বাঁচাও ‘বগুড়ার প্রাণ’ করতোয়া নদী - জাতীয় - Premier News Syndicate Limited (PNS)

বাঁচাও ‘বগুড়ার প্রাণ’ করতোয়া নদী

  

পিএনএস ডেস্ক:বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সহ বিভিন্ন সংগঠন ও সুধী সমাজ দীর্ঘদিন থেকে ‘বগুড়ার প্রাণ’ করতোয়া নদীকে দখল ও দূষণের হাত থেকে বাঁচানোর দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু দখল ও দূষণের অপচেষ্টা থেমে নেই। বরং প্রভাবশালী একটি মহল আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে তাদের অপতৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। করতোয়া বাঁচাতে তাই সচেতন মানুষের এক হওয়া ছাড়া, একটা কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা ছাড়া কোন উপায় নাই। প্রশাসনকে এ ব্যাপারে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করার জোর দাবী জানাই।নদী বাঁচাতে হবে কেন? নদী কি আমাদের খেতে দেয়? এমন প্রশ্ন কারও কারও মনে থাকতেই পারে। আমি তাতে বিস্মিত নই। আপনারা কি ভেবে দেখেছেন কেন আমাদের নলকূপগুলোতে আগের মত পানি পাওয়া যায় না? সামান্য খরা হলেই কেন আমাদের মাঠগুলো ফেটে চৌচির হয়ে যায়? কেন আমাদের পানিতে অতিমাত্রায় বিষাক্ত আর্সেনিক দেখা দিয়েছে? কেন আমাদের মাছ, পাখি, অনেক চেনা বৃক্ষ হারিয়ে যাচ্ছে? কেন আমাদের গাছগুলোতে আগের মত ফল ধরে না বা ধরলেও ফল ছোট হয়ে যায়? এসবের সাথেই জড়িয়ে আছে পানি প্রবাহের গভীর সম্পর্ক। প্রবাদে আছে, ‘নদীর জল ঘোলাও ভাল’, তাই নদী বাঁচাতে হবে।

অসচেতন কর্মকান্ডের পাশাপাশি সচেতনভাবে নদী গিলে খাচ্ছে একদল লোভী মানুষ। লোভ সীমাহীন। যার অনেক আছে সে আরও বেশি করে চায়। বিশাল ভবন এবং কোটি কোটি টাকার মালিক হলেও তার শান্তি আসে না। তার চোখ পড়ে বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া শীর্ণকায় নদীটার উপর। ঐ নদীটা তার চাই-ই, চাই। অসৎ মোড়ল যেমন করে গরীবের সুন্দরী বউটার দিকে লোলুপ হাত বাড়ায় ঠিক তেমনিই ‘নদী খেকো’রা নদীর জমি দখল করতে চায়। এটা চলতে দেয়া যায় না। প্রতিবাদ করতে হবে। ‘নদী খেকো’ দুর্বৃত্তদের নিবৃত্ত করতে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে আমাদের প্রাণ ও প্রতিবেশ চরম ঝক্কির মধ্যে পতিত হবে।

নদী খেকো’র সারাদেশেই আছে। আমাদের প্রিয় বগুড়া শহরের প্রাণ প্রবাহের ধারক করতোয়া নদীটিও এই দুর্বৃত্ত খাদকদের মুখের গ্রাস হয়েছে। সচেতন বগুড়াবাসীর প্রতিবাদ সত্বেও এই খাদকেরা অদৃশ্য শক্তির জোরে এখনও নদী গ্রাসের তান্ডবলীলায় মত্ত হয়ে আছে। বেপরোয়া এই গোষ্ঠীকে প্রতিরোধ করতে হবে। এটা সময়ের দাবি। দল-মত নির্বিশেষে এর জন্য ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সরকার একদিকে প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ সচল রাখার তাগিদ দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে নদী-খাল-বিল জলাশয় সংরক্ষণ, দখলমুক্ত করা, পুনঃখনন করার কথা বলছে অপরদিকে কোন এক অশুভ শক্তির প্রভাবে স্থানীয় পর্যায়ে দখল, দূষণ অব্যাহত রয়েছে। প্রশাসন আছে, দেখছে, মামলা হচ্ছে, রায় বেরুচ্ছে দখলদারদের বিরুদ্ধে কিন্তু এই খাদকদের ক্ষিধে মিটছে না। করতোয়ার মত সারাদেশেই নদীগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে। অনেক জায়গায় এগুলো ভরাট হয়ে এখন নদীর রূপ পাল্টে শীর্ণ খালে পরিণত হয়েছে। কোথাও তাদের অস্তিত্ব পর্যন্ত আর অবশিষ্ট নেই। ‘এইখানে এক নদী ছিল’ - রূপকথার গল্পের আদলে এখন আমাদেরকে ঐসব নদীর কথা বলতে হচ্ছে। পরিস্থিতি দিনে দিনে আরও ভয়াবহ হচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে এক সময় পুরো বাংলাদেশটাই তাঁর জীব-বৈচিত্র্য হারিয়ে হয়তো বিরাণভূমিতে পরিণত হবে। যেমন করে এখন বদলে যাচ্ছে বরেন্দ্র এলাকার প্রাণ বৈচিত্র্য। শুকিয়ে যাচ্ছে চলনবিল অঞ্চলের ১৬টি নদ-নদী। মরে যাচ্ছে নীলফামারীর ১০টি। দেশের পশ্চিমাঞ্চলে চিত্রানদীসহ আরও অসংখ্য নদীও মৃতপ্রায়। মরে গেছে আমাদের প্রমত্তা নদী করতোয়া। বিগত কয়েক দশকে অবৈধ দখলে-দূষণে করতোয়া এখন শুধুই বর্জ্য অপসারণের ড্রেন। এখন শুধুই ইতিহাস!

করতোয়া ইতিহাস প্রসিদ্ধ নদী। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং এর পুন্ড্রনগর পরিভ্রমণকালে ‘পূণ্যতোয়া’ বলে যে নদীর বর্ণনা পাওয়া যায় আজকের করতোয়া যে সেই ‘পূণ্যতোয়া’ এটা নিয়ে কোন দ্বিমত নেই। আবার লোককাহিনী ‘বেহুলা’ ভাসানের কাহিনীতে যে নদীর কথা বলা হয়েছে সেটাও আমাদেরই এই করতোয়া নদী। শুধু করতোয়া নয়, নদীমাতৃক এই বাংলাদেশের প্রায় অঞ্চলেই প্রতিটি নদীকে ঘিরে অনেক চমৎকার সব লোককাহিনী ছড়িয়ে আছে যা আমাদের জীবন-জীবিকা, সভ্যতা ও বিকাশের সাথে গভীরভাবে মিশে আছে। এই নদীগুলো হারিয়ে যাওয়া, ‘দখলে-দূষণে’ শীর্ণকায় হয়ে যাওয়া খুবই মর্মান্তিক এবং ভবিষ্যতের টিকে থাকার জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। নদী শুকিয়ে গেলে নদী পার্শ্ববর্তী এলাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়। গাছ ও ফসলের ক্ষতি হয়। মানুষ, পাখি ও অন্যান্য প্রাণীদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে যায়। এমনকি মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীদের মেজাজ রুক্ষ বা খিটখিটে হয়ে যায়। সমাজে অস্থিরতা ও সহিংসতা বৃদ্ধি পায়। পানি না থাকলে প্রাণের বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে যাবে। দেশের সকল নদ-নদী ও জলাধার রক্ষা তাই অতিব গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি জরিপ অনুযায়ী দেশের ৩০টি নদী বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে। বাকিগুলোতে শুকনো মওসুমে কোন পানি থাকে না। এক-তৃতীয়াংশ বা তারও কম অংশে থাকে হাঁটু পানি। নদী দখল ও দূষণকারীদের কোন রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পাওয়া উচিত নয়। নদীর পাড় দখল করে ভবন বা অবকাঠামো নির্মাণ অথবা নদীর মধ্যে বাঁধ দিয়ে রাস্তা তৈরি, মাছ চাষের নামে নদীকে পুকুর বানিয়ে ফেলা, নদীতে ময়লা আবর্জনা ফেলা ইত্যাদি কর্মকান্ডের মাধ্যমে নদীগুলোকে মেরে ফেলা হচ্ছে। জাতির ভবিষ্যতকে পানিতে মারার আয়োজন করেছে দুর্বৃত্ত গোষ্ঠী। বগুড়ার বুক বেয়ে ধেয়ে চলা করতোয়া ইতিমধ্যে অনাদর আর অবহেলায় মৃতপ্রায়। করতোয়া একটা উদাহরণ মাত্র। বাংলাদেশের প্রায় ৮৯টি নদী এই অবস্থার শিকার বলে বাংলাদেশ নদী গবেষণা ইন্সটিটিউট সূত্রে জানা গেছে।

দেশের ভেতরে সৃষ্ট সংকটের পাশাপাশি উজানে ভারত কর্তৃক বাঁধ নির্মাণ, পানিবিদ্যুৎ ও ক্যানাল প্রকল্প তৈরির ফলে বাংলাদেশের নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয়সহ পানির প্রাকৃতিক উৎসগুলো সঙ্কুচিত হয়ে যাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ মনে করে উজানের এসব প্রকল্প এবং দেশের অভ্যন্তরে নদী ভরাট, দখলের ফলে দেশের সার্বিক পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। শুষ্ক মওসুমে সার্বিক সেচব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, এমনকি অনেক স্থানে গভীর নলকূপ বসিয়েও কাঙ্খিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। উল্লেখ্য বাংলাদেশে প্রবাহিত ৫৪ টি নদীর পানির উৎস ভারতে। তারা প্রত্যেকটি অভিন্ন নদীতে বাঁধ, জলবিদ্যুৎ, ক্যানাল প্রকল্প, রিজার্ভারসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করে পানির প্রবাহ আটকে রেখেছে।

নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রশ্নে ন্যায্য দাবিটুকু তুলতেই হবে। দেশের অভ্যন্তরে ক্ষমতাশালীরা যেভাবে নদী দখল ও দূষণ ঘটিয়ে চলেছেন তা বন্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে। বছর দুয়েক আগে আদালতের আদেশে ধুনটে বাঙালি নদীর অবৈধ বাঁধ অপসারণ করার যে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে শিক্ষা নিয়ে সম্ভবতঃ বিভিন্ন এলাকায় জনগণকে নিজেদের মত করে পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নিতে হবে। কবিতায় যেমন বলা হয়েছে, ‘আমরা যদি না জাগি মা, কেমনে সকাল হবে’ - ঠিক তেমনিভাবে স্থানীয় মানুষকে জেগে উঠতে হবে। নদী বাঁচাতে, পানি ও প্রাণ প্রবাহ সচল রাখতে আমাদের রাজনীতির উর্ধ্বে উঠে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যেতে হবে। এটা সময়ের দাবি ও জাতির অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য।

নদীকে দখলের হাত থেকে বাঁচাতে হলে এর সীমানা নির্ধারণ করে পিলার পুঁততে হবে। নদীর পাড়ে ইতিমধ্যে নির্মিত অবৈধ স্থাপনাসমূহ ভেঙ্গে ফেলতে হবে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রত্যেক জেলায় একটি করে ‘নদী রক্ষা কমিটি’ গঠন করার কথা। এই কমিটিতে গণমাধ্যম ও নাগরিক প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করতে হবে। নির্দেশনা অনুযায়ী জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে প্রতি মাসে এই কমিটির অনুষ্ঠিত সভা এবং গৃহীত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে গণমাধ্যমের সহায়তায় জনগণকে জানাতে হবে। এর ফলে জনসচেতনতা বৃদ্ধি পাবে এবং স্থানীয় মানুষেরা নদী দখলের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে উদ্বুদ্ধ হবে। নদীকে দূষণের হাত থেকে রক্ষার জন্য নদীতে বর্জ্য ফেলার উপর, বিশেষ করে নদী তীরবর্তি শিল্প-কারখানার বর্জ্য যাতে নদীতে ফেলা না হয় তার জন্য কঠোর মনিটরিংসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া দরকার। নদীগুলোর নাব্যতা বৃদ্ধির জন্য নদীর উৎসমুখে নির্মিত বাঁধ উন্মুক্ত করে দিতে হবে। যেমন করতোয়া নদীর উজানে গোবিন্দগঞ্জের কাঁটাখালি পয়েন্টে নদীর পরিবর্তিত গতিমুখ আবার সচল করতে হবে। ১৯৮৮ সালে তৎকালীন এরশাদ সরকার এটা করেছিল।

বাংলাদেশে প্রায় ৫০০ নদী রয়েছে যার বেশিরভাগই এখন মৃত। বাংলাদেশ নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট এর সুপারিশ এর ভিত্তিতে ক্যাপিটালড্রেজিং এর মাধ্যমে নদীর পানি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিতে হবে। করতোয়াসহ মৃতপ্রায় নদ-নদীর নাব্য পুনরুদ্ধার, নদীর নিষ্কাশন ক্ষমতা বৃদ্ধি, নদী শাসন, গতিপথ নির্ধারণ, জমিউদ্ধার, মৎস্য স¤পদ উন্নয়ন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, নদী তীর ভাঙন প্রতিরোধসহ টেকসই নদীব্যবস্থাপনার জন্য আসন্ন বাজেটসহ প্রতিবছরই জাতীয় বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। বিশেষ করে করতোয়াসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নদী বাঁচানোর জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প নেয়ার জন্য আমি সংশ্লিষ্টদের প্রতি দাবি জানাচ্ছি। শোনা যায়, ড্রেজার ও প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে সরকার নদ-নদী খনন করতে পারছে না। এটা খুবই হতাশাজনক। সরকার চাইলে এ ব্যাপারে স্থানীয়ভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে। যেমন করতোয়া নদী খনন প্রকল্প গ্রহণের সাথে সাথে বগুড়াসহ করতোয়া নদী অববাহিকার মানুষকে সম্পৃক্ত করে স্বেচ্ছাশ্রমের পাশাপাশি অর্থ সহযোগিতা দেয়ার আহ্বান জানানো হলে মানুষ সানন্দে তাতে সাড়া দিবে। ভাল কাজে সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য দেশের মানুষ সব সময় প্রস্তুত।

এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের অবস্থান ভাটিতে হবার কারণে প্রতিবছর উজান থেকে নেমে আসা পলি ও বর্জ্য আমাদের নদী ভরাটের এক বড় কারণ। সে কারণে সরকারকে “উজান অববাহিকা ব্যবস্থাপনা” বা আপল্যান্ড ওয়াটারশেড ম্যানেজমেন্ট গ্রহণ করতে হবে। উজানে অবস্থিত দেশগুলোর সাথে পানির ন্যায্য হিস্যা এবং বাঁধ নির্মাণ সম্পর্কিত ইস্যুগুলোতে কূটনৈতিক ও আইনী তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে। স্থায়ীত্বশীল বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে চাইলে জনগণকে সম্পৃক্ত করতেই হবে। ‘নদীখেকো বা দূষণকারীদের যারা প্রশ্রয় দেন, তাদের ভোট দিবেন না’- এই দাবি তুলতে হবে। দখলবাজদের দৌরাত্ম নিয়ন্ত্রণে সকলে এক হও। করতোয়া বাঁচাও। নদী বাঁচুক আমাদের ভালবাসায়।
সূত্র: দৈনিক করতোয়া

পিএনএস/আলআমীন

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech