ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন : মত প্রকাশের অন্তরায় ও দুর্নীতি সহায়ক

  

পিএনএস (মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম প্রধান) : অবশেষে বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল ২০১৮ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। কিন্ত বিতর্ক থেমে নেই। এটি দুর্নীতিবাজদের জন্য সহায়ক আর মুক্ত ও স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য ক্ষেত্রে হুমকিস্বরূপ মনে করা হচ্ছে। এ আইন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ করে দেবে বলে সাংবাদিক সমাজের আশঙ্কা। ফলে এ নিয়ে নীতিবান সাংবাদিকরা ক্ষুব্ধ। আইনটি একদিকে মুক্ত-স্বাধীন মত প্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করবে অন্যদিকে দুর্নীতিবাজদের রক্ষাকবজ হিসেবে পরিগণিত হওয়ার উপাদান রয়েছে।

ইতিমধ্যে আইনটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সম্পাদক পরিষদ। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন নিয়ে বিস্ময় ও হতাশা প্রকাশ করে তা প্রত্যাখ্যান করেছে সম্পাদক পরিষদ। সংগঠনটি এক বিবৃতিতে বলেছে, প্রতিবাদ-বিক্ষোভ এবং সাংবাদিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্বেগ এ প্রতিবেদনে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুতর হুমকি। ১৬ সেপ্টেম্বর দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে আয়োজিত এক বৈঠকে এ বিস্ময় ও হতাশা প্রকাশ করে সম্পাদক পরিষদ।

সম্পাদক পরিষদের বিবৃতিতে বলা হয়, এই প্রতিবেদন আমরা প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হচ্ছি। কেননা, খসড়া আইনটির ৮, ২১, ২৫, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২ ও ৪৩ ধারায় মৌলিক কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। এই ধারাগুলো মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুতর হুমকি।

ডিজিটাল আইনটি প্রত্যাখ্যান করে বলা হয়- ১. এটি সংবিধানের ৩৯ (২) ক ও খ ধারায় দেয়া মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নিশ্চয়তার পরিপন্থী। ২. এটি চিন্তার স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ধারণার বিরোধী, যে স্বাধীনতা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ। ৩. এটি গণতন্ত্রের মৌলিক চর্চারও বিরোধী, যে গণতন্ত্রের জন্য বাংলাদেশ সব সময়ই লড়াই করেছে এবং এর পাশে থেকেছে। ৪. এটি সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মৌলিক নীতিমালার বিরোধী।

ডিজিটাল আইনটি সংসদে পাস হওয়ার পর স্বাধীন সাংবাদিকতায় বিশ্বাসীরা যারপরনাই ক্ষুব্ধ হয়েছেন। ফলে তারা প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। সীমিত আকারে হলেও ইতিমধ্যে রাজপথে এ নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। এই আইনটিকে স্বাধীন গণমাধ্যমের অন্তরায় হিসেবে উল্লেখ করে তারা তা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। সম্পাদক পরিষদের বক্তব্যের সঙ্গে সাংবাদিক সমাজসহ স্বাধীন গণমাধ্যমে বিশ্বাসী সচেতন জনগোষ্ঠীও আইনটির প্রতিবাদ করে আসছে। এমনকি জাতীয় সংসদেও এ নিয়ে দ্বিমত পোষণ করে গণমাধ্যমের জন্য অন্তরায় এবং সংবিধানের সঙ্গে সাংর্ঘর্ষিক ধারাগুলো বাদ দেওয়ার যৌক্তিক দাবি জানানো হয়েছিল, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠার জোরে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য সম্পূর্ণ পরিপন্থী এ আইনটি পাস করা হয়।

ব্যাপক সমালোচনা ও বিতর্কের মুখে ৫৭ ধারাটি বাদ দিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল ২০১৮ নামে ১৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে যে আইনটি পাস করা হয়েছে, সেটি নতুন মোড়কে ‘নতুন বোতলে পুরনো মদ’ বৈকি। সাংবাদিক সমাজের কাছে এটি তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এ আইনটি পাস হওয়ায় দুর্নীতিবাজরা আশকারা পাবে। তাতে দুর্নীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে আইনটি দুর্নীতিবাজদের জন্য সুরক্ষা মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। স্বচ্ছতায় বিশ্বাসী দায়িত্বশীলদের বিষয়টি নিয়ে আরো ভাবার আছে নিঃসন্দেহে।

সম্পাদক পরিষদসহ সাংবাদিক সমাজ যৌক্তিকভাবে দীর্ঘদিন যাবৎ এই আইনটির বিরোধিতা করে আসছে। মুক্ত ও স্বাধীন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির কালো দিকগুলো তুলে ধরে তা বাতিলের দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেগুলো যে আমলে নেওয়া হয়নি, বাস্তবতা সে সত্য সামনে নিয়ে আসছে। সাংবাদিক সমাজের মতো সচেতন জনগোষ্ঠীও মনে করে পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টিকারী বিতর্কিত ধারাগুলো, যেগুলো কালো অধ্যায় হিসেবে সাংবাদিকদের কাছে পরিগণিত হচ্ছে; সেগুলো দ্রুত সংশোধনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আর এটা যত দ্রুত করা হবে ততই সব পক্ষের জন্য মঙ্গল।

লেখক : বিশেষ প্রতিনিধি- পিএনএস

পিএনএস/এএ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech