ফেঁসে যাচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী!

  

পিএনএস ডেস্ক: রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে দুই মাস ধরে চলা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের তদন্ত গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার সরকার এ তদন্ত শুরু করেছে।

তবে লোক দেখানো এ তদন্ত করছে সেনাবাহিনীই। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারাই তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ায় এর ফলাফল কী হবে তা সহজেই অনুমেয়। তদন্তকারীরা সাদা কাগজে রোহিঙ্গাদের স্বাক্ষর গ্রহণ ও ছবি তুলে নিচ্ছে। এ দিকে মিয়ানমার সেনাদের অব্যাহত নির্যাতন-নিপীড়নের মুখে আরো আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছেন বলে সম্প্রতি বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন।

সূত্র জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার বুচিডং জেলার প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে বিভিন্ন বয়সের পাঁচজন করে রোহিঙ্গাকে জেলা অফিসে ডেকে নেয়া হয়। এরপর তাদের কাছে ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। রোহিঙ্গারা নির্ভয়ে তাদের সাথে যা ঘটেছে তা তোলে ধরছে।

রোহিঙ্গারা এ তদন্ত টিমকে জানিয়েছেন, ‘সেনাবাহিনী আমাদের স্বজনদের হত্যা ও আমাদের মা-বোন ও মেয়েদের ধর্ষণ করছে, ঘরবাড়িতে আগুন দিয়ে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে। দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করছে। লাখ লাখ মানুষ বাংলাদেশে চলে গেছে। তদন্ত টিম বিশেষভাবে জানতে চান, তোমাদের জাতিগোষ্ঠীর নাম কী? এর উত্তরে রোহিঙ্গারা বলেন, ‘আমরা রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠী’।

তথ্যদাতাদের বর্ণনা দিয়ে সূত্র আরো জানিয়েছে, রোহিঙ্গারা যেসব তথ্য তুলে ধরেছে, তদন্ত টিমের সদস্যরা তা লিপিবদ্ধ করেনি। কিন্তু কয়েকটি সাদা কাগজে প্রত্যকের কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়েছে তারা। পরে তথ্যদাতা রোহিঙ্গাদের ছবিও তুলেছে তারা।

এ দিকে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে আকিয়াবের রোহিঙ্গা মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল মাম্ব্রা থেকে ৩০ জন আলেমকে আটক করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিপি)। এ ঘটনায় আকিয়াবের রোহিঙ্গা পল্লীতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। স্থানীয় রোহিঙ্গাদের ধারণা, মংডু, বুচিডং এবং রাচিডংয়ের মতো আকিয়াবের রোহিঙ্গা মুসলমানদের উচ্ছেদ করতে এ অভিযান চালাচ্ছে প্রশাসন।

অপর দিকে বুচিডংয়ের গুদামপাড়া বড় জামে মসজিদ ভাঙচুর করেছে উগ্রপন্থী রাখাইনরা। গত বৃহস্পতিবার রাখাইন ও মগদের একটি দল ওই মসজিদের আসবাবপত্র লুট করে এবং দরজা, জানালা, গ্রিল কেটে নিয়ে যায়। সূত্র আরো জানিয়েছে, ইতঃপূর্বে গুদামপাড়ায় অগ্নিসংযোগ করেছিল মিয়ানমারের বাহিনী। জীবন বাঁচাতে দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেয়। এখনো কিছু মানুষ পাহাড় ও বনে জঙ্গলে লুকিয়ে আছে।

সূত্র জানিয়েছে, ১৯ অক্টোবর দুপুরে তিন প্লাটুন যৌথবাহিনী মাম্ব্রার হত্তিপাড়ায় প্রবেশ করে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সহায়তায় ওই এলাকায় মসজিদ-মাদরাসার দায়িত্বে নিয়োজিত আলেম, কুরআনে হাফেজ এবং মাদরাসার ছাত্রসহ ৩০ জনকে ডেকে নেয়া হয়। পরে তাদের আটক করে স্থানীয় সেনাক্যাম্পে নেয়া হয়। বৃহস্পতিবার রাতে এদের মধ্যে ২৭ জনের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে ছেড়ে দেয়। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তিনজন আলেমকে সেনা কর্তৃপক্ষ মুক্তি দেয়নি।

মুক্তি পাওয়া একজন আলেম নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাদের আটক করে সেনাক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার পর কোনো জেরা করেনি সৈন্যরা। সন্ধ্যার পর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এসে তিনজনকে আলাদা কয়েদখানায় নিয়ে যায়। বাকিদের কিছুক্ষণ পর পর নাম ধরে ডেকে মুক্তি দেয়। মুক্তি দেয়ার বিনিময়ে আমাদের স্বজনদের থেকে অর্থ নিয়েছে।

যে তিনজনকে এখনো আটক করে রেখেছে তারা হলেন, মাহমুদুল হকের ছেলে মাওলানা মোহাম্মদ কাবিল (৩৫), মাওলানা ফয়াসাল (৪৫), হাদায় পাড়ার মাদরাসা শিক্ষক হাফেজ কমরুদ্দিন (২৮)।

ধারণা করা হচ্ছে মংডু, বুচিডং এবং রাচিডংয়ের মতো আকিয়াবের রোহিঙ্গা মুসলমানদেরও নিশ্চিহ্ন করতে এ অভিযান চালাচ্ছে প্রশাসন। প্রসঙ্গত, চলতি মাসের শুরুতে ওই এলাকায় একটি স্থলমাইন বিস্ফোরণের ঘটনা নিয়ে রোহিঙ্গাদের হয়রানি শুরু করে সৈন্যরা। চলতি সপ্তাহে একজন মুসলমানকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে উগ্রপন্থী রাখাইনরা।

এ দিকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বলছেন, সেনাবাহিনীর বর্বরতা থেকে প্রাণ বাঁচাতে রোহিঙ্গা যুবকরা এখনো ঝোপ-জঙ্গলে আশ্রয় নিচ্ছেন। ওখানে মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে। সেনাবাহিনী দেখামাত্র গুলি করে হত্যার চেয়েও ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে খাদ্য ও চিকিৎসা সঙ্কট তৈরির মাধ্যমে। দ্রুত চিকিৎসা ও খাদ্যের ব্যবস্থা করা না গেলে হাজার হাজার রোহিঙ্গা অনাহার ও বিনা চিকিৎসায় মারা যাবেন বলে জানিয়েছেন পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা।

জাতিগত নিধন ও মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের মাধ্যমে রাখাইনে মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে। গত দুই মাসে সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যে শত শত রোহিঙ্গা নাগরিককে হত্যার পাশাপাশি বিনা বিচারে দীর্ঘ মেয়াদে জেল দিচ্ছে। ইতোমধ্যে ৯ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাস্তচ্যুত হয়েছেন। ছয় লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। নতুন-পুরনো মিলে বাংলাদেশে বর্তমানে আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গা সংখ্যা অন্তত ১১ লাখ।

এখনো যারা রাখাইনে আছেন তারা বাড়িতে থাকতে পারছেন না। কারণ সৈন্যরা রোহিঙ্গাদের পেলেই মারধর, হত্যা কিংবা গুম করছে। এ কারণে রোহিঙ্গারা বাধ্য হয়ে উপকূলীয় প্যারাবন, নদীর ধারে কিংবা বন জঙ্গলে ফেরারি জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। লতা পাতা খেয়ে তাদের দিন কাটাতে হচ্ছে। এদের সংখ্যা দুই থেকে আড়াই লাখ হতে পারে। তারাও সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার অপেক্ষায়।

এ দিকে বাংলাদেশ সীমান্ত খোলা আছে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং স্থানীয় উগ্রবাদী সংগঠনগুলো বাকিদেরও ভয়ভীতি দেখিয়ে দেশান্তরী করার তৎপরতা চালাচ্ছে। পুরো রাখাইন রাজ্যজুড়ে রোহিঙ্গাবিরোধী বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে সেখানকার উগ্রবাদী মগরা। সেনাবাহিনী তাদের মদদ দিয়ে যাচ্ছে।

পিএনএস/আলআমীন

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech