দুর্ভোগের শুরু মেট্রোরেলের শেষ কবে

  



পিএনএস ডেস্ক: গত বছরের ২৬শে জুন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভলপমেন্ট (ডিএমআরটিডি) বা মেট্রোরেলের কর্মযজ্ঞ। নির্দেশনা ছিল প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ ইউটিলিটি স্থানান্তর ও স্থাপনকালে গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে হবে। কিন্তু নির্দেশনা মতো এসব কাজ না হওয়ায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। আগারগাঁও তালতলা থেকে মিরপুর ১২ নম্বর পর্যন্ত সড়কে ভোগান্তির শেষ নেই। মূল সড়ক কেটেছিঁড়ে ইউটিলিটি স্থানান্তর করা হয়েছে কয়েক মাস আগে। কিন্তু বিটুমিন দিয়ে ঢালাই দেয়া হয়নি। তাই সড়কের কোথাও গর্ত, কোথাও এবড়োথেবড়ো, কোথাও আবার মাটির স্তূপ। কাটাছেঁড়া রাস্তার বেহাল দশার কারণে একটি বাসই চলাচল করা কষ্টসাধ্য। খোঁড়াখুঁড়ির ফলে সড়কের মাত্র ৫০ শতাংশ যানচলাচলে ব্যবহার করা যাচ্ছে। এমনই ভোগান্তি নিয়ে প্রতিদিন চলাচল করতে হচ্ছে যাত্রীদের। যানবাহন চলাচলের জন্য ধুলাবালিতে, একাকার গোটা এলাকা।

২০১৩ সালের ৩১শে অক্টোবর প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ২০১৪ সালের ১১ই জনু সার্ভে কাজ উদ্বোধন করা হয়। নির্মাণের মূল কাজ শুরু হয়েছে ২০১৬ সালের ২৬শে জনু। প্রকল্প কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ সময়ে কাজ শেষ হয়েছে আনুমানিক ৪০ শতাংশ। ২০১৯ সালের বাকি সময়ের মধ্যে নির্ধারিত কাজ শেষ করা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। এদিকে কয়েকদিন ধরে এ প্রকল্পের পরিচালককেও বদলি করে পাঠানো হয়েছে রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ে। এখন প্রকল্প চলছে পরিচালকহীন। যোগাযোগ করা হলে মেট্রোরেলের সাবেক প্রকল্প পরিচালক মোফাজ্জল হোসেন বলেন, বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদের কর্মকর্তার মৃত্যু এবং প্রকল্প পরিচালক না থাকায় কাজের গতি অনেকটা মন্থর হয়ে পড়েছে। এখন প্রকল্পের কোনো পরিচালক না থাকলেও দ্রুত সময়ের মধ্যেই নতুন পিডি নিয়োগ করা হবে। কাজের কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে আবার নতুন করে কাজ শুরু করা গেলে নির্ধারিত সময়ে আশার আলো দেখা যেতে পারে। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে মেট্রোরেল প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০১২ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত। তবে এই টার্গেটকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে ২০১৯ সালে প্রকল্পের আংশিক কাজ এবং ২০২১ সালের মধ্যে বাকি সব কাজ শেষ করার পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু হঠাৎ করেই কর্মযজ্ঞে ভাটা পড়েছে। মেট্রোরোল নির্মাণ হচ্ছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ও সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনে। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নির্মাণকালে ভোগান্তি থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে সংশ্লিষ্ট সড়ক প্রশস্ত করাসহ নির্মাণকালে দক্ষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মিরপুর ডিওএইচএস গেট থেকে মিরপুর-১২ নম্বর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত মহাসড়ক প্রশস্ত ও উন্নয়ন করা হবে। যাতে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় এই সড়কে কোনো জটলা তৈরি না হয়। কারণ, সড়কটি অনেক সরু। ভূমি অধিগ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বোঝাপাড়া হয়ে গেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যেই শুরু হবে সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ।

তবে মেট্রোরেলের গণসংযোগ কর্মকর্তা খান মো. মিজানুল ইসলাম বলেন, নির্মাণ কাজ চলাকালে রাস্তা প্রশস্ত করার কথা আমার জানা নেই। মানুষ চলাচলের জায়গা আমরা কাটছি না। কোথাও রাস্তার মাঝ বরাবর কোথাও রাস্তার পাশ দিয়ে রাস্তা কেটে কাজ করা হচ্ছে। এবং জনদুর্ভোগের কথা মাথায় রেখে কয়েকটা অংশে ভাগ করে আমরা কাজ করছি। এতে এক এলাকার কাজ শেষ হলে আরেক এলাকার কাজ শুরু করা হবে। এখন মিরপুর এলাকায় কাজ চলছে। দুর্ভোগের বিষয়ে তেমন কিছু চোখে পাড়ছে না। মানুষ এটাকে মেনে নিয়েছে। আমরা আশঙ্কা করছি ফার্মগেট থেকে মতিঝিল পর্যন্ত কাজ করা নিয়ে। কারণ, এই এলাকার রাস্তা বেশি চওড়া না কিন্তু গাড়ি চলে বেশি। এখানে কাজ চলাকালে বিকল্প রাস্তা ব্যবহারের জন্য ট্রাফিক পুলিশের সহযোগিতায় রুট নির্ধারণ করা হচ্ছে।

মেট্রোরেলের প্রকল্প অফিসের কর্মকর্তারা জানান, পুরো প্রকল্পকে ৮টি প্যাকেজে ভাগ করে কাজ করা হচ্ছে। প্রথম প্যাকেজ মেট্রোরেলের ডিপোর জমি উন্নয়নের কাজ, যা এখন বাস্তবায়ন পর্যায়ে আছে। দ্বিতীয় প্যাকেজটি হলো ডিপোর অবকাঠামো নির্মাণের কাজ। উত্তরা ডিপো থেকে শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার লম্বা মেট্রোরেল লাইনে স্টেশন থাকবে ১৬টি। এলাকা ভাগ করে ৪টি প্যাকেজের আওতায় এসব নির্মাণ কাজ সম্পাদন করা হবে। ৩ ও ৪নং প্যাকেজ হলো উত্তরা নর্থ-আগারগাঁও পর্যন্ত ভায়াডাক্ট ও স্টেশন নির্মাণ। উত্তরা ডিপো থেকে পল্লবী পর্যন্ত ৩নং প্যাকেজ। পল্লবী থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ৪নং প্যাকেজ। আগারগাঁও থেকে কারওয়ানবাজার ৫নং প্যাকেজ, কারওয়ানবাজার থেকে মতিঝিল বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত ৬নং প্যাকেজ। ৭নং প্যাকেজ হলো বিদ্যুতের কাজ। ৮নং প্যাকেজের আওতায় সম্পন্ন করা হবে ট্রেন কেনার কাজ। এসব প্যাকেজের কাজের মধ্যে ১নং প্যাকেজের ডিপোর মাটি উন্নয়নের কাজ মাঝামাঝি পর্যায়ে আছে। দুই, তিন, চার এবং ৮নং প্যাকেজের কাজের ইভাল্যুয়েশনের শেষ পর্যায়ে। ৭নং প্যাকেজের কাজ ইভাল্যুয়েশনের মাঝামাঝি পর্যায়ে আছে। ৫নং প্যাকেজ (আগারগাঁও থেকে কারওয়ানবাজার), ৬নং প্যাকেজ (কারওয়ানবাজার থেকে মতিঝিল বাংলাদেশ ব্যাংক) এই প্যাকেজ দুটি প্রি-কোয়ালিফিকেশন টেন্ডার প্রক্রিয়ায় আছে। মেট্রোরেল লাইন-৬-এর প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ২০১৪ সাল পর্যন্ত ধরা হলেও ২০১৯ সালে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু করার টার্গেট নিয়ে কাজ চলছে।

উল্লেখ্য, জাইকার সুপারিশের আলোকে ২০১২ সালে এমআরটি লাইন-৬ বাস্তবায়নের অনুমোদন দেয় সরকার। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ২০১৩ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি জাইকার সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। মেট্রোরেল প্রকল্পের বেসিক ডিজাইন সম্পন্ন হয় ২০১৪ সালে। এরপর ২০১৫ সালের ২৬শে জানুয়ারি জাতীয় সংসদে ‘মেট্রোরেল বিল ২০১৫’ পাস হয়। ২০১৬ সালের ২৬শে জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মেট্রোরেল লাইন-৬ প্রকল্পের কাজ উদ্বোধন করেন।

জাইকার অর্থায়নে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য এই মেট্রোরেল লাইনের দৈর্ঘ্য হবে ২০ কিলোমিটার। স্টেশন থাকবে ১৬টি। স্টেশনগুলো হলো উত্তরা উত্তর, উত্তরা সেন্টার, দক্ষিণ পল্লবী, মিরপুর-১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কারওয়ানবাজার, শাহবাগ, টিএসসি, প্রেস ক্লাব ও মতিঝিল। সম্পূর্ণ এলিভেটেড মেট্রোরেলের এই রুটে প্রতি ঘণ্টায় উভয়দিকে ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা থাকবে। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত যাতায়াত করা যাবে ৩৭ মিনিটে। মেট্রোরেল লাইন-৬ পুরোটাই হবে উড়ালপথে। ট্রেন থাকবে ২৪টি, প্রত্যেক সেটে ৬টি করে কোচ থাকবে।

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech