যে কারণে বাড়ছে কালবৈশাখীর তাণ্ডব

  

পিএনএস ডেস্ক:গ্রীষ্মের শুরুতে কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যাওয়া ব-দ্বীপের এই দেশের অন্যতম প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য। শীত-বসন্ত পেরিয়েে বৈশাখ মাসে শুরু হয় গরম মৌসুম। বৈশাখে অাবহমান বাংলার চিরায়ত প্রাকৃতিক দূর্যেোগ কালবৈশাখী। এবার বৈশাখ শুরু হওয়ার আগেই কালবৈশাখী বইতে শুরু করেছে, বৈশাখের প্রথম সপ্তাহ থেকে দেশের নানা জায়গায় প্রতিদিনই এক বা একাধিকবার কালবৈশাখী হচ্ছে। ঝড়ের সঙ্গে হচ্ছে শিলাবৃষ্টি। বেড়ে গেছে বজ্রপাত। বজ্রবৃষ্টিসহ বয়ে যাওয়া এই ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ফসল-সহায়-সম্পদ, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে বেশ কয়েকটি।

চলতি মৌসুমের মতো ঘন ঘন কালবৈশাখী, শিলাবৃষ্টি আর বজ্রপাতের ঘটনা স্মরণকালে অার ঘটেনি। কালবৈশাখীর এই ঘনঘটায় জনমনে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরাদের কাছেও এবারের ঘন ঘন বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে সবার মনে প্রশ্ন এখন, কালবৈশাখী বাড়ছে কেন? এই প্রশ্নের জবাব খোঁজার আগে প্রকৃতিতে কালবৈশাখী ঝড়ের উৎপত্তির দিকে চোখ রাখি।

বৈশাখে সূর্য বাংলাদেশ ও তার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের ওপর খাড়াভাবে কিরণ দেয়। ফলে এ অঞ্চলের বায়ু সকাল থেকে দুপুরের রোদের তাপে হালকা হয়ে ওপরের দিকে উঠে যায়। এভাবে বিকেলের দিকে এ অঞ্চলে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। বৈশাখে আমাদের দেশের উত্তরে ও হিমালয়ের দিকে বায়ুর চাপ বেশি থাকে। তাই উচ্চচাপের উত্তরাঞ্চল থেকে বায়ু প্রবল বেগে দক্ষিণ দিকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে ধাবিত হয়। ফলে যে প্রবল ঝড়ের সৃষ্টি হয়, তাকে আমরা কালবৈশাখী ঝড় বলে থাকি।

কালবৈশাখী ঝড় হঠাৎ করে ধেয়ে আসে না। ঈষাণ কোণে জমা হওয়া কালোমেঘ এ ঝড়ের আভাস দেয়। কালবৈশাখীর স্থায়িত্ব স্বল্পসময়ের। ঝড় তৈরি হয়ে পূর্ণতা লাভের পর ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট পর্যন্ত এর তীব্রতা সর্বোচ্চ থাকে। তারপর তা আস্তে আস্তে হ্রাস পেতে থাকে। তবে কখনও কখনও এ ঝড় এক ঘন্টারও বেশি স্থায়ী হয়। কালবৈশাখীর বায়ুর গড় গতিবেগ ঘন্টায় ৪০ থেকে ৬০ কিমি। কোন কোনো ক্ষেত্রে এ গতিবেগ ঘন্টায় ১০০ কিমি-এর বেশিও হতে পারে। কালবৈশাখীর সময় অঝোর ধারায় বৃষ্টিপাত হয়। বিদ্যুৎ চমকানো, বজ্রপাত, অতি দ্রুত হারে তাপমাত্রা হ্রাস আর শিলাপাত কালবৈশাখীর সাধারণ ঘটনা। কালবৈশাখীর সময় উত্তর-পশ্চিমাকাশ কাল করে আসে।

বৈশাখ মাসে কালবৈশাখী বেয়ে যাবে, এটাই স্বাভবিক। কিন্তু এবার এই ঝড়ের মাত্রাটা অস্বাভাবিক। আবহাওয়া অফিসের রেকর্ড অনুযায়ী গত ৪০ বছরে এত ঘন ঘন তীব্রমাত্রার কালবৈশাখী হয়নি। ঝড়ো হাওয়ার এই তীব্রতা অস্বাভাবিক ঘটনা। সেই সঙ্গে বড় বড় শিলা পড়ছে, বজ্রপাতও হচ্ছে অনেক। আবহাওয়াবিদরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ায় কালবৈশাখীসহ শিলাবৃষ্টি ও বজ্রপাত বেড়ে গেছে। পরিববেশগত ভারসাম্য বজায় না থাকায় কালবৈশাখীর ধরণ পাল্টাতে শুরু করেছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে গ্রীষ্মকালে হিমালয়ের পাদদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ কালবৈশাখী বাংলাদেশ ও ভারতের কিছু অঞ্চলের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। আগের নিরীহ ধাঁচের দমকা হাওয়ার মতো বয়ে যাওয়া এই ঝড় রূপ পাল্টাতে শুরু করেছে। চলতি মৌসুমে আঘাত হানা এ অঞ্চলের কালবৈশাখী ক্রমেই যুক্তরাষ্ট্রে বয়ে যাওয়া টর্নেডোর মতো হয় উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ও মিনেইসিটোর মতো রাজ্যগুলোতে টর্নোডে যে গতিতে বয়ে যায়, দক্ষিণ এশিয়া ঝড়ো হাওয়াতে সেই গতির সাদৃশ্য পাওয়া যাচ্ছে। আগামীতে ভারতের পূর্বাঞ্চল ও বাংলাদেশে কালবৈশাখী তৈরি করতে পারে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের হুমকি।

এ বিষয়ে আবহাওয়াবিদ ও বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের পরিচালক শাহ আলম বলেন, এ বছরের আবহাওয়ায় কালবৈশাখীর সংখ্যা বেড়েছে, শিলাবৃষ্টি ও বজ্রপাতের সংখ্যাও সেই অনুপাতে বেড়েছে। গত এপ্রিল মাসের শুরুতেই এক স্থানে কালবৈশাখীতে ১৪ জন মারা গেছে। এখন বজ্রপাতের ঘটনা ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। চলতি মৌসুমে দেশের সর্বত্র কালবৈশাখী বেড়ে যাওয়ার কারণ এখনই সুনির্দিষ্ট করে বলা যাওব না। তবে সামগ্রিকভাবে বলা যায়. বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে আমাদের জলবায়ুতে।

গত কয়েকদিন ধরে প্রতিদিনই কালবৈশাখী বয়ে যাওয়া আর কতো দিন চলবে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, কালবৈশাখীর ব্যাপারে খুব আগে থেকে ধারণা দেওয়া যায় না। তবে আগামী কয়েকদিন কালবৈশাখী পিছু ছাড়ছে না। বাতাসে জ্বলীয়বাষ্পের পরিমাণ, বাতাসের উর্দ্ধমুখি গতি ও অন্যান্য উপাদান সেই আভাসই দিচ্ছে। কালবৈশাখী ঝড়সহ বৃষ্টি ঝড়ো বাতাস, বজ্রপাত শিলাবৃষ্টিসহ কালবৈশাখী হওয়ার সম্ভাবনা থাকছে প্রায় প্রতিদিনিই। তবে এমাসের শেষের দিকে তা আরো বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।’

পিএনএস/আলআমীন

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech