চলতি বছর শান্তিতে নোবেল পাচ্ছেন গ্রেটা?

  


পিএনএস ডেস্ক: ‘ফাঁকা বুলি দিয়ে তোমরা আমার স্বপ্ন কেড়েছ, আমার শৈশবটাই কেড়ে নিয়েছ।’ জাতিসঙ্ঘের আন্তর্জাতিক মঞ্চে এভাবেই রাষ্ট্রনেতাদের ‘তিরস্কার’ করেছিলেন সুইডিশ কিশোরী। গ্রেটা থুনবার্গ। তাকে নিয়েই এখন জল্পনা তুঙ্গে। কারণ, চলতি বছর নোবেল পুরস্কার দেয়া শুরু হয়েছে সোমবার। নোবেলের জন্য এ বছর মনোনয়ন পেয়েছে ২২৩ জন এবং ৭৮টি প্রতিষ্ঠান। কারা নোবেল পাচ্ছেন— এ নিয়ে ইতিমধ্যে নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা এই বিষয়ে সতর্ক। কিন্তু যারা বাজি ধরছেন, তারা বলছেন, অন্য কারো চেয়ে এবার সুইডেনের সেই কিশোরী পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গেরই নোবেল পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। জুয়ারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে খ্যাতি রয়েছে ল্যাডব্রোকেসের। তারা বলছে, বিশ্বব্যাপী লাখো তরুণের নিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে যে আন্দোলন গড়ে তুলেছে, এ জন্য নোবেল পাবে ১৬ বছর বয়সি গ্রেটা। তার এই আন্দোলনের নাম ‘ফ্রাইডেস ফর ফিউচার’।

জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে রাজনৈতিক নেতাদের নিস্পৃহ আচরণের প্রতিবাদে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে এই কিশোরী। তার দেখানো পথে হেঁটে ‘পরিবেশের জন্য শুক্রবার’ নামে এই আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন দেশের হাজার হাজার পডুয়া। প্রাপ্তবয়স্কদের সচেতন করতে তারা প্রতি শুক্রবার স্কুলে না-গিয়ে রাস্তায় নেমে মিছিল-সমাবেশ করে।

‘অ্যাসপারগার সিন্ড্রোম’ নামে বিরল মনোরোগে আক্রান্ত গ্রেটা চিরকালই স্পষ্ট বক্তা বলে পরিচিত। জাতিসঙ্ঘের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে বলার সময়েও কোনো ‘মেকি’ সৌজন্য দেখায়নি। কী ভাবে ‘প্রাপ্তবয়স্করা’ পরিবেশের বিশাল ক্ষতি করে চলেছে, কেমন করে রাষ্ট্রনেতারা ‘কথা রাখেননি’, তার খতিয়ান দিয়েছিলেন। বলেন, ‘‘পরিবেশ রক্ষা করতে বারবার নানা সময়সূচি ঠিক করেছ তোমরা। আবার তোমরাই সেই সময়সূচি মানোনি। শুধুই আর্থিক বিকাশ নিয়ে কথা বলে গিয়েছ। ফলে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে।’’ রূঢ় স্বরে সে বারবার একই কথা বলতে থাকে— ‘‘তোমাদের এত দুঃসাহস হয় কী করে!’’ গ্রেটার সাবধানবাণী— ‘‘এখনো যদি কিছু না কর, আমরা কিন্তু তোমাদের ক্ষমা করব না। কখনোই না।’’

যেকোনো ধরনের অনুমানের ওপর অনিশ্চয়তা বেশি কাজ করে। এ ছাড়া নোবেল কমিটি যেহেতু ওই পুরস্কার দেয়ার আগে তালিকায় থাকা নামগুলো প্রকাশ করে না, ফলে জল্পনা-কল্পনা আরো বেশি। সহিংসতা ঠেকাতে অবদান, না জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে অবদান রাখায় শান্তিতে নোবেল দেয়া হবে, এটা নিয়েও একধরনের বিতর্ক রয়েছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। ফলে অনিশ্চয়তা আরো বেশি। নরওয়ের রাজধানী অসলোতে ১১ অক্টোবর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হবে। এর আগের দিন ঘোষণা করা হবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার। ওই দিন সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে শান্তিতে মনোনয়ন পাওয়া কয়েকজনের নাম প্রকাশ করা হবে।

গত বছর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন কঙ্গোর নাগরিক ডেনিস মুকওয়েগে এবং ইরাকের মানবাধিকারকর্মী নাদিয়া মুরাদ। যৌন সহিংসতা ঠেকাতে অবদান রাখায় তাদের নোবেল দেয়া হয়। কিন্তু এবার অনেকেই বাজি ধরছেন, গ্রেটা থুনবার্গ পাবে শান্তিতে নোবেল। সম্প্রতি দু’টি পুরস্কার পেয়েছে সে। লন্ডনের মানবাধিকারবিষয়ক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের সর্বোচ্চ সম্মাননা পুরস্কার দিয়েছে গ্রেটাকে। এ ছাড়া সুইডেনের বিকল্প নোবেলখ্যাত ‘২০১৯ রাইট লাইভলিহুড অ্যাওয়ার্ড’ পাচ্ছে গ্রেটা। এই জল্পনা-কল্পনার মধ্যে গ্রেটার পক্ষে কথা বলেছেন স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডান স্মিত। তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে গ্রেটা যা করেছে, তা অসাধারণ। শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।

তবে পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট অসলোর হেনরিক উরডাল বলেছেন, তার ধারণা, গ্রেটা নোবেল পাবে না। এবার সম্ভাবনা খুবই কম। এবার কারা শান্তিতে নোবেল পেতে পারেন, তার একটি ইঙ্গিতও দিয়েছেন হেনরিক। তিনি বলেন, ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ এবার নোবেল পেতে পারেন। কারণ তার প্রচেষ্টায় ইরিত্রিয়ার সঙ্গে ইথিওপিয়ার শত্রুতাপূর্ণ মনোভাবের অবসান হয়েছে। এ ছাড়া দু’টি প্রতিষ্ঠান রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস এবং কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টও পেতে পারে এই পুরস্কার।

এই সেই মেয়ে, যে পনেরো দিনের জলপথের পাড়ি শেষ করে নিউ ইয়র্কে পৌঁছেছিলেন। সুইডেন থেকে বিমানে নিউ ইয়র্ক পৌঁছনো অনেক সহজ হলেও সে পথে যায়নি গ্রেটা। যাত্রাপথে এতটুকু কার্বন-দূষণ যাতে না হয়, সে জন্য পরিবেশ সচেতন কিশোরী বেছে নিয়েছিল পাল তোলা বড় নৌকা। সৌর প্যানেল থেকে সৌর বিদ্যুৎ নিয়ে এবং পানির নিচে টারবাইন ঘুরিয়ে পানিবিদ্যুতের শক্তিতে ওই নৌযানকে চালানো হয়। আটলান্তিক পেরিয়ে যখন ১৬ বছরের এই কন্যার নৌকা ব্রুকলিনের কোনি দ্বীপে পৌঁছয়, তখন সেখানে সাংবাদিক আর শুভাকাঙ্ক্ষীর ভিড়। সাড়ে পাঁচ হাজার কিলোমিটারের পথ পেরিয়ে আসা কিশোরীকে ঘিরে ছবি তোলার ধুম। সকলেই চিৎকার করে স্বাগত জানিয়েছেন গ্রেটাকে। পৌঁছনোর আগে গ্রেটা নিজে একটি দূরের আলো-মাখা ঝাপসা ছবি ট্যুইটারে পোস্ট করে লিখেছে, ‘‘ল্যান্ড!!! দ্বীপের আলো, আর অদূরেই নিউ ইয়র্ক সিটি।’’

গত বছর অগস্ট মাসে কেউ চিনত না সুইডিশ কিশোরীটিকে। প্রথম সংবাদ শিরোনামে আসে সে, যখন খবর হয়, সুইডিশ পার্লামেন্টের বাইরে একটি বাচ্চা মেয়ে রোজ প্ল্যাকার্ড হাতে বসে থাকে। তাতে লেখা, ‘পরিবেশের জন্য স্কুল বন্‌ধ’। কেউ তার পরিবেশ আন্দোলন নিয়ে প্রশ্ন তুললে গ্রেটা বলতেন, ‘‘আমার কথা শুনতে হবে না, বিজ্ঞানীদের কথা শুনুন।’’ এক-এক করে সে পাশে পায় তারই মতো আরো কিছু পড়ুয়াকে। সেই সংখ্যাটা এখন লক্ষ ছাড়িয়েছে। গোটা বিশ্বের দেড় শ'রও বেশি দেশের পড়ুয়ারা একযোগে স্কুল না গিয়ে বিক্ষোভে শামিল। পথে নেমেছে বড়রাও। একা থেকে এক লক্ষ। গ্রেটার জন্য অপেক্ষা করছে দুনিয়ার জনসমুদ্র। সূত্র : বর্তমান

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech