কাশ্মীরের মৌলিক অধিকার বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো সাংবিধানিক দায়িত্ব

  

পিএনএস (মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম প্রধান) : গত ৫ আগস্ট জম্মু-কাশ্মীরের ওপর থেকে বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের পর সেখানের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার ভূলুষ্ঠিত হয়েছে বললে কমই বলা হবে। প্রতিনিয়ত তাদের উপর দমন-পীড়ন চলছেই। সেখানের মানুষগুলোর ন্যূনতম অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। সেখানে নাকি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ চলছে কথিত রামরাজত্ব।

ক্ষমতাসীন মোদি সরকার জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের ঘোষণার পর সেখানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানরা যারপরনাই শঙ্কিত । তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার থেকে নানাভাবে তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। সেখানের মানুষকে দমিয়ে রাখা হয়েছে কার্যুয়সসহ নানা ধনের আইনের খড়গে। সারাক্ষণ সেনাবাহিনী টহল দিচ্ছে। যেন তারা গরুর পাল তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

জম্মু-কাশ্মীর মূলত এমন একটি অঞ্চল বা এলাকা, যেখানের জনগোষ্ঠী স্বাধীনভাবে তাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার রাখে। যে যা-ই বলুক না কেন, তারা না-ভারতের, না-পাকিস্তানের, না-চীনের। তারা নিজের স্বাধীন ভূমিতে বসবাসকারী। তাদের বিষয়ে একক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কারো নেই। সে বিষয়টির সুরাহা অনেক আগেই হয়ে আছে এবং গেছে, যা আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত।

এখন যদি তারা আন্তর্জাতিক আদালতে যায়, তাহলে ভারতের এসব জবরদস্তিমূলক আচরণ অবৈধ ঘোষিত হবে বলে আন্তর্জাতিক বিষয়ে অভিজ্ঞ জনদের স্পষ্ট অভিমত। আর কার সঙ্গে যাবে, না-যাবে, সেটা একান্তই জম্মু-কাশ্মীরে নাগরিকদের ব্যাপার। তাদের উপর কিছু ছাপিয়ে দিলে, সেটা গায়ের জোর বৈ অন্য কিছু নয়। সভ্যদের উচিত, তাদের সিদ্ধান্ত তাদেরই নিতে দেওয়া।

গণমাধ্যমে ইতিমধ্যে খবর বেরিয়েছে, হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী মনোহর লাল খাত্তার শুক্রবার এক জনসভায় নাকি বলেছেন, ‘আমাদের পথের কাঁটা সরে গেছে। এখন কেবল বিহার থেকে নয়, আমরা এখন কাশ্মীর থেকেও মেয়ে আনতে পারবো।’ এর আগে বিজেপি নেতা বিক্রম সাইনি তার দলের নেতা-কর্মীদের কাশ্মীরে গিয়ে জমি ও নারীদের ওপর দখল নেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ছিঃ, নোংরা মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ এভাবে ঘটছে।

তিনি মোদি সরকারের ওই বিতর্কিত ঘোষণার পরদিনই নাকি কাশ্মীরের মুজাফফরনগরে গিয়ে বলেন, ‘মোদিজীকে ধন্যবাদ। তিনি আমাদের অনেক দিনের স্বপ্ন বাস্তবায়িত করেছেন। এ আনন্দে ড্রাম বাজাচ্ছে গোটা ভারত। বিজেপিতে অবিবাহিত কর্মীরা, যারা এতদিন ধরে কাশ্মীরের সুন্দরী নারীদের বিয়ে করার স্বপ্ন দেখছে, তারা এখন নির্ভয়ে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারবেন। তোমরা সবাই কাশ্মীরে যাও এবং সেখানকার সুন্দরী নারীদের বিয়ে করো। একই সঙ্গে সেখানকার জমাজমির মালিক হও।’ কী অশোভন ও কুরুচিকর ইতরসম বক্তব্য!

জম্মু-কাশ্মীর নাগরিকরা কোথায় যাবে বা থাকবে, আদৌ কোথাও যাবে কিনা- এটা একান্তই তাদের নিজস্ব ব্যাপার। এখানে কারো মাতাব্বরি অথবা দাদাগিরির সুযোগ নেই। তাদের মতামতের বাইরে কিছু ঘটলে, যারা ঘটাবে- তারা জম্মু-কাশ্মীদের মৌলিক ও মানবাধিকার হরণের দায়ে অভিযুক্ত হবেই। অধিকার হরণের প্রশ্নে কেউ আদালতে গেলে, দখলদারদের মাসুল দিতে হবে বৈকি।

বাংলাদেশ সব সময়ই বিশ্বের সব দেশের নাগরিকদের মৌলিক ও মানবাধিকার রক্ষায় সোচ্চার। এটা আমাদের সংবিধানের ২৫ ধারায় স্পষ্ট রয়েছে। জম্মু-কাশ্মীর বিষয়টি কোরো ‘একান্ত’, ‘নিজস্ব’ ‘অভ্যন্তরীণ ব্যাপার’ বলে পাশ কাটানোর কোনো সুযোগ নেই। তাহলে এটা হলে সংবিধানের স্পষ্ট লঙ্ঘন। সেখানের নাগরিকদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যা চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে আর হচ্ছে, এর বিরুদ্ধে সোচ্চার দরকার।

বাংলাদেশের সংবিধানে যে বিষয়টি স্পষ্ট, সে ব্যাপারে ‘ভারতের নিজস্ব’ ব্যাপার বলে আমাদের এড়িয়ে যাওয়াকে দৃষ্টিকটূ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ, আইনজ্ঞ ও সমাজ বিজ্ঞানিরা।এর বাইরে সংবিধানের ক ও খ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যথাক্রমে (খ) প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পথ ও পন্থার মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনের অধিকার সমর্থন করিবেন; এবং (গ) সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতাবাদ বা বর্ণবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করিবেন৷

সংবিধানের উল্লিখিত ধারাটির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনে আজকের ক্ষমতাসীনদের অবশ্য অবশ্যই দায় রয়েছে। ফিলিস্তিন, কাশ্মীরের অধিকারহীন মানুষের প্রতি সাংবিধানিক দায় এড়ানোর সুযোগ সাংবিধানিকভাবে যে নেই, সে সত্য তো দিবালোকের মতো স্পষ্ট।কাশ্মীরের নির্যাতিত, নিপীড়িত ও মৌলিক অধিকার বঞ্চিত মানুষগুলোর পাশে আমাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে দাঁড়ানো সময়ের দাবি।

প্রতিবেদক : বিশেষ প্রতিনিধি- পিএনএস

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech