একুশে আগস্ট গ্রেনেড বোমা হামলার মামলা সাক্ষীরা যে যা বলেছিলেন

  

পিএনএস ডেস্ক : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ১৪ বছরের মাথায় রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, আগামী সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে রায় হতে পারে।

মামলার আসামি তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন চলছে। চলতি মাসের ২৭, ২৮ ও ২৯ তারিখ তাঁর পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হতে পারে। এরপর মামলার রায় ঘোষণার জন্য দিন ঠিক করবেন আদালত।

সরকারি কৌঁসুলি আবু আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা আশা করছি, আগামী সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে অথবা অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে মামলার রায় ঘোষণার জন্য আদালত দিন ঠিক করতে পারেন।’

রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনাকারী কৌঁসুলি সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, ‘সাক্ষ্যপ্রমাণ দিয়ে সন্দেহাতীতভাবে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আমরা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। আমরা আদালতের কাছে আবেদন করেছি, আর্জেস গ্রেনেড দিয়ে হামলা করে নিরীহ নিরস্ত্র মানুষকে হত্যার জন্য যারা দায়ী, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি যেন দেওয়া হয়। আমরা মামলা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি।’

তবে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আদালতকে বলেছেন, প্রকৃত সত্য উদঘাটন না করে হয়রানি করার জন্য তাঁদের আসামি করা হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের জবানবন্দি

মেজর জেনারেল (অব.) সাদিক হাসান রুমী, মহাপরিচালক, ডিজিএফআই

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর জনসভায় গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে। ওই দিন বিকেল ৫টা ৩০ মিনিট থেকে ৫টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে ঢাকা অ্যাটাচমেন্ট কমান্ডার কর্নেল ইমাম আমাকে ফোনে এ ঘটনা জানান। আমি বিরোধীদলীয় নেত্রী সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি বলেন, তিনি সামান্য আহত অবস্থায় বাসভবনে পৌঁছে গেছেন। ঘটনাটি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে সঙ্গে সঙ্গে জানানোর চেষ্টা করি। সেই সময় তিনি নোয়াখালীতে একটি জনসভায় ব্যস্ত ছিলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর এডিসিকে না পেয়ে তাঁর রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীকে টেলিফোন করি। ঘটনা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে জানানোর জন্য বলি। তিনি শুনে টেলিফোন রেখে দেন এবং বলেন তিনি জানাবেন। এরপর তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরকে টেলিফোন করি। শুনেছেন, জানিয়ে টেলিফোন রেখে দেন। এরপর আমি আমার সিআইবির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার এবং কর্নেল ইমামকে ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে আমাকে জানাতে বলি। পরদিন ২০০৪ সালের ২২ আগস্ট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী জানান, ঘটনার দিন রাতে লুৎফুজ্জামান বাবর তাঁকে ঘটনাস্থল থেকে অবিস্ফোরিত গ্রেনেডগুলো সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ধ্বংস করার নির্দেশ দেন।

সেই মতে তিনি সেনাবাহিনীর সদস্য পাঠিয়ে রাতে দুটি অবিস্ফোরিত গ্রেনেড ওসমানী উদ্যানের ভেতর সেনাবাহিনী দ্বারা ধ্বংস করেন। এরপর আমি ২২ তারিখ ডিজিএফআইয়ের কয়েকজন অফিসারকে পরিদর্শন এবং তথ্য উদঘাটনের জন্য ঘটনাস্থলে পাঠাই। এলাকাটি পুলিশ দিয়ে কর্ডন করা ছিল, আমার অফিসারেরা কোনো কিছুই উদঘাটন করতে পারে নাই। ওই দিন দুপুর ১২টার দিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাই। ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার জন্য ডিজিএফআইয়ের পক্ষ থেকে একটা তদন্ত দল গঠন করার অনুমতি চাই। উত্তরে তিনি বলেন, তদন্তের জন্য একটা কমিটি করে দেওয়া হবে। আপনাদের তদন্ত করার প্রয়োজন নাই। এরপর আমি সেখান থেকে ফিরে যাই, চিন্তা করি আমার একটা তদন্ত কমিটি গঠন করার প্রয়োজন ছিল।

‘আমি লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দারকে টেলিফোন করি, মাওলানা সালামের মাধ্যমে তাজউদ্দিনকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করতে বলি। এ-ও বলি, র‍্যাব তাঁকে খুঁজছে। সাইফুই ইসলাম জোয়ার্দার আমায় বলেন, মাওলানা তাজউদ্দিনকে র‍্যাবের হাতে তুলে দিলে অসুবিধা আছে। অসুবিধার কথা জিজ্ঞাসা করলে আমাকে জানানো হয়, সরকার বিব্রত অবস্থায় পড়তে পারে। এ ঘটনার দুই থেকে তিন দিন পর ব্রিগেডিয়ার এ টি এম আমিন আমাকে জানায়, মাওলানা তাজউদ্দিনকে পাওয়া গেছে।

তাঁকে গুলশান সেফ হাউসে রাখা হয়েছে। পরে এ টি এম আমিন এবং সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার জানায়, মুফতি হান্নানের দেওয়া তথ্য মাওলানা তাজউদ্দিন স্বীকার করেছে। এ-ও জানায়, এ ব্যাপারে তারা লুৎফুজ্জামান বাবর, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর পিএস সাইফুল ইসলাম ডিউককে এ ঘটনা জানিয়েছে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে জানানোর জন্য। তারা আরও জানায়, মাওলানা তাজউদ্দিন সম্বন্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং সাইফুল ইসলাম ডিউক জানতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বরাত দিয়ে। আমিন এবং সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার তাঁদের এ-ও জানিয়েছে, মাওলানা তাজউদ্দিনকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে তারা ব্যবস্থা করছে। তারা আরও বলে, মাওলানা তাজউদ্দিন পাকিস্তান যেতে ইচ্ছা পোষণ করেছেন। আমি তখন তাদের বলি, তোমরা যখন সব ব্যবস্থা করে ফেলেছো আমাকে না জানিয়ে, এখন আমায় কেন জিজ্ঞাসা করছ? সাইফুল ইসলাম ডিউক তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বোনের ছেলে। লে. কর্নেল সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার ডিউকের ভায়রা ভাই। ব্রিগেডিয়ার এ টি এম আমিনের সঙ্গে তাঁদের সখ্য থাকার কারণে ডিজিএফআইয়ের অনেক রিপোর্ট সরাসরি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে চলে যেত। সেহেতু ডিজিএফআইয়ের গোপনীয়তা অনেক সময় বজায় রাখা সম্ভব হতো না।’

মোসাদ্দেক বিল্লাহ, অধ্যক্ষ, গাজীপুরের জামিয়া আহমদীয়া মাদ্রাসা
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট দুপুরে দোকান বন্ধ করে পশ্চিম মেরুল বাড্ডার বাসায় যাই। বাসার নম্বর ম-৯৪, পশ্চিম মেরুল বাড্ডা। সেখানে তখন ১০ থেকে ১৫ জনকে দেখি। উপস্থিত ছিলেন মাওলানা লিটন, আহসান উল্লাহ কাজল, মুত্তাকিন মুরসালিন, আবু জান্দাল ও মুফতি হান্নান। দেখি কালো ব্যাগ থেকে গোল গোল কী যেন বের করছে। আমি একজনকে জিজ্ঞাসা করি সেগুলো কী জিনিস? সে বলল, ‘এগুলো শেখ হাসিনার নাশতা।’ সন্ধ্যার সময় লোকমুখে শুনতে পেলাম বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে হামলা হয়েছে। তখন আমি বুঝতে পারি ‘শেখ হাসিনার নাশতা’ কথার অর্থ।


মোহাম্মদ শামসুল ইসলাম, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন সিআইডির এএসপি আবদুর রশীদ। তদারকি কর্মকর্তা ছিলেন এএসপি রুহুল আমিন। কোটালীপাড়ার হামলায় মুফতি হান্নানের নাম আসে। ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন সিআইডির এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান। মুফতি হান্নানকে গ্রেপ্তার করার জন্য নির্দেশ দিই। আমার কার্যকালে মুফতি হান্নানকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হইনি। সিআইডিতে থাকাকালে এসপি রুহুল আমিন জানান, জনৈক জজ মিয়া ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় জড়িত।

সে থাকে নোয়াখালীর সেনবাগে। জজ মিয়াকে গ্রেপ্তার করে আমার সামনে আনা হয়। আমি তাদের প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশনা দিই। তাঁরা আমাকে জানায়, জজ মিয়া ঘটনার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিতে চায়। কয়েক দিন পর এএসপি রুহুল আমিন জানায়, জজ মিয়ার মা অত্যন্ত গরিব। তাঁকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। আমি কাজটি বেআইনি বলে তাঁকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করি। রুহুল আমিন আমাকে বলেন, তিনি কাজটি গোপনে করবেন, কেউ জানবে না। তখন তিনি আমাকে জানান, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর বিষয়টি জানেন। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বলেছেন।

মেজর (অব.) আতিকুর রহমান
২০০৪ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত র‍্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখার উপপরিচালক ছিলাম। ২০০৫ সালের ১ অক্টোবর র‍্যাব টঙ্গীর স্টেশন রোডের একটা বাসা থেকে মহিবুল্লাহ ওরফে অভিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হই। একইদিন মেরুল বাড্ডা থেকে মুফতি হান্নানকে গ্রেপ্তার করি। মুফতি হান্নানকে চাঞ্চল্যকর গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে টিএফআই সেলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ১৭ আগস্টসহ সব গ্রেনেড হামলায় তাঁর সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেন। র‍্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক গুলজারের কাছ থেকে জানতে পারি, মুফতি হান্নানের গ্রেপ্তারের বিষয়টি তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি খুশি হয়েছেন বলে মনে হয়নি। এরপর ২০০৬ সালে সিলেট থেকে বিপুল ও মিজানকে র‍্যাব গ্রেপ্তার করে। বিপুল জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে জানায়, মুফতি হান্নান ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় জড়িত। পরে মুফতি হান্নান জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, ২১ আগস্ট হামলার আগে সে, মাওলানা তাজউদ্দিন, আহসান উল্লাহ কাজল, হাফেজ আবু তাহের, আবু জান্দাল ওরফে মুফতি মঈন, তাজউদ্দিনের আপন ভাই তৎকালীন উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর সরকারি বাসায় মিটিং করেছে।

লে. কমান্ডার (অব.) মিজানুর রহমান
২০০৪ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ডিজিএফআইয়ের কাউন্টার টেররিজম উইং-এ কর্মরত ছিলাম। ২০০৫ সালে নাম হয় কাউন্টার টেররিজম ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো। ২০০৫ সালের মাঝামাঝি সময় জিএসও-১ হিসেবে যোগ দেন লে. কর্নেল সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার। আর ২০০৬ সালে পরিচালক হিসেবে যোগ দেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ টি এম আমিন।

‘মুফতি হান্নানকে জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পারি, ২০০৪ সালের ১৮ বা ১৯ আগস্ট মাওলানা আবু তাহের মুফতি হান্নানকে মোহাম্মদপুরে যেতে বলেন। পরে মুফতি হান্নান তাঁর এক সহযোগীকে নিয়ে আবদুস সালাম পিন্টুর বাসায় যান। আগে থেকে সেখানে মাওলানা তাজউদ্দিন অবস্থান করছিলেন। মুফতি হান্নানের তথ্য অনুসারে, ওই সময় আবদুস সালাম পিন্টুর বাসায় একটা কালো গাড়িতে করে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর আসেন, এর কিছুক্ষণ পর বের হয়ে যান।


মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
হামলা শেষে জানতে পারি, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের উদ্দেশে সেদিন সর্বমোট ১২টি গ্রেনেড ছোড়া হয়েছিল। গ্রেনেডগুলো ছিল আর্জেস ৮৪ গ্রেনেড। আমার জানা মতে, এসব গ্রেনেড দেশে তৈরি হয় না। বিদেশ থেকে সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণ বা ব্যবহারের জন্য গ্রেনেডগুলো ব্যবহার হয়ে থাকে। পরে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা অফিসার মেজর (অব.) শোয়েব আমায় বলেছিলেন, ওই গ্রেনেডগুলো বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ব্যবহার করে থাকে। তিনি আরও বলেছিলেন, ঘটনার কয়েক মাস আগে চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরির প্রত্যন্ত এলাকার জেটি দিয়ে অস্ত্র চোরাচালানের সময় পুলিশ সেযব গ্রেনেড আটক করেছিল বলে দেখানো হয়েছে, ঘটনার সময় সেই ধরনের গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়। যেসব গ্রেনেড ছোড়া হয়েছিল এর মধ্যে ৩টি অবিস্ফোরিত অবস্থায় থাকে। পরে পুলিশ সেগুলো উদ্ধার করে ফরেনসিক পরীক্ষা ছাড়াই সেগুলো ধ্বংস করে দেয়।

কাজী জাফর উল্লাহ, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, আওয়ামী লীগ
নেত্রীর বক্তব্য শেষ হওয়ার পরপরই হঠাৎ দেখি, রমনা ভবনের পাশের ট্রান্সফরমারের কাছ থেকে একটি ছেলে যার বয়স ২৫ বছর, ছোট চুল, টি-শার্ট পরা, একটা কিছু ছুড়ল ট্রাকের দিকে। ট্রাকের কাছে বস্তুটি বিস্ফোরিত হয়। আমি “ধর, ধর” বলে চিৎকার করি। আরও বলি, বোমা। এরপর কয়েকটি বোমা আরেকজন ট্রাকের দিকে ছোড়ে। আমার হাতে, বুকে, রক্ত ঝরছিল। আমার পাঞ্জাবি রক্তে লাল হয়ে যায়। পরে আরেকটি বোমার বিস্ফোরণ হয়। জলিল সাহেব ও নাজমা বেগম আমাকে জোর করে ট্রাকের ওপর বসিয়ে দেয়। আমি ট্রাকের ডালার ওপর শুয়ে পড়ি। আরও গ্রেনেডের আওয়াজ পাই। এরপর কিছু বিরতি দেয়। জলিল সাহেব, মায়া সাহেব ও অন্যরা নেত্রী শেখ হাসিনাকে মানববন্ধনের মাধ্যমে ঘিরে ফেলেন। যখন একটু বিরতি হয়, তখন নেতা-কর্মীরা নেত্রী শেখ হাসিনাকে কোলে করে নিয়ে জিপের ভেতর বসিয়ে দেন। পেছনের দিকে নেত্রীর নিরাপত্তায় নিয়োজিত তারেক সিদ্দিকী ও অন্যরা ছিল। তারা নেত্রীকে নিয়ে সরে যায়।

সাক্ষী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, আওয়ামী লীগ নেতা
মামলার আলামত নষ্টের জন্য সরকার তৎপর ছিল। আর্জেস গ্রেনেড বিভিন্ন স্থানে ছড়ানো ছিল। সেগুলো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ধ্বংস করা হয়। বিশ্ব বিবেক জাগ্রত হয়েছিল। এফবিআই এসেছিল তদন্তে। সরকারি সাহায্য পায় নাই।

আশপাশে আছে সচিবালয়, বঙ্গভবন ও পুলিশ হেড কোয়ার্টারস। গ্রেনেড হামলার পর কোনো বাহিনী এগিয়ে আসে নাই। অসহায় মানুষগুলোর আর্তনাদ কারও হৃদয়ে নাড়া দিল না। বরং আসামিদের পালিয়ে যেতে তৎকালীন সরকার সহযোগিতা করেছিল। এতে বোঝা যায়, গ্রেনেড হামলা ছিল পরিকল্পিত। প্রত্যেক অপরাধের একটা মোটিভ থাকে। মামলার মোটিভ হচ্ছে তৎকালীন সরকারের মেয়াদ বৃদ্ধির প্রয়াস। ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা এবং তৎকালীন বিরোধী দলের নেত্রী শেখ হাসিনাসহ অন্য নেতা-কর্মীদের হত্যা করে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করা।

২১ আগস্ট হামলার মামলায় তদন্ত শেষে সিআইডির এএসপি ফজলুল কবীর ২০০৮ সালের ১১ জুন হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে আদালতে দুটি অভিযোগপত্র জমা দেন। তাতে ২২ জনকে আসামি করা হয়। সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু ছাড়া বাকি আসামিদের সবাই হুজি-বির জঙ্গি।

অধিকতর তদন্তের আসামি: ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সিআইডি এ মামলার অধিকতর তদন্ত করে এবং ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয়। তাতে আরও ৩০ জনকে আসামি করা হয়। তাঁরা হলেন তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবর, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, সাবেক সাংসদ শাহ মোহাম্মদ কায়কোবাদ, খালেদা জিয়ার ভাগনে সাইফুল ইসলাম (ডিউক), এনএসআইয়ের সাবেক দুই মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার (অব.) আবদুর রহিম ও মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার, ডিজিএফআইয়ের মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, পুলিশের সাবেক তিন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আশরাফুল হুদা, শহুদুল হক ও খোদা বকশ চৌধুরী, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি খান সাইদ হাসান ও মো. ওবায়দুর রহমান, জোট সরকারের আমলে মামলার তিন তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান ও এএসপি আবদুর রশিদ, হানিফ পরিবহনের মালিক মো. হানিফ এবং হুজি-বির ১০ জন নেতা।

আসামিদের মধ্যে পুলিশের সাবেক ছয় কর্মকর্তা, খালেদা জিয়ার ভাগনে সাইফুল ইসলাম ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর আরিফুর রহমানসহ ৮ জন জামিনে আছেন। বাবর, পিন্টুসহ ২৩ জন আসামি কারাগারে আছেন। পলাতক রয়েছেন ১৮ জন। অন্য মামলায় তিন আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় বর্তমানে আসামির সংখ্যা ৪৯। পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছে।

গ্রেনেড হামলায় সরাসরি জড়িত ও আসামি ফরিদপুরের মাহাবুব মুস্তাকিম ও আনিসুর মুরসালিন। এই দুই ভাই দীর্ঘদিন ধরে ভারতের নয়াদিল্লির তিহার কারাগারে আছেন। ভারত থেকে গত সাত বছরেও এই দুই আসামিকে ফিরিয়ে আনতে পারেনি সরকার।-প্রথম আলো

পিএনএস/জে এ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech