‘ওদের বিচার চেয়ে লাভ নাই, কোনো শাস্তি হয় না’

  

পিএনএস ডেস্ক: ‘ওদের কোনো শাস্তি হয় না। তাই শাস্তি চেয়েও কোনো লাভ নাই। কোনো কিছু হয় না ওদের। ওদের যদি কিছু হত, তাহলে একটা অ্যাকসিডেন্টের আগে ওরা দশবার চিন্তা করত। ওদের বিচার চেয়ে কোনো লাভ নাই।’

দুর্ঘটনার জন্য চালকদের শাস্তি না হওয়ায় এ ধরনের ঘটনা বার বার ঘটছে মন্তব্য করে এ কথা বলেন বাসের চাপায় পা হারানো রোজিনা আক্তার।

কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘এখন আমি কী করব? আমি তো আগের জায়গায় ফিরে আর আসতে পারব না। আমি তো আর আমার পাটা ফিরে পাব না।’

রাজীবের প্রসঙ্গ টেনে রোজিনা বলেন, ‘পত্রিকায় দেখছি, রাজীব ছেলেটা অ্যাকসিডেন্ট করছে। কিন্তু কোনো বিচার কি হইছে?’

শুক্রবার রাতে রাজধানীর বনানীতে ওই দুর্ঘটনার পর রোজিনার ডান পা উরু থেকে কেটে ফেলা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন এখনও তিনি পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত নন।

দুর্ঘটনার দিন বিকেলে রোজিনা বনানী এলাকায় এক বান্ধবীর বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। রাত ৯টার দিকে সেখান থেকে নিকেতনের বাসায় ফেরার সময় মতিঝিল থেকে গাজীপুরগামী বিআরটিসি পরিবহনের বেপরোয়া গতির একটি ডাবল ডেকার তাকে চাপা দেয়। সামনের চাকায় পিষ্ট হয়ে যায় তার ডান পা। হাঁটুর উপর থেকে নিচের অংশ চামড়ায় ঝুলছিল কোনো রকমে।

রোজিনা বলেন, ‘দুইবার আমার উপর দিয়ে চাকা চলে গেছে। আমি শুধু বলছিলাম, আমাকে একটু হসপিটালে নিয়ে যান। অনেক মানুষকে বলছি আমাকে একটু হসপিটালে নিয়ে যেতে। অনেক মানুষকে বলছি। সেখানে সার্জেন্টও ছিল। কিন্তু কেউ ধরে নাই।’

ময়মনসিংহের মেয়ে রোজিনা। ছয় বোনের মধ্যে দ্বিতীয় সে। ঢাকায় সাংবাদিক ইশতিয়াক রেজার বাসায় ১০ বছর ধরে কাজ করেন। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) সে এখন চিকিৎসাধীন।

রোজিনা বলেন, ‘কয়েকজন রাস্তা পার হচ্ছিল, আমি রাস্তা পার হওয়ার জন্য ফুটপাত থেকে নেমে মাত্র দুই পা দিয়েছি, এমন সময় একটা গাড়ি আমার সামনে আসে। আমি ইশারা দেয়ার পর গাড়িটা থামে। কিন্তু আমি যেই সামনে গেছি, গাড়িটা বাড়ি দেয়। আমি তখন সামনের পড়ে যাই। এরপরও বাসটা থামায় নাই। এত বড় একটা বাস আমার পায়ের উপর দিয়ে চলে যায়। আমি যখন পড়ে গেছি, তখন বাসটা থামালে আমার পাটা বাঁচানো যেত।’

রোজিনা বলেন, পরে একজন লোক এসে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালের দিকে নিয়ে যেতে চায়, যখন সেন্স আসে, তখন দেখি আমাকে তিন-চারজন সিএনজি করে নিয়ে যাচ্ছে।

বেডের পাশে মেঝেতে বিছানা পেতে শুয়ে আছেন রোজিনার বাবা রসুল মিয়া। মেয়ের এই মর্মান্তিক অবস্থা দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারছেন না। কান্না জড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘রাতেই খবর পাওয়ার পরই গ্রামের বাড়ি থেকে ছুটে আসি হাসপাতালে। রাতেই মেয়েটা বলেছিল- আব্বা, আমার পা নাই। পঙ্গু হয়ে গেলাম! রাস্তা পার হওয়ার সময় দোতলা একটি বাস আমাকে চাপা দেয়।’

মেয়ের চিকিৎসার খরচ নিয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘খরচ দিলে তো অনেকেই দিতে পারে। কিন্তু ওর জীবনটা কেমনে চলব? এখন তো আর কিছু করতে পারবে না। আমরা গরিব মানুষ। কীভাবে কী হবে। আমার মেয়েটার কী হবে। মেয়ে পঙ্গু হয়ে গেল!’

কাকুতি মেশানো রসুল মিয়ার সেসব প্রশ্নের কোনো উত্তরই কেউ দিতে পারে না। শুধু হাসপাতালের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে তার নিজের কাছেই ফিরে আসে।

রোজিনার গৃহকর্তা জিটিভির এডিটর ইন চিফ সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, 'প্রায় আট বছর ধরে রোজিনা আমার বাসায় কাজ করে। সে আমাদের পরিবারের একজন সদস্য। সামর্থ্য অনুযায়ী রোজিনার দায়িত্ব পালন করব আমি। সে আমাদের কাছেই থাকবে।’

রোজিনার পা হারানোর ঘটনায় বনানী থানায় চালক শফিকুল ইসলামকে আসামি করে মামলা হয়েছে। ঘটনার পরপরই বাস জব্দ ও চালক শফিকুলকে আটক করা হয়েছে।

পিএনএস/আলআমীন

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech