রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানের পথ আগলে আছে যেসব বাধা

  


পিএনএস ডেস্ক: বাংলাদেশের সাথে সমঝোতা করার জন্য জাতিসংঘ, পাশ্চাত্য এবং সেইসাথে চীনের কাছ থেকে চাপ সৃষ্টির ফলে মায়ানমারের অং সান সুচির নেতৃত্বাধীন সামরিক-সমর্থিত সরকার বাংলাদেশের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে আলোচনার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল।

এই আলোচনার ফলে ১০ দফার একটি সমঝোতার পথ সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে ২৫ আগস্টের সর্বশেষ দফার সহিংসতার পর বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ছয় লাখের বেশি রোহিঙ্গার প্রত্যাবর্তনের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

কিন্তু চুক্তি সইয়ের কালি শুকাতে না শুকাতেই মায়ানমার তা থেকে সরে গিয়ে প্রত্যাবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদটি বাদ দিয়ে একটি সন্দেহজনক ‘যৌথ বিবৃতি’ ইস্যু করে। স্টেট কাউন্সিলর অং সান সুচির মুখপাত্র জাও হতে বলেন, মায়ানমারে বাস করার সরকারি প্রমাণপত্র আছে, এমন উদ্বাস্তুদেরই কেবল মায়ানমার গ্রহণ করতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, এই শর্ত ১৯৯২ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের সাথে সই হওয়া চুক্তি সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশ ১৯৯২ সালের চুক্তিতে ফিরে যেতে রাজি নয়।

বাংলাদেশের ১৯৯২ সালে ফিরে না যাওয়ার পেছনে ভালো যুক্তি রয়েছে। চুক্তিটি ব্যাপকভিত্তিক নয়। প্রয়োজনীয় সরকারি নথিপত্র না থাকায় ওই সময় দুই লাখ উদ্বাস্তেুর মধ্যে দুই হাজারেরও কম ফিরতে পেরেছিল। বেশির ভাগ উদ্বাস্তেুর কাছে মায়ানমারে বসবাস করার মতো কোনো নথিপত্র নেই। একদিকে মায়ানমার তাদেরকে কোনো নথি দেয়নি, কিংবা দাঙ্গার সময় পালাতে গিয়ে তারা নথিপত্র হারিয়ে ফেলেছিল। বাংলাদেশ এসব উদ্বাস্তুকে ঠেলে বের করে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু সেটাও পারেনি।

বাংলাদেশের ১৯৯২ সালের চুক্তি গ্রহণ করতে অনীহা প্রদর্শনের ব্যাপারে মায়ানমারের নিজস্ব যুক্তিও রয়েছে। সুচির মুখপাত্র জাও হতের মতে, রোহিঙ্গাদের জন্য বিশাল বিশাল উদ্বাস্তু ক্যাম্প বানিয়ে বেশি বেশি আন্তর্জাতিক সহায়তা লাভের জন্য বাংলাদেশ চায় উদ্বাস্তুরা যাতে থেকে যায়। মায়ানমারের ওই মুখপাত্রের মতে, বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই ৪০০ মিলিয়ন ডলার পেয়েছে এবং অব্যাহত উদ্বাস্তু উপস্থিতির উল্লেখ করে তারা আরো অর্থ চাচ্ছে।

কিন্তু বাংলাদেশের সূত্রগুলো এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, সরকারি আবাসন নথির শর্তের ওপর জোর দিলে ১৯৯২ সালের প্রত্যাবাসন চুক্তিটি বাস্তবায়ন হবে না। বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের জন্য স্থায়ী বসতি স্থাপনে তীব্র বিরোধী ঢাকা।

উদ্বাস্তুদের জন্য স্থায়ী আবাসন নির্মাণে জাতিসংঘ উদ্বাস্তুবিষয়ক হাই কমিশনারের চেষ্টাও প্রতিরোধ করছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ-মায়ানমারের সীমান্তবর্তী কক্সবাজারে বিদ্যমান ক্যাম্পগুলোর ঘিঞ্জি অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে আরো বেশি ক্যাম্প নির্মাণের বিদেশী বিশেষজ্ঞদের পরামর্শও অগ্রাহ্য করেছে বাংলাদেশ।

স্থানীয় কর্মকর্তারা রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের বিয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। তাদের মতে, এমনটা করা হলে তাদের স্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থার পথ খুলে যেতে পারে।

বাংলাদেশের সাথে সম্পাদিত ১০ দফা চুক্তি থেকে মায়ানমার সরে আসার পর মায়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে যাওয়ার প্রয়াস বাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ।

দুই পক্ষকে আলোচনায় সম্মত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে চীন। তবে তারাও দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে চীন এখনো আশা করছে, ‘জাতীয় সার্বভৌমত্বের’ ধারণা প্রয়োগ করে পাশ্চাত্য-নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক চাপ প্রতিরোধ করতে পারবে মায়ানমার।

আন্তর্জাতিক চাপ প্রতিরোধের জন্য মায়ানমার সার্বভৌমত্বের ধারণাটি ব্যবহার করবে- এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। মায়ানমার বলছে, তারা এখনো দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চায়। তারা বলছে, বাংলাদেশের সাথে এখনো আলোচনা চলছে। আলোচনার জন্য ১৬-১৭ নভেম্বর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী মায়ানমার যাবেন।

মায়ানমারের আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের যে বিরোধী তা ফুটে ওঠেছে রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের যৌথ বিবৃতির ব্যাপারে তার প্রতিক্রিয়ায়। সুচির অফিস জানিয়েছে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতি মায়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় আলোচনা বাধাগ্রস্ত করবে।

বিবৃতিতে সার্বভৌম দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতির জন্য চীন ও রাশিয়ার প্রশংসা করা হয়। বাংলাদেশের আবেদনে সাড়া দিয়ে জাতিসংঘ ও পাশ্চাত্য মায়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। তবে তারা এমন কিছু করবে না যাতে সুচির সাথে তাদের সম্পর্কে অবনতি ঘটে।

তাছাড়া তারা চীনকেও ঘাঁটাবে না। কারণ উত্তর কোরিয়ার হুমকি দমনে তাদের প্রয়োজন চীনা সহায়তা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরকালে শি জিনপিংয়ের সাথে তার আলোচনায় ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, চীনের সাথে মোলায়েম আচরণ করবে যুক্তরাষ্ট্র।

আবার বাংলাদেশের প্রধান বিনিয়োগকারী এবং সামরিক সরঞ্জামের একটি বড় অংশ সরবরাহকারী চীন হওয়ায় এবং বৃহৎ প্রতিবেশী ভারত থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় চীন হওয়ায় এই দেশটির সমর্থন হারানোর ভয়ে একটি নির্দিষ্ট অবস্থার বাইরে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ কামনা করবে না বাংলাদেশ। সমস্যাটির আন্তর্জাকিকরণ হয়ে গেলে জাতিসংঘ উদ্বাস্তু সংস্থার স্থায়ী বসতি স্থাপন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে বাধ্য হওয়ার ভয়ও আছে।

পাশ্চাত্যের মধ্যেও দ্বিধা রয়েছে। চীন ও রাশিয়ার ভেটোর শঙ্কায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কঠোর প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারেনি। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর মায়ানমারের ঘটনাবলীকে ‘জাতি নির্মূল’ হিসেবে অভিহিত করতে অনীহা প্রদর্শন করেছে। কংগ্রেস মায়ানমারে বিরুদ্ধে সামরিক অবরোধ আরোপ করতে চায় কিনা সে অপেক্ষায় আছে পররাষ্ট্র দপ্তর।

অবশ্য এশিয়া ইউরোপ মিটিং (আসেম)-এ এশিয়া ও ইউরোপের ৫৩টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ২০ ও ২১ নভেম্বর মায়ানমারে সমবেত হবেন। তারা মায়ানমার নেতাদের সাথে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আলোচনা করবেন। এই সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, জাপান, ভারত, মায়ানমার ও বাংলাদেশ।

১৮ নভেম্বরের দিকে অনুষ্ঠেয় শীর্ষ সম্মেনের আগে সুইডেন, জার্মানি, জাপান ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে আলোচনার জন্য ঢাকা আসবেন। তারা কক্সবাজারের উদ্বাস্তু শিবিরও পরিদর্শন করবেন।

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech