ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে স্বাক্ষর না করে সংসদে ফেরত পাঠান: রাষ্ট্রপতিকে সিপিজে

  


পিএনএস ডেস্ক: গত ১৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে পাস করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ এ স্বাক্ষর না করে পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের জন্য রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদকে চিঠি দিয়েছে সাংবাদিকদের সুরক্ষায় কাজ করা নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট’—সিপিজে।

মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে কাজ করা ওই কমিটির আশঙ্কা হচ্ছে, এই আইনটি সরকার তার সমালোচনার পথ বন্ধের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে পারে।

এ ব্যাপারে তারা গভীর উদ্বগ প্রকাশ করে সংগঠনটি দাবি করে- সংসদে পাস করা আইনটি যদি প্রয়োগ করা হয়, তাহলে তা বাংলাদেশে গণমাধ্যমে স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলবে,।

সিপিজের এশিয়ার প্রোগাম কো-অর্ডিনেটর স্টিভেন বাটলার স্বাক্ষরিত রাষ্ট্রপতিকে দেয়া ওই চিঠিতে বলা হয়, এই আইন স্বাধীন স্বাভাবিক সাংবাদিকতা পেশার জন্য হুমকি এবং তা ঝুঁকিপূর্ণও বটে।

তাই সংগঠনটি রাষ্ট্রপতিকে স্বাক্ষর না করে পুনরায় পর্যালোচনার জন্য আইনটি সংসদে ফেরত পাঠানার জন্য আহ্বান জানিয়েছে।

রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদকে দেয়া চিঠিটি শুক্রবার তাদের ওয়েব সাইটে প্রকাশ করেছে।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর সংসদে পাস হওয়া ওই আইনে যাবজ্জীবন জেল, পুলিশকে পরোয়ানা বা অনুমোদন ছাড়াই তল্লাশি, জব্দ এবং গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা, আইনে অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট যুক্ত করার ফলে কোনো সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থার অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করা হয়, বা প্রকাশ করে বা কাউকে করতে সহায়তা করে ওই আইন ভঙ্গ করলে এই আইনে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের সাজা হতে পারে, ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে। এছাড়া বিভিন্ন অপরাধের জন্য বিভিন্ন মেয়াদের শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও সরকার বলছে, এই আইনের উদ্দেশ্য হচ্ছে সাইবার অপরাধ বন্ধ করা।

সিপিজের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ওই চিঠিতে বলা হয়, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যের কথা বলা হলেও আইনটি কর্তৃপক্ষের সমালোচনা কিংবা যা তাদের জন্য বিব্রতকর, তা বন্ধের সুযোগ তৈরি করবে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যে তথ্যগুলো জানা দরকার
বাংলাদেশের পার্লামেন্টে বুধবার পাস হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮, যে আইনের প্রস্তাবের পর থেকেই উদ্বেগ, বিতর্ক আর সমালোচনা চলছে।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তফা জব্বার বিলটি পাসের জন্য সংসদে উত্থাপন করলে কণ্ঠভোটে পাস হয়।

আইনটি প্রস্তাবের পর থেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমের কর্মীরা। তাদের আশঙ্কা, আইনটির অনেক ধারায় হয়রানি ও অপব্যবহার হতে পারে।

তবে মিজব্বার সংসদে দাবী করেছেন, সংবাদকর্মীরা যেসব বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তা সংশোধন করা হয়েছে।

বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কি রয়েছে?

• ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত দেশের সংহতি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা জন শৃঙ্খলা ক্ষুণ্ণ করলে বা জাতিগত বিদ্বেষ ও ঘৃণা সৃষ্টি করলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তা ব্লক বা অপসারণের জন্য টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিকে অনুরোধ করতে পারবে। এক্ষেত্রে পুলিশ পরোয়ানা বা অনুমোদন ছাড়াই তল্লাশি, জব্দ এবং গ্রেপ্তার করতে পারবে।

• আইনে অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট যুক্ত করা হয়েছে। ফলে কোনো সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থার অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করা হয়, বা প্রকাশ করে বা কাউকে করতে সহায়তা করে ওই আইন ভঙ্গ করলে এই আইনে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের সাজা হতে পারে, ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

• কোনো সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থার অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত যদি কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোন ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করা হয়, তাহলে তা গুপ্তচরবৃত্তি বলে গণ্য হবে এবং এজন্য ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে।

• আইন অনুযায়ী ডিজিটাল মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা জাতির পিতার নামে প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণা চালালে বা মদদ দিলে অনধিক ১০ বছরের কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

• ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে আক্রমণাত্মক, মিথ্যা, ভীতি প্রদর্শক তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ, মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো, ঘৃণা প্রকাশ, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, প্রকাশ বা ব্যবহার করলে জেল জরিমানার বিধান রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে তিন থেকে সাত সাত বছরের কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। দ্বিতীয়বার এরকম অপরাধ করলে ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

• ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে প্রতারণা করলে অনধিক ৫ বছরের কারাদণ্ড, ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ড হতে পারে।

• কম্পিউটার হ্যাকিংয়ের বিষয়েও বিধান রয়েছে এই আইনে। সেখানে ১৫ ধারায় বলা হয়েছে, কম্পিউটার, কম্পিউটার প্রোগ্রাম. কম্পিউটার সিস্টেম বা কম্পিউটার নেটওয়ার্ক বা ডিভাইস, ডিজিটাল সিস্টেম বা ডিজিটাল নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার ব্যাহত করে, এমন ডিজিটাল সন্ত্রাসী কাজের জন্য অপরাধী হবেন এবং এজন্য অনধিক ১৪ বছর কারাদণ্ড অথবা এনধিক এক কোটি অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

• ছবি বিকৃতি বা অসৎ উদ্দেশ্যে ইচ্ছেকৃতভাবে বা অজ্ঞাতসারে কারো ব্যক্তিগত ছবি তোলা, প্রকাশ করা বা বিকৃত করা বা ধারণ করার মতো অপরাধ করলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। ইন্টারনেটে পর্নগ্রাফি ও শিশু পর্নগ্রাফির অপরাধে সাত বছর কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

• কোন ব্যাংক, বীমা বা আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান থেকে কোন ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে আইনানুগ কর্তৃত্ব ছাড়া অনলাইন লেনদেন করলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

• বাংলাদেশ বা বিশ্বের যেকোনো বসে বাংলাদেশের কোন নাগরিক যদি এই আইন লঙ্ঘন করেন, তাহলেই তার বিরুদ্ধে এই আইনে বিচার করা যাবে।

• ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিচার হবে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে। অভিযোগ গঠনের ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তি করতে হবে। তবে এর মধ্যে করা সম্ভব না হলে সর্বোচ্চ ৯০ কার্যদিবস পর্যন্ত বাড়ানো যাবে।

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech