খুলছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার

  

পিএনএস: বহু প্রতীক্ষার পর আগামী সপ্তাহ থেকেই খুলছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। কর্মী নেওয়ার সকল প্রস্তুতির কথা জানিয়ে বৃহস্পতিবার (১২ জানুয়ারি) বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়।
মালয়েশিয়ার মানব সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি।তিনি বলেন, শ্রমবাজার উন্মুক্তের বিষয়ে মালয়েশিয়া সরকারের একটি চিঠি পেয়েছি। এর মাধ্যমে সেদেশের কাঙ্ক্ষিত শ্রমবাজারের দ্বার উন্মোচন হচ্ছে এবং আশা করছি আগামী সপ্তাহ থেকেই মালয়েশিয়ায় কর্মী যাওয়া শুরু হবে।
তবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সচিব বেগম শামছুন নাহার চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। তিনি বলেছেন, মালয়েশিয়া সরকারের চিঠি পেয়েছি কি পাইনি, কোনো মন্তব্য করতে চাই না এখন। সময় হলে আপনাদের ডেকে বিষয়টি জানাবো।
গত বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি সরকারের পাশাপাশি বেসরকারিভাবে কর্মী পাঠানোর সুযোগ রেখে উভয় দেশের মধ্যে ‘জিটুজি প্লাস’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির পরের দিনই মালয়েশিয়া সরকার বিদেশি কর্মী নেওয়া আপাতত বন্ধ ঘোষণা করে। কয়েক মাস আগে বিদেশি কর্মী না নেওয়ার ঘোষণাটি প্রত্যাহারের পর ‘জিটুজি প্লাস’ চুক্তির আলোকে কর্মী প্রেরণের বিষয়টি আবারও সামনে আসে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারটি উম্মোচিত হলে বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্লান্টেশন, এগ্রিকালচার, ম্যানুফাকচারিং, কনস্ট্রাকশনসহ মোট ৫টি খাতে বিপুল সংখ্যক কর্মী নেওয়ার ঘোষণা রয়েছে মালয়েশিয়া সরকারের। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ২০১৩ সালে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ওপেন হয়। তবে ‘জিটুজি’ বা সরকার হতে সরকার পদ্ধতিতে ৩ বছরে ৮ হাজার কর্মী যায় মাত্র। ‘জিটুজি’ ফ্লপ করায় এবং সমূদ্র পথে মানবপাচারে বিষয়টি আন্তর্জাতিক মাধ্যমে সমালোচিত হওয়ার প্রেক্ষিতে ২০১৫ সালে মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক কর্মী নেওয়ার ঘোষণা দেয়।
অনলাইনে দ্রুত কর্মী যাবে মালয়েশিয়ায়
‘জিটুজি প্লাস’ পদ্ধতিতে সম্পূর্ণ ডিজিটাল বা অনলাইনের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ হবে মালয়েশিয়ায়। কর্মীর বায়োমেট্রিক পরীক্ষার পর অনলাইনে কর্মী ভিসা প্রসেস করে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। বর্তমান ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে একজন কর্মীর নিয়োগে ৩ থেকে ৯ মাস সময় লাগলেও নতুন এ পদ্ধতিতে দুই সপ্তাহের মধ্যেই সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কর্মীও নিয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। নতুন এ পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগের কারিগরি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে সিনারফ্লাক্স ও বেস্টিনেট মালয়েশিয়ার দুটি কোম্পানি। এ দুটি কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন পদ্ধতিতে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে তারা।
প্রতারণা কমবে
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে কর্মী পাঠাতে গড়ে উঠেছে দালাল চক্র। বিদেশ যেতে ইচ্ছুকদের কাছ থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহের পর থেকেই দালাল চক্র দফায় দফায় টাকা নিচ্ছে। কোনো কোনো সময় রিক্রুটিং এজেন্সির কাছেও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন কর্মীরা। মেডিক্যাল আর বহির্গমন ছাড়পত্র পাওয়ার আগেই অনেকের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেয় ওই চক্র। দালালদের প্রতারণার শিকার হয়ে কর্মীরা বিভিন্ন দেশে মানবতার জীবনযাপনের ঘটনা বহু পুরনো। বাংলাদেশের অন্যতম শ্রমবাজার মালয়েশিয়াতেও দালাল চক্রের থাবা রয়েছে। মোটা অংকের টাকা খরচ করে মালয়েশিয়ায় এসে প্রতিশ্রুত চাকরি পাওয়া তো দূরের কথা অনেকের ঠাই হয়েছে বনে-জঙ্গলে। ব্রিজ নিচে ও ফুটপাতে রাত কাটানোর ঘটনাও রয়েছে। এসব প্রতারণার কারণে দেশের অন্যতম এ শ্রমবাজারটি কয়েকবার বন্ধও হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারকে যেমন এর খেসারত দিতে হচ্ছে, তেমনি মালয়েশিয়া সরকারও ওই ঘটনায় বিব্রত রয়েছে।
এ অবস্থায় উভয় দেশের সরকার মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। কোনোভাবেই যাতে দালাল চক্র সুবিধা না করতে পারে সেজন্য ম্যানুয়াল বা পুরনো পদ্ধতি বাদ দিয়ে ডিজিটাল পদ্ধতিতে বায়োমেট্রিকের মাধ্যমে কর্মী বাছাই এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে এবার।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে শতভাগ অনলাইন পদ্ধতিতে কর্মী নেওয়ার সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে উভয় দেশ। ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ‘জিটুজি প্লাস’ চুক্তির আলোকে সম্পূর্ণ অনলাইনে কর্মী নিয়োগ হবে মালয়েশিয়ায়। এজন্য মালয়েশিয়া সরকার সেদেশের ৫ টি প্রতিষ্ঠানকে কর্মী নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অনুমোদন দিয়েছে। বেস্টিনেট, সিনারফ্ল্যাক্স, ইউকেএসবি, এস-ফাইভ, বায়োটেক নামের পাচঁটি প্রতিষ্ঠান তদের কর্মী নেওয়ার সকল কাজ সম্পন্ন করেছে ইতিমধ্যে।
সরেজমিন সিনারফ্লাক্স ও বেস্টিনেট নামে মালয়েশিয়ান দু’টি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মোট ১২ ধাপ অনুসরন করে বাংলাদেশ থেকে অনলাইন পদ্ধতিতে কর্মী নেওয়া হবে।অনলাইন প্রক্রিয়ায় কর্মী নেওয়া শুরু হলে জালিয়াতি আর অনিয়মের কোন সুযোগ থাকছে না। অভিবাসন ব্যয় কমে যাওয়ার পাশপাশি মালয়েশিায় এসে কর্মীরা কাজের নিরাপত্তা, বীমা সুবিধাসহ আইএল্ও সকল সুযোগ সুবিধা পাবে।
মালয়েশিয়া সরকারের প্রতিনিধিরা জানান, অনলাইন প্রক্রিয়ার প্রথমেই মালয়েশিয়ায় কোনো কোম্পানি কিংবা কারখানার মালিক কর্মীর চাহিদাপত্র অনলাইনে তাদের সরকারের কাছে আবেদন করবেন। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিরা কারখানার বাস্তবতা যাচাই করে রিপোর্ট দিবে এবং চাহিদাপত্র ঠিক হলে মালয়েশিয়ান সরকার কর্মী নেওয়ার অনুমোদন দিবে। এরপর মালয়েশিয়ার সরকারই কর্মী নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সিকে মনোনীত করবে। পরে সেই চাহিদাপত্র বাংলাদেশে মালয়েশিয়ান দূতাবাসে যাবে। মনোনীত রিক্রুটিং এজেন্সি কর্মী বাছাই, মেডিক্যালসহ ১২টি ধাপ পেরিয়ে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী নেওয়া হবে।
শুধু বাংলাদেশ নয়-একই পদ্ধতিতে ইতিমধ্যে মালয়েশিয়ার অন্য ১৫টি সোর্স কান্ট্রি থেকেও কর্মী নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে মালয়েশিয়া সরকারের কারিগরি সহায়তাকারী দুই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ থেকে কয়টি প্রতিষ্ঠান কর্মী পাঠাবে সেটা তাদের দেখার বিষয় নয়। সেটা দেখবে উভয় দেশের সরকার। এটা অন্য কারো নির্ধারণ করার সুযোগ নাই। মূলত প্রতারণা এবং জালিয়াতি বন্ধ করা এবং প্রবাসী কর্মীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই উভয় সরকার এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে।
শ্রমবাজার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে কর্মী মালয়েশিয়া আসলে প্রথমে তিন বছরের জন্য ভিসা দেওয়া হবে। পরে এক বছর করে ৫ বছর মালয়েশিয়ায় থাকতে পারবেন তারা। ভিসা নবায়ন ফি মালিক পক্ষ বহন করবে। মালিক পক্ষ চাইলে কর্মীরা সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কোম্পানিতে কাজ করতে পারবে।

পিএনএস/হাফিজুল ইসলাম

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech