লুটের স্বর্গরাজ্যে গ্যাসের গ্রাহকরা প্রহসনের শিকার

  

পিএনএস (মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম প্রধান) : গ্যাসসংকট চরমে। গ্যাসের অভাবে রাজধানী ঢাকার গ্রাহকরা অতিষ্ঠ। সময়মতো গ্যাস না পেয়ে রমজানে রোজাদারদের যারপরনাই কষ্ট হচ্ছে। গ্যাস-পানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এতে গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে দায়িত্বশীলদের টনক নড়ছে না।

পবিত্র রমজানে গ্যাস সংকটে চরম দুর্ভোগে রয়েছেন গৃহিণীরা। গ্যাস সংকটে এমন ভোগান্তির ঘটনা রাজধানীতে এখন সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানীর প্রতিটি এলাকায় গ্যাসসংকট নিত্যনতুন হলেও পবিত্র মাহে রমজানে এ ভোগান্তিতে বিশেষ করে গৃহিণীদের সীমাহীন কষ্ট হচ্ছে। চুলায় রান্না করতে গিয়ে চোখের পানি নাকের পানি একাকার। অনেকে দূরের স্বজনদের বাসা থেকে খাবার রান্না করে আনছেন। কিন্তু সেটা কতদিন?

মোহাম্মদপুর বছিলার মোছা. জেসমিন আক্তার নামে গৃহিণী জানান, রাত সাড়ে ১১টার দিকে নামকাওয়াস্তে গ্যাস আসে। সকাল থেকে রাত ১১টার আগে গ্যাস পাওয়া যায় না। কিন্তু এখন রমজান মাস সকল রান্না করতে হয় বেলা ২টা থেকে রাত ১০টার মধ্যে। এ সময়ই গ্যাস থাকে না। তাই রান্না করতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় তাদের। কবে এই সমস্যা দূর হবে, এটা ভেবে কূল পাচ্ছেন না সংশ্লিষ্ট গ্রাহকরা।

ঢাকা দক্ষিণ হোক কিংবা উত্তর সকল জায়গায় একই অবস্থা। বিশেষ করে শ্যামলী, মীরপুর, মোহাম্মদপুর, পুরান ঢাকা, জুরাইন, মালিবাগ, রামপুরার উলন, মগবাজার এলাকায় গ্যাস সমস্যা প্রকট। গ্যাস দিয়ে রান্না করতে অভ্যস্থ গৃহিণীরা লাকড়ির চুলায় পাক করতে ভোগান্তিতে পড়ছেন। আবার বাড়ীওয়ালারাও চুলা জ্বালাতে বারণ করছেন, তাদের দেয়ালে কালি পড়ার আশঙ্কায়। সব মিলিয়ে রান্না নিয়ে চোখে সরষেফুল দেখছেন দুর্ভোগকবলিতরা।

গ্যাসের বিল দিতে হচ্ছে, অথচ প্রয়োজনের সময় গ্যাস পাওয়া না। এ নিয়ে গ্রাহকরা যারপরনাই ক্ষুব্ধ। সামর্থ্যবানরা এলজি গ্যাস ব্যবহার করছেন। কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়ে বৈদ্যুতিক হিটার ব্যবহার করছেন। রমজানে এসব করতে গিয়ে মানুষের সমস্যা বাড়ছে। আর এসব করতে বেড়েছে হয়রানি, বাড়ছে অতিরিক্ত খরচ। কিন্তু সবার দ্বারা তো এটা করা সম্ভব হচ্ছে না। তার পরও বাধ্য হয়ে বিকল্প পথে এগোতে হচ্ছে।

রমজানের প্রথম তারাবির নামাজ আদায়ের মধ্যদিয়ে শুরু হয় পবিত্র এই মাসের আনুষ্ঠানিকতা। ভোরে সেহরি খেয়ে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা তাঁদের প্রথম রোজার রাখার নিয়ত করেছেন। রাজধানীজুড়ে সাধ্যমতো সেহরি খাওয়ার আয়োজন করেছেন নগরবাসী। তবে মধ্যরাতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকটে সেহরি তৈরিতে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। অনেকে হোটেল থেকে খাবার কিনে সেহরি সারেন।

গ্যাসসংকটে রাজধানীর কর্মজীবী মানুষের দুর্ভোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি ও রোজা পালনের পর শান্তিতে ইফতার ও সেহরি গ্রহণ করতে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এগুলো তৈরি করতে না পারায় হোটেল-রেস্তোরাঁয় ছুটতে হয়। বাধ্য হয়ে এসব খাবার কিনতে হয়। এতে অতিরিক্ত খরচ হয়। বাড়তি এই খরচ ও দুর্ভোগ তাদের পোহাতে হতো না, যদি গ্যাসসংকট না হতো। গ্রাহকের প্রতি দায়বদ্ধতার অভাবেই এমনটা হচ্ছে বলে স্পষ্ট অভিমত অভিজ্ঞ মহলের।

অভিজ্ঞদের মতে, অবৈধভাবে গ্যাস সরবরাহ করায় গ্রাহকরা দুর্ভোগে পড়ছেন। একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারি অবৈধভাবে বাসাবাড়ি, দোকান ও বস্তিতে গ্যাস সংযোগ দেয়ায় গ্রাহকরা সমস্যায় পড়ছেন। অবৈধ সংযোগের কারণে বৈধ গ্রাহকরা খেসারত দিচ্ছেন। রাজধানীতে আগে গ্যাসসংকট হতো শীতকালে, অবৈধ সংযোগ মাত্রাতিরিক্ত হওয়ায় এখন এ সমস্যা আগাম শুরু হয়েছে। এই সমস্যা কবে কাটবে, কেউ বলতে পারছে না। এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে গ্রাহক সাধারণ।

দেশে গ্যাসের অভাব নেই। পর্যাপ্ত গ্যাস রয়েছে। মওজুদও কম নয়। দেশের যত্রতত্র গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। দেশের মাটি নিচে শুধু নয়, নদী ও সাগরের তলদেশেও প্রচুর গ্যাস রয়েছে। ভূত্ত্বজরিপ ও সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞমহলের সূত্রমতে, দেশ গ্যাসের উপর ভাসছে। কথাটি একেবারেই যে অমুলক নয়, সেটার প্রমাণ প্রায়ই পাওয়া যায়। অনেক এলাকার নলকূপে গ্যাস উঠে। নলকূপ বসাতে গিয়ে গ্যাসের চাপে বিস্ফোরণ ঘটার খবর মিডিয়ায় আসে। এসব উত্তলন করা সময়ের দাবি। সমস্যা একটা- সেটা নীতি-নৈতিকতা ও আদর্শের।

একটি মহল কৃত্রিমসংকট সৃষ্টি করে বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানিকে বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তারা দেশ ও জাতির নয়, নিজের ও কতিপয় ব্যক্তির স্বার্থে এসব করছে বলে চাউর আছে। কতিপয় প্রতিষ্ঠান টাকার বিনিময়ে এদের হাত করে সর্বানাশা খেলায় মেতে উঠেছে। এগুলো দেখার কেউ নেই। ফলে ওরা অর্থের বিনিময়ে কিছু লোককে হাত করে ইচ্ছেমতো কামাচ্ছে। মাঝখানে রাজধানী ঢাকার কিছু গ্রাহক দুর্ভোগ পোহালে তাদের কী আসে-যায়।

গ্রাহকরা সুবিধা পাবেন, এটা তাদের অধিকার। দুবছরে গ্রাহকরা গ্যাস বিল প্রায় তিনগুণ বেশি দিচ্ছেন। বিল দিচ্ছেন, অথচ সেবা পাচ্ছেন না। এরচেয়ে বেদনা ও কষ্ট আর কিছু হতে পারে না। মগের মুল্লুক্কের পরিস্থিতির কারণে এসব করে পার পেয়ে যাচ্ছে সুবিধাবাদী মহলটি। মূলত জবাবদিহিতার অভাবের কুফল এটি। যতদিন জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হবে, ততদিন নাকি গ্রাহক সাধারণের চলমান এই দুর্ভোগ কাটবে না।

তথ্যমতে, গ্যাস খাতে বিপুল পরিমাণ লস হচ্ছে সেখানের একশ্রেণীর দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা-কর্মচারীর কারণে। একসময় বিপাকে পড়ে স্বেচ্ছায় এমন তথ্য দেন দুর্নীতিবাজরা। মাটির নিচের পাওয়া প্রাকৃতিক এই সম্পদ সঠিক ব্যবহার না হয়ে লুটপাটের হাতিয়ারে পরিণত হওয়ায় গ্রাহকরা চরম দুর্ভোগে। আর এটি নিয়ে নয়ছয় করে রাজকীয় হালে আছে দুর্বৃত্তসমরা। গ্যাস নিয়ে যারা যা করার করুক, সাধারণ গ্রাহকদের রমজানে দুর্ভোগ লাঘবে সংশ্লিষ্টদের একটু সদয় হওয়ার বিনীত অনুরোধ থাকল।

লেখক : বার্তা সম্পাদক- পিএনএস

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech