যে ইস্যুতে থাইল্যান্ডের প্রতিটি পরিবার এখন বিভক্ত

  

পিএনএস ডেস্ক : "আমার বাবা আমাকে শিখিয়েছিলেন রাজার সমালোচনা করা পাপ। এটি নিষিদ্ধ।" কিন্তু ১৯ বছর বয়সী ডানাই এখন তার বাবার এই হুঁশিয়ারি মানছেন না। ডানাই ব্যাংককে থাকেন, আইনের ছাত্র।

গত কয়েক মাস ধরে ব্যাংককে যে হাজার হাজার মানুষ রাজতন্ত্রের সংস্কারের দাবিতে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছে, ডানাই তাদের একজন। ডানাইর বাবা পাকর্ন উচ্চ মধ্যবিত্ত। তিনি অনেক দেশ ঘুরেছেন। এই লেখায় এদের দুজনের বেলাতেই ছদ্মনাম ব্যবহার করা হচ্ছে তাদের পরিচয় গোপন রাখার জন্য।

এরা দুজন যদিও একই বাড়িতে থাকেন না, তারপরও দুজনের মধ্যে নিয়মিত দেখা হয়। কিন্তু যতবারই তারা মুখোমুখি হন, একটি বিষয় নিয়ে আলাপ তারা এড়িয়ে যান, সেটি হচ্ছে 'রাজতন্ত্র।' "যদি আমরা এটি নিয়ে কথা বলি, আমাদের মধ্যে তর্ক শুরু হয়ে যাবে। তারপর দিনটাই মাটি হবে", বলছেন ডানাই।

"একবার গাড়িতে বসে আমাদের মধ্যে তর্ক শুরু হয়েছিল আমি রাজার সমালোচনা করার পর। আমার বাবার কাছে রাজা হচ্ছেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে, আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন? তখন তিনি বলেছিলেন, আমার বয়স অনেক কম, আমি বুঝবো না। তিনি বেশ রেগে গিয়েছিলেন। তারপর তিনি চুপ মেরে গেলেন। আমার সঙ্গে আর কথা বলছিলেন না।"

ডানাই এর পরিবার একা নয়। এরকম ঘটনা ঘটছে এখন থাইল্যান্ডের শহরে, গ্রামে-সর্বত্র, ঘরে ঘরে। থাইল্যান্ডে রাজতন্ত্রকে গণ্য করা হয় অত্যন্ত পবিত্র, অলঙ্ঘ্য এক প্রতিষ্ঠান হিসেবে।

অনলাইনে বিতণ্ডা

রাজতন্ত্র নিয়ে এরকম বিতর্ক যে কেবল সামনা-সামনি চলছে তা নয়, এটি ঘটছে অনলাইনে, সোশ্যাল মিডিয়াতেও। এই বিতর্ক বেশ চরমেও চলে যাচ্ছে।

গত মাসে থাইল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলীয় চিয়াং মাই শহরের এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী ফেসবুকে জানালো রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার কারণে তার বাবা তার বিরুদ্ধে মামলা করতে চেয়েছে। তখন মেয়েটির বাবা এর পাল্টা জবাব দিয়ে বললো, সে যেন আর পারিবারিক উপাধি ব্যবহার না করে।

পাকর্ন তার ছেলের আচরণের জন্য দায়ী করছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের। "থাই সমাজে কিছু কট্টরপন্থী গোষ্ঠী আছে, যারা রাজতন্ত্র বিরোধী। এর পাশাপাশি ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়া অনবরত মিথ্যে এবং বিভ্রান্তিকর খবর ছড়িয়ে যাচ্ছে। তরুণরা কোন বাছ-বিচার না করে এসব গিলছে," বলছেন তিনি।

ডানাই তার বাবাকে রাজতন্ত্রের বিষয়ে প্রথম চ্যালেঞ্জ করেন ১৭ বছর বয়সে। "আমরা সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। ছবি শুরু হওয়ার আগে, যখন নিয়মমাফিক রাজকীয় সঙ্গীত বাজছিল, সবাই উঠে দাঁড়ালো রাজার প্রতি সন্মান দেখাতে। আমি এটা করতে চাইনি, কাজেই আমি আমার সীটে বসে রইলাম। আমার বাবা আমাকে উঠে দাঁড়াতে জোরাজুরি করছিলেন। কিন্তু আমি দাঁড়াচ্ছিলাম না। যখন লোকজন আমাদের দিকে তাকাতে শুরু করলো, তখন আমি শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে দাঁড়ালাম।"

থাইল্যান্ডে রাজকীয় সঙ্গীত বাজার সময় কেউ উঠে দাঁড়াতে অস্বীকৃতি জানানো বেআইনি ছিল। তবে ২০১০ সালে আইনটি সংশোধন করা হয়। তবে এখনো কেউ এই কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে সেটিকে রাজতন্ত্রের প্রতি অশ্রদ্ধার প্রকাশ বলে গণ্য করেন অনেকে।

ঐতিহাসিক রীতি

জন্মের পর থেকেই থাইল্যান্ডের মানুষকে শেখানো হয় রাজাকে শ্রদ্ধা করতে, ভালোবাসতে। একই সঙ্গে রাজার বিরুদ্ধে কিছু বললে কী পরিণতি হতে পারে, সেটা নিয়ে ভয়ও তৈরি করা হয়।

থাইল্যান্ড পরিচিত সদাহাস্যময় মানুষের দেশ বলে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি হচ্ছে সেই গুটিকয় দেশের একটি, যেখানে রাজার অবমাননা অপরাধ বলে গণ্য করা হয়। রাজা বা রাণীর বা রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারীর কোনরকম সমালোচনা করা বেআইনি। এর জন্য ১৫ বছর পর্যন্ত সাজা হতে পারে।

এখন অবশ্য সিনেমায় গিয়ে ডানাই আর রাজকীয় সঙ্গীতের সময় উঠে দাঁড়ান না।

গত জুলাই মাস হতে হাজার হাজার বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-ছাত্রী রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছে। থাইল্যান্ডে জরুরি অবস্থা জারি এবং এই বিক্ষোভের অনেক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু তাতে বিক্ষোভ থামেনি।

থাইল্যান্ডের রাজার অসীম ক্ষমতা খর্ব করার দাবি জানাচ্ছে তারা, রাজার জন্য জনগণের অর্থ ব্যয়েরও সীমা বেঁধে দিতে চায় তারা।

বিশ্বের অন্য অনেক দেশে এসব দাবি সেরকম বড় কিছু নয় বলে মনে হতে পারে, থাইল্যান্ডের আধুনিক ইতিহাসে রাজাকে এরকম প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করার উদাহারণ আর নেই।

ছাত্রদের এই বিক্ষোভে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে থাইল্যান্ডের বেশিরভাগ মানুষ। ডানাইর পিতা পাকর্ন তাদের একজন।

"আমার জন্ম রাজা নবম রামার শাসনকালে। তিনি নিজের সন্তানদের চাইতে তার প্রজাদের জন্য বেশি করেছেন। যখন তিনি অসুস্থ হলেন, আমি তার সুস্থতার জন্য নিজে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে রাজী ছিলাম, যদি তাতেও রাজা দীর্ঘায়ু হন। কিন্তু আজকের প্রজন্ম, আমার ছেলে, তাদের সেই অভিজ্ঞতা নেই।-বিবিসি বাংলা

পিএনএস/জে এ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন