেন আজ বিশ্বে স্বীকৃত আইটি পরাশক্তি এবং পাকিস্তান কেন কেবল সন্ত্রাস রফতানির কারখানা হিসেবে পরিচিত?’

পাকিস্তান পাল্টা সমালোচনা করে সুষমাকে ‘আজন্ম মিথ্যাবাদী’ হিসেবে অভিহিত করে। কাশ্মীরে মারাত্মকভাবে মানবাধিকার দলনের জন্য ভারতকে অভিযুক্ত করে পাকিস্তান জানায়, ভারত হলো দক্ষিণ এশিয়ায় ‘সন্ত্রাসবাদের জননী।’

চীনের সরকার নিয়ন্ত্রিত গ্লোবাল টাইমসের এক নিবন্ধে লং শিংচুন লিখেছেন- সুষমা স্বরাজের বক্তৃতা ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের কেবল অবনতিই ঘটিয়েছে, কাশ্মীরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত করার ব্যাপারে সহায়ক হয়নি।

পাকিস্তানের সাথে সন্ত্রাসবাদকে সম্পৃক্ত করাটা ঠিক হয়নি সুষমার জন্য। বিশ্বজুড়ে সবার সামনে পরিষ্কার, সন্ত্রাসবাদ কোনো একটি দেশ বা ধর্মের সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আফগানিস্তানে আল কায়েদার ঘাঁটি রয়েছে। কিন্তু তবুও যুক্তরাষ্ট্রসহ কোনো দেশই আফগানিস্তানকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত করে না। অধিকন্তু, ভারতের তালিকাভুক্ত কিছু সন্ত্রাসী সংগঠনও পাকিস্তানে হামলা চালিয়েছে, তাদেরকে টার্গেট করেছে ইসলামাবাদও।

দ্বিমুখী নীতির কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সন্ত্রাসবাদের অভিন্ন সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে পারেনি। বেশিরভাগ দেশ তাদের মান অনুযায়ী তাদের বা তাদের মিত্রদের জন্য ক্ষতিকর বিবেচিতদের সন্ত্রাসী হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। আবার এই সংগঠনকে অন্য দেশ ‘মুক্তি সেনা’ হিসেবে অভিহিত করে।

ভারত সন্ত্রাসবাদ প্রশ্নে দ্বিমুখী নীতি গ্রহণের জন্য বিশ্বের সমালোচনায় মুখর হলেও সে নিজে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপগুলোকে সমর্থন দিচ্ছে। এসব গ্রুপ পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা চালাচ্ছে।

কাশ্মীরে দীর্ঘ দিন ধরে ভারতবিরোধী বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর অস্তিত্ব থাকার কারণ হলো এই অঞ্চলের মালিকানা নিয়ে বিতর্ক। মাউন্ট ব্যাটেনের ভারতবর্ষ বিভক্তির সূত্র অনুযায়ী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে কাশ্মীরের থাকা উচিত ছিল পাকিস্তানে।

অবশ্য মহারাজা ছিলেন হিন্দু। তিনি পাকিস্তানের বদলে ভারতে যোগদানে আগ্রহী ছিলেন। কাশ্মীর নিয়েই দুই দেশের মধ্যে দুটি বড় আকারের যুদ্ধ হয়। এটা কাশ্মীরকে দুই ভাগে বিভক্ত করে এবং বিভাজন রেখাটি ‘লাইন অব কন্ট্রোল’ (এলওসি) নামে পরিচিত।

এর পরপরই কাশ্মীরে মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদী অনেক গ্রুপের আত্মপ্রকাশ ঘটে। তাদের লক্ষ্য হয় পাকিস্তানের সাথে যোগদান, কিংবা স্বাধীনতা। এসব গ্রুপ পাকিস্তানের কাছ থেকে সমর্থন পায়, প্রায়ই ভারতের ওপর হামলা চালায়। ভারত এসব গ্রুপকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে অভিহিত করে, পাকিস্তান মনে করে মুক্তি সেনা। কাশ্মীরের মালিকানা প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো এসব গ্রুপকে সামরিক গ্রুপ কিংবা জঙ্গি গ্রুপ হিসেবে অভিহিত করে।

আফগানিস্তান থেকে ১৯৯০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রত্যাহারের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধকারী আফগানিস্তানের অনেক মুসলিম যোদ্ধা কাশ্মীরে চলে আসে। তারা ভারতীয় প্রশাসন থেকে বের হতে সেখানকার মুসলিমদের সহায়তা করে। এতে কাশ্মীরের যুদ্ধ আরো তীব্র হয়।

৯/১১-এর আক্রমণের পর সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধে ভারতের সহযোগিতার প্রয়োজন দেখা দিলে কাশ্মীরের ভারতবিরোধী গ্রুপগুলোর ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের জন্য পাকিস্তানকে চাপ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া ওয়াশিংটন কয়েকটি গ্রুপকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবেও ঘোষণা করে। পাকিস্তান সরকার তাদেরকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ না করা সত্ত্বেও ভারতে তাদের হামলা বন্ধ হয়নি।

সত্যিকার অর্থে, ভারতকে লক্ষ্য করে পরিচালিত বেশির ভাগ হামলা কাশ্মীরের ভারতবিরোধী গ্রুপগুলো নয়, বরং মাওবাদী এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলো চালিয়ে থাকে। এসব হামলা হয় ভয়াবহ রকমের প্রাণঘাতী।

কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার বিতর্কের অবসান না হওয়া পর্যন্ত কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী গ্রুপগুলোর ভারতের ওপর হামলা বন্ধ হবে না। যদিও উভয় পক্ষই জানে, তারা পুরো অঞ্চলের মালিকানা লাভ করতে পারবে না, তবুও কোনো পক্ষই আপস করতে রাজি নয়। উভয় দেশ পরমাণু অস্ত্রধারী হওয়ায় দুই দেশের মধ্যে অনেক বেশি বিচক্ষণ দৃষ্টিভঙ্গি হতে পারে এলওসি ধরে কাশ্মীরকে বিভক্ত করা।

কাশ্মীর প্রশ্নে চীন নিরপেক্ষ অবস্থানে রয়েছে। চীন আশা করছে, দেশ দুটি শান্তিপূর্ণভাবে তাদের বিরোধের মীমাংসা করতে পারবে। দুই দেশের সাহায্যের দরকার পড়লে চীন গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে পারে। তা নাহলে চীন এতে সম্পৃক্ত হবে না।

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech