দিল্লি কেন ঢাকার সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে চায়?

  

পিএনএস: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে নয়া দিল্লি ‘প্রতিরক্ষা চুক্তির’ বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে। তবে এই প্রস্তাবিত চুক্তির বিষয়টি নিয়ে খুবই গোপনীয়তা রক্ষা করা হচ্ছে। এ নিয়ে ঢাকা-নয়া দিল্লির কূটনৈতিকরাও বিস্তারিত কিছু বলছেন না।

তবে এ চুক্তি নিয়ে দুই দেশের অভ্যন্তরেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। অনেকের প্রশ্ন, ভারত কেন এরকম চুক্তি করতে চায়?

এ বিষয়ে ভারতীয় সাংবাদিক সুবীর ভৌমিকের ব্যাখা- ‘ভারতের একটা মূল্যায়ন হচ্ছে অন্য সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক যেভাবে এগিয়েছে, প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে সেভাবে এগোয়নি। এখানে ভারতের যে সমস্যাগুলো তার একটা হচ্ছে অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষার সমস্যা, আর দ্বিতীয় হচ্ছে চীন।’

তাই ভারত এ চুক্তিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। আর এটা করা হলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আঞ্চলিক ক্ষেত্রে নয়া দিল্লির গুরুত্ব আরো বাড়বে।

এদিকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র বাড়াতে সম্ভাব্য এমন একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর তা নিয়ে জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে। এ নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বেশ কিছুদিন ধরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে জাতীয় রাজনীতি।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকে সামনে রেখে সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়টি আলোচিত হওয়ায় রাজনীতিক ও সুশীল সমাজের অনেকে উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন।

তবে দুই দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এটা বোঝা যাচ্ছে যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টি দিল্লিতে দুই সরকার প্রধানের শীর্ষ বৈঠকে আলোচিত হবে। আর এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারকও সই হতে পারে।

তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন ভারত সফর নিয়ে খুবই সতর্ক অবস্থান নিয়েছে ঢাকা। এ নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে সমালোচনা রয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকেও রয়েছে কড়া নজর। ফলে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে এমন কিছু করতে চাচ্ছে না যা দেশের ভেতরে দীর্ঘমেয়াদী ইস্যু তৈরিতে সহযোগিতা করতে পারে।

যতদূর জানা যাচ্ছে ভারত সফরের প্রত্যাশা-প্রাপ্তির হিসেব মিলাতে পারছে না খোদ সরকার শীর্ষ কূটনৈতিকরাও। তারা অনেকটাই নীরব ভূমিকা পালন করছেন। মিডিয়ার সামনে তারা এখনো কোনো কিছুই পরিষ্কার করতে পারছে না। ফলে এই সফর নিয়ে সরকারের ভেতরে-বাইরে এক ধরনের অস্বস্তিও বিরাজ করছে বলে জানা যাচ্ছে।

বর্তমান ক্ষমতাসীন ভারতকে খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ভাবলেও সফরে কী প্রাপ্তি তা এখনো পরিষ্কার করতে পারেনি ভারত। ফলে এ নিয়ে এখনো ভারতের শীর্ষ কূটনৈতিকদের সঙ্গে বাংলাদেশের ধর কষাকষি চলছে।

কেননা, প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে যাওয়ার আগেই নানা ইস্যু নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধী মহল কঠোর সমালোচনায় সোচ্চার হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও এই সফরের প্রাপ্তির হিসেব কষতে শুরু করেছেন।

পত্রপত্রিকায় ও টেলিভিশন টকশোতে এখন প্রধান আলোচ্য বিষয় এই সফর। এই সফরের সম্ভাব্য দিকগুলো নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। বিশেষ করে দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা ও তিস্তা চুক্তির বিষয়ে খুবই সোচ্চার বিরোধী জোটের নেতারা। আন্তর্জাতিক মহল বিশেষ করে চীন-যুক্তরাষ্ট্রসহ আরো অনেক দেশ নজর রাখছে এদিকে। সবমিলেই এই সফরের সফলতা-ব্যর্থতার উপর নির্ভর করছে দেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ। এই সফরের ফলাফল যাই হোক বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গন যে কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে উঠতে যাচ্ছে তার আভাস আগে থেকে পাওয়া যাচ্ছে।

ফলে এই সফরকে সরকার পক্ষ থেকেও খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরের আগেই দিল্লিতে গিয়ে ভারতের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন তার কেবিনেটের সিনিয়র দুই মন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। আর এই সুযোগে দিল্লিও হোমওয়ার্ক শুরু করে দিয়েছে।

জানা যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই সফরে ৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাথে তার বৈঠক, ৯ এপ্রিল তিনি আজমীর শরীফ যাবেন এবং ১০ এপ্রিল তিনি দেশে ফিরবেন। গত ১৪ মার্চ সোমবার ঢাকা ও দিল্লীর উভয় দেশ থেকে একযোগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সরকারী ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

তবে প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় কী রয়েছে, সেটি নিয়ে ভারতীয় সাংবাদিক ও বিশ্লেষক সুবীর ভৌমিক বলেন, ‘সামরিক ক্ষেত্রে আরো বাড়তি যোগাযোগ, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি - এসব ব্যাপারে দু’দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপন করা সেটা একটা ব্যাপার। দু’নম্বর হচ্ছে, ভারত চাইছে যে ভারতের কাছ থেকে বেশি পরিমাণে বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র কেনা হোক।’

‘বর্তমানে বাংলাদেশে বেশিরভাগ অস্ত্র চীন থেকে কেনে- ভারত সেই জায়গাতে ঢুকতে চাইছে। আর তিন নম্বর যেটা সেটা হচ্ছে, কিছু কিছু সন্ত্রাসবাদী তৎপরতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে যৌথ অভিযান বা সম্মিলিত অভিযান চালানো- সেরকম একটা সুযোগ তৈরি করার একটা ব্যাপার এ চুক্তির মধ্যে ভারত রাখতে চাইছে’, বলছিলেন ভৌমিক।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে উল্লেখ আছে চুক্তির মেয়াদ হবে ২৫ বছর, আর এর আওতায় বাংলাদেশকে ৫০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়ারও প্রস্তাব আছে ভারতের।

খবরে আরো বলা হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদী ওই চুক্তি করতে ভারত বিশেষভাবে আগ্রহী। কিন্তু প্রশ্ন হলো ভারত কেন ভারত এরকম চুক্তি করতে চায়?

সুবীর ভৌমিক বলেন, ‘ভারতের একটা মূল্যায়ন হচ্ছে অন্য সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক যেভাবে এগিয়েছে, প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে সেভাবে এগোয়নি। এখানে ভারতের যে সমস্যাগুলো তার একটা হচ্ছে অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষার সমস্যা,আর দ্বিতীয় হচ্ছে চীন।’

‘এটা মাথায় রেখেই এ ধরনের একটা ডিফেন্স কো-অপারেশন প্যাক্ট ভারত করতে চাইছে, বিশেষ করে নর্থ-ইস্টার্ন রিজিয়নে তার কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার জন্য।’

সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের দায়িত্বশীল কেউই বিস্তারিত কিছু বলছেন না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দিল্লির একটি কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ‘সফরে কী নিয়ে চুক্তি হবে বা হবে না, সেটি এত আগে বলা সম্ভব নয়, কারণ তা পুরোপুরি নির্ভর করছে দুই সরকার-প্রধানের মধ্যে আলোচনার গতিপ্রকৃতির ওপর।’

ওই সূত্রটি আরো যোগ করেছেন, ‘তবে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার সমস্ত দিক নিয়ে আলোচনা হবে এটাই স্বাভাবিক, আর তাতে অর্থনীতি-অবকাঠামো উন্নয়ন, কানেক্টিভিটির পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টিও থাকতে পারে। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে কি না, সেটা বলার মতো পরিস্থিতি এখনো হয়নি।’

আর প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়টি নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মোঃ শহীদুল হকও কোনো মন্তব্য করেননি।

তবে তিনি বলেন, ‘এটা যখন ভিজিট হবে, তখনই আপনারা জানবেন যে কী কী চুক্তি হলো। এ চুক্তিগুলো যেহেতু আলোচনার মধ্যে আছে - এমওইউগুলো - সেজন্য এখন এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করাটা যথাযথ হবে না বলেই আমি মনে করি।’

প্রতিরক্ষার বিষয়টি আলোচনার মধ্যে আছে কি-না এবিষয়ে তিনি বলেন, ‘সব কিছুই আলোচনার মধ্যে আছে। প্রতিরক্ষা সবসময়ই আলোচনার মধ্যে ছিল।’

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে কতগুলো বিষয়ে চুক্তি হতে পারে এ বিষয়ে শহীদুল হক বলেন, ‘দু’দেশের মধ্যে বিভিন্ন জিনিস নিয়ে আলাপ আলোচনা হচ্ছে, আর সেগুলো সবগুলোই অলমোস্ট এমওইউ (সমঝোতা স্মারক)। দুদেশের মধ্যে সম্পর্কের পরিধি এত বেশি যে মোটামুটি সব জিনিস নিয়েই আলোচনা হবে। বেশ কিছু সংখ্যক এমওইউ হবে। চুক্তি না।’


ভূরাজনৈতিক অবস্থান থেকে ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ নির্ধারণ করে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে বাংলাদেশ সরকার।

রাশিয়া-চীন-যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা সমরাস্ত্র এবং উন্নত সামরিক সরঞ্জাম নিয়মিত যুক্ত হচ্ছে সামরিক বাহিনীতে। সম্প্রতি চীন থেকে কেনা দুটি সাবমেরিনও যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে।

সামরিক বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা থাকায় সার্বিক বিচারে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত যে কোনো চুক্তি বা সমঝোতা বাংলাদেশের জন্য খুবই স্পর্শকাতর বলে মনে করেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জামিল ডি. আহসান।

তার কথায়, ‘প্রতিটা দেশেরই সামরিক নীতি থাকে, এবং এগুলো নিজস্ব বিষয় এবং গোপনীয় বিষয়। তাই প্রতিরক্ষা বিষয়টি বা প্রতিরক্ষা চুক্তি যেমন স্পর্শকাতর, তেমনি ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্কটাও কিন্তু স্পর্শকাতর।’

এদিকে বাংলাদেশের প্রধান রাজনীতিক দলগুলোকে ইদানিং ভারতের সাথে সম্পর্ক ইস্যুতে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিতেও দেখা যাচ্ছে। জেনারেল আহসান মনে করেন এ নিয়ে রাজনীতিক উত্তপ্ত পরিস্থিতিও সৃষ্টি হতে পারে।

‘রাজনীতি তো আমাদের জানেনই যে, তারা চেয়ে থাকে কোন ইস্যুতে রাজনীতি করা যায়। জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা যায় বা গরম করা যায় রাজনীতির আসর ’ মন্তব্য সাবেক সেনা কর্মকর্তা জামিল আহসানের।

ভারতের সাথে বিভিন্ন চুক্তির বিষয়ে বিএনপি নেতাদের বক্তব্যের জবাবে সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, ভারতের সাথে কি চুক্তি হবে সেটার এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বিএনপি আন্দোলনের কোনো ইস্যু না পেয়ে ভারতের সাথে চুক্তি নিয়ে না জেনেই মন্তব্য শুরু করেছে।

এলজিআরডিমন্ত্রী বলেন, জনগণ ও দেশের স্বার্থে অনেক দেশের সাথেই সমঝোতা চুক্তি সই করতে হয়, ভারতের সাথে কোনো চুক্তি সই করলেই যে দেশ ভারত হয়ে যাবে তা কিন্তু নয়। সরকার যদি কোনো চুক্তি করে সেটা জনগণের স্বার্থেই করবে।

কয়েক দফা স্থগিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশেষে এপ্রিলে ভারত সফর করতে সম্মত হয়েছেন। এই সফরটি নিয়ে অনেক দিন ধরেই নানা জল্পনা ভাসছে। তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি, গঙ্গা ব্যারেজ এগুলোই খুব বেশি আলোচনায় এসেছে। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে, এগুলো স্রেফ হিমবাহের শৃঙ্গ। পানির নিচে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অংশটি আড়ালেই থেকে গিয়েছিল। আর সেটা হলো বাংলাদেশকে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির দিকে নিয়ে যেতে চাইছে ভারত।

গত ডিসেম্বরে ঢাকা সফরের সময়ই ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিক্কর বাংলাদেশের সাথে বৃহত্তর প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আইডিয়াটি প্রকাশ করেছিলেন। এরপর গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ভারতের পররাষ্ট্রসচিব এস. জয়শঙ্করের সফরের সময় এ নিয়ে আরো আলোচনা হয়। জয়শঙ্কর অবশ্য বলেছিলেন, বৈঠকটিতে ‘কানেকটিভিটি ও উন্নয়ন উদ্যোগের’ প্রতি নজর দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে আসল কারণটি হতে পারে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার বিষয়টি।

বাংলাদেশের এক শীর্ষ কূটনীতিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে বলেছিলেন, ’ভারত চায় দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপকভিত্তিক প্রতিরক্ষা চুক্তি। আমরা চাই আরো ধীরে ধীরে ধাপে ধারে গ্রহণ করা পদক্ষেপ। সমঝোতা স্মারক হবে শুরুর জন্য ভালো বিষয়’। ওই কূটনীতিক বলেন, ‘ভারতের সাথে আমরা বৃহত্তর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চাই। আমাদের দুই দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর মধ্যকার সম্পর্ক উন্নত হচ্ছে, আমরা একসাথে সন্ত্রাসবাদের হুমকি মোকাবিলা করছি। তবে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সময় এখনো আসেনি।’ ভারতের প্রস্তাবিত চুক্তিতে দুই সামরিক বাহিনীর মধ্যে সরাসরি সহযোগিতা এবং ভারত থেকে বাংলাদেশে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি ও সরবরাহ এবং পারস্পরিক ধারণায় থাকা হুমকির বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযানের কথা বলা হয়েছে।

দ্য হিন্দুস্তান টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত চাচ্ছে বাংলাদেশের কাছে ৫০ কোটি ডলারের ঋনে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করতে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট-ও একই তথ্য প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, সামরিক সরঞ্জাম কেনার জন্য ভারত ৫০ কোটি ডলার ঋণ দিতে চাইছে বাংলাদেশকে। বাংলাদেশ হয়তো এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানাবে; তবে তা হবে ভিন্নভাবে অর্থাৎ উপকূল রক্ষা বাহিনীর জন্য টহল বিমান এবং বিমান প্রতিরক্ষার জন্য রাডার কেনার কাজে ব্যবহার করবে।

ভারতীয় মিডিয়ার উদ্ধৃতি দিয়ে ফার্স্টপোস্টের খবরে বলা হয়, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতাই ভারতকে ঢাকার সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করতে উৎসাহিত করছে। উল্লেখ্য, ২০০৯ সাল থেকে চীনই বাংলাদেশের বৃহত্তর অস্ত্র সরবরাহকারী। এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে আসা অস্ত্রের ৮০ ভাগই সরবরাহ করেছে চীন।

এই ২০১৬ সালের নভেম্বরেও চীনের কাছ থেকে ঢাকা দুটি সাবমেরিন কিনেছে। এই ঘটনায় নয়া-দিল্লির অনেকের চোখ কপালে ঠেকেছে। তখন থেকেই ভারত একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির মধ্যে নিয়ে আসতে চাইছে বাংলাদেশকে।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের অনেক কর্মকর্তাই ভারতীয় সামরিক সরঞ্জাম কিনকে আগ্রহী নয়। কারণ ভারত নিজেই অন্যান্য দেশের কাছ থেকে অস্ত্র আমদানি করে থাকে। তারা নেপাল ও মিয়ানমারে সরবরাহ করা ভারতীয় অস্ত্রের নিম্নমানের কথাও উল্লেখ করেন।

শেখ হাসিনা চীন ও ভারতের সাথে তার দেশের সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা অব্যাহত রাখতে চাইছেন। গত নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের ঢাকা সফরের সময় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে চীন ও বাংলাদেশ ২৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি সই করে।

চীনের ‘মুক্তার মালা’ কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাংলাদেশ। ভারত মহাসাগরে প্রাধান্য বিস্তারের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দেশে সামরিক স্থাপনার কৌশলগত স্থাপন হলো- এই কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য।

অবশ্য ২০১৫ সালে শেখ হাসিনার সাথে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দ্বিপক্ষীয় আলোচনার সময় ভারতকে বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ায় তা ভারতের ভূ-রাজনৈতিক বিশ্বাস বেড়েছে। আবার চীনকে হতাশ করে হাসিনা সরকার চারটি প্রকল্পের অন্যতম সোনাদিয়া বন্দর পরিকল্পনাও বাতিল করে দেয়। টাইমস অব ইন্ডিয়ার ইন্দ্রানি বাগচির মতে, সিদ্ধান্ত ছিল কৌশলগত এবং ভারতকে বিবেচনায় রেখেই তা করা হয়েছিল।

দিল্লিতে শেখ হাসিনার সফর দুবার পিছিয়েছে, একবার ডিসেম্বরে, আরেকবার ফেব্রুয়ারিতে । দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কারণ হিসেবে উভয় প্রধানমন্ত্রীর পূর্ব-নির্ধারিত কর্মসূচির কথা উল্লেখ করলেও পানিবণ্টন চুক্তিসহ বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে অচলাবস্থাই সফর স্থগিত হওয়ার মূল কারণ বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।


পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন