বিশ্বের প্রত্যেক মানুষের কাছে ঈদে মিলাদুন্নবীর তাৎপর্য

  

পিএনএস ডেস্ক : পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী ১২ রবিউল আউয়াল- বুধবার। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর জন্ম ও মৃত্যু দিবস। ৫৭০ খৃস্টাব্দের এ দিনে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি আর ৬৩২ খৃস্টাব্দে একই দিনে ইহলোক ত্যাগ করেন। আইয়ামে জাহেলিয়াতের অন্ধকার দূর করতে এই দিনে তৌহিদের মহান বাণী নিয়ে এসেছিলেন এ মহামানব। বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায়সহ শান্তিকামী প্রত্যেক মানুষের কাছে দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

চৌদ্দশ বছর আগে বারোই রবিউল আউয়াল আরবের মরু প্রান্তরে মক্কায় কুরাইশ বংশে মা আমিনার কোল আলোকিত করে জন্ম নিয়েছিলেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। আইয়্যামে জাহেলিয়াতের অন্ধকার দূর করে তৌহিদের মহান বাণী নিয়ে আলোর দিশারী হিসেবে এসেছিলেন মহানবী।
‘ঈদ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ খুশি, আনন্দ, উল্লাস ও ফূর্তি। আর পবিত্র ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী (সা.) হচ্ছে ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.)-এর শুভ জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আনন্দ উৎসব। এ হচ্ছে বিশ্বমানবতার মুক্তিদূত মহানবী (সা.)-এর পৃথিবীর বুকে শুভাগমন উপলক্ষে মুসলিম উম্মাহর তথা সৃষ্টিকুলের জন্য সর্বোচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আনন্দ উৎসব। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) গোটা মানবজাতির জন্য এমনকি সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত ও আশীর্বাদ হিসেবে ধরাধামে আবির্ভূত হন। এ মর্মে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ঘোষণা করেন, ‘আর আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত- ১০৭)

আল্লাহতায়ালা অন্যত্র ইরশাদ করেছেন, ‘হে রাসূল! আমি আপনাকে বিশ্বের সমগ্র মানুষের সংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আল-সাবা, আয়াত- ২৮)

পবিত্র ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী (সা.)-এর গুরুত্ব এই যে, মানবজাতির মুক্তিদাতা সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ১২ রবিউল আউয়াল, ২৯ আগস্ট ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের এ দিনে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁকে প্রেরণের উদ্দেশ্যে ছিল মানবগোষ্ঠীকে এ পৃথিবীতে পাপাচার, সন্ত্রাস, দুর্নীতিসহ সব প্রকার জুলুম, নির্যাতন ও অন্যায় অত্যাচার থেকে মুক্তিদান, সুখ-শান্তি ও সৎপথে পরিচালনা এবং মৃত্যুর পরে জাহান্নামের অগ্নি থেকে পরিত্রাণের মাধ্যমে চিরসুখময় জান্নাতের যোগ্য করে গড়া।

গোটা মানবজাতির সুদীর্ঘ প্রতীক্ষার পরই সৃষ্টির সর্বশেষ, সর্বাধিক সম্মানিত এবং সব নবী-রাসূলের সর্দার পৃথিবীতে শান্তির বাণী নিয়ে আগমন করেন। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কোনো একটি বিশেষ দল বা সমপ্রদায়ভুক্ত নবী ছিলেন না, তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্বের মানুষের জন্য বিশ্বনবী। কারণ তাঁর পরে দুনিয়াতে আর কোনো নবীর আবির্ভাব হবে না। এ মর্মে রাসূলুল্লাহ (সা.) বাণী প্রদান করেছেন যে, ‘অন্য নবীরা তাদের স্বস্ব সমপ্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন, আর আমি বিশ্বের সমগ্র মানবের জন্য প্রেরিত হয়েছি।’ নবী করীম (সা.) বিদায় হজের ভাষণে ঘোষণা করেন, ‘আমি শেষ নবী আমার পরে আর কোনো নবী নেই।’

রাসূলুল্লাহ (সা.) নবুওয়াত প্রাপ্তির পর সর্বপ্রথম পবিত্র কোরআনের আয়াতের দ্বারা বিশ্বের মানুষকে তাওহীদ তথা আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি আহ্বান জানান, হে মানব জাতি, তোমরা বলো, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তাহলে তোমরা সফলকাম হবে।

তিনি মানবগোষ্ঠীর প্রতি সত্য প্রচারে নিবিষ্ট হন এবং তাদেরকে সরল-সঠিক পথের দিকে পরিচালিত করেন। যাতে তারা জীবনের সফলতা অর্জনে ফলপ্রসূ হতে পারে আর ইহকালীন জীবনে শান্তি ও সৌভাগ্য লাভ করতে সক্ষম হয়।

বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এমন এক সমাজে আবির্ভূত হন যেখানে লোকেরা তাদের মানবিক গুণাবলি ও চারিত্রিক আদর্শ হারিয়ে ফেলেছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের নিজের সুন্দর আচরণ, উত্তম চরিত্র মাধুর্যের দ্বারা মানবিক গুণাবলি ও সামাজিক মূল্যবোধের শিক্ষা দেন এবং আল্লাহর একত্ববাদের স্বীকৃতি ও তার আনুগত্যের মাধ্যমে মানবজীবনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অর্জনের পথনিদের্শনা প্রদান করেন। আত্মভোলা ও পথভ্রষ্ট মানুষকে মানব মর্যাদা, স্রষ্টা ও সৃষ্টির সম্পর্ক, মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য শিক্ষা দেন। জীবন ও মরণের উপলব্ধি সৃষ্টির দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সা.) আরব সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা, সাম্য, মৈত্রী ও সমপ্রীতি প্রতিষ্ঠায় মানব ইতিহাসে অতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

প্রতি বছর পবিত্র ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপনের মাধ্যমে মুসলিম জাতি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা ও জীবনাচরণকে নিজেদের কর্মজীবনে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এবং নিজেদেরকে সুন্দর করে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে নতুন করে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন। এমনিভাবে নবচেতনার দ্বারা উজ্জীবিত হয়ে দ্বীন ইসলামের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণের মাধ্যমে ঈমানের বলিষ্ঠতা আমলের পরিপূর্ণতা অর্জন সার্বিক সৌভাগ্য ও কল্যাণ লাভের পথ সুগম করে। কারণ মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা ও তাঁর সুন্নাতের অনুসরণ মানবজীবনের উৎকর্ষ সাধন ও সাফল্যম-ন্ডত হওয়ার চাবিকাঠি। এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, রাসূলুল্লাহ

(সা.)-এর পবিত্র সিরাত ও তার অমূল্য শিক্ষাবলি আলোচনার মধ্যেই যেন পবিত্র ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী (সা.)-এর প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে এ মহতী উপলক্ষে মহানবী হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালোবাসা নিজের হৃদয়ে সুদৃঢ় করা, তার রেখে যাওয়া বিধি-বিধান ও সু্নাতকে আঁকড়ে ধরার মতো ঈমানী শক্তি সঞ্চয় করা, যাবতীয় কর্মকা-ে তার নীতি, আদর্শ ও শিক্ষা বাস্তবায়ন করা। কেননা, জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অনুগত্য ও অনুসরণ করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা তাঁর আনুগত্য ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছেন। এ মর্মে পবিত্র কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে_

‘আপনি বলুন হে রাসূল, তোমরা আল্লাহর ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো।’

অন্য আয়াতে নির্দেশ করা হয়েছে_

‘ওহে যারা ঈমান এনেছ তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসূলের আনুগত্য করো।’

আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা ও আদর্শ অনুসরণ ছাড়া সম্ভব নয়। কারণ রাসূলুল্লাহ (সা.) যা কিছু বলেছেন অথবা যা নির্দেশ দিয়েছেন, তা ওহি বা প্রত্যাদেশের দ্বারাই করেছেন। পবিত্র কোরআনে এ মর্মে ইরশাদ হয়েছে, তিনি (রাসূল) মনগড়া কিছুই বলেন না, তিনি যা বলেছেন তা প্রত্যাদেশকৃত ঐশীবাণী ছাড়া আর কিছু নয়।

এজন্যই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শাবলি অনুসরণ ও তাঁর শিক্ষা মেনে চলার নির্দেশ প্রদান করেছেন, বলেছেন_

অবশ্যই তোমাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর রাসূলের মধ্যে সুন্দরতম আদর্শ। (সূরা-আল-আহযাব, আয়াত-২১)

রাসূল্লাহ (সা.) উত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন বলে বিরোধী কাফিররাও তাঁকে আল-আমিন তথা বিশ্বাসী উপাধিতে ভূষিত করেছিল এবং তার এই সৎচরিত্রে মুগ্ধ হয়ে দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করেছিল, আল্লাহতায়ালা নবীকুল শিরোমণির উত্তম চরিত্র সম্পর্কে আল-কোরআনে ঘোষণা করেন নিশ্চয়ই আপনি সুমহান চরিত্রের অধিকারী। সূরা আল-কালাম, আয়াত-৪ পবিত্র ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী (সা.) আরেকটি বিশেষ তাৎপর্যময় ও গুরুত্বপূর্ণ যে, এদিনই ৬৩২ খ্রিস্টাব্দের ৭ জুন, ১১ হিজরি ১২ রবিউল আউয়াল মানবজাতির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠতম আদর্শ আখেরি নবী হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর ওফাত দিবস। মহানবী (সা.) পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন কিন্তু রেখে গেছেন হেদায়াতের পথনির্দেশনা। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর ঐতিহাসিক বিদায় হজের ভাষণে বিশাল জনসমুদ্রে পবিত্র কোরআন ও হাদিস অাঁকড়ে ধরার আহ্বান_

আমি তোমাদের জন্য দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যতদিন তোমরা এর অনুশাসন মেনে চলবে, ততদিন তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। এ দুটি জিনিস হলো : আল্লাহর কিতাব, আল-কোরআন এবং তাঁর প্রেরিত রাসূলের চরিত্রাদর্শ আল-হাদিস। (মিশকাত)

বর্তমান সমস্যাসংকুল বিশ্বে যেখানে মানুষ মৌলিক মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যেখানে সন্ত্রাস ব্যাপক আকার ধারণ করেছে, দেশে দেশে হানাহানি ও যুদ্ধ-বিগ্রহ চলছে, নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরছে, যেখানে আন্তধর্মীয় সমপ্রীতি ও সৌহার্দ বিনষ্ট হচ্ছে, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মতপার্থক্য ও আচার-আচরণের বিভিন্নতা সহ্য করা হচ্ছে না, সেখানে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অনুপম আদর্শ ও সার্বজনীন শিক্ষা অনুসরণই বহু প্রত্যাশিত শান্তি ও সমপ্রীতি প্রতিষ্ঠা করতে পারে। পবিত্র ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী (সা.) আমাদের সবার মনে সহনশীলতা, সংযম, হৃদ্যতা, সমপ্রীতি, পারস্পরিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা সৃষ্টিতে সহায়ক হোক, আমিন।

পিএনএস/এএ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech