তুই পাগল না মুই পাগল

  

পিএনএস ডেস্ক : গরমে মাথা ঠিক নেই ওয়াসার এমডি সাহেবের। ওয়াসার পানিকে শতভাগ শুদ্ধ ও সুপেয় বলে দাবি করে বেতন হালাল করতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ঘুম ভেঙেই দূষিত, দুর্গন্ধঅলা কালো বা খয়েরি পানি দিয়ে যাঁদের মুখ ধুতে হয়, তাঁদের কয়েকজন তাঁর হুঁশ ফেরাতে গিয়েছিলেন ওয়াসা ভবনে। তাঁর মাথা ঠান্ডা করতে শরবত খাওয়াতে গিয়েছিলেন রাজধানীর জুরাইনের অধিবাসী মিজানুর রহমানসহ কয়েকজন। এমডির এমন জলাতঙ্ক, তা কে জানত? শরবত খাওয়ার ভয়ে তিনি সূর্যগ্রহণের মতো মুখ লুকালেন। এখন বলছেন, মিজানুর রহমান নাকি পাগল। তা শুনে পুরান ঢাকার ঘোড়াগুলোও হেসে উঠবে। বলবে, তুই পাগল না মুই পাগল।

ফেসবুকে জুরাইনবাসী এক প্রবীণকে বলতে শুনলাম, ‘কে পাগল? ওই এমডি এলাকার কোনো খবর না নিয়া, কী পানি আমরা খাই, তা না দেইখা কেমনে অ্যারে (মিজানুর রহমানকে) পাগল বলে? ওনারা ক্ষমতায় বইসা যা–তা কইবেন?’

মিজানুর রহমান যদি পাগল হন, তাহলে আমরা সবাই পাগল। আমাদের বাসাবাড়িতে গরমকালে পানি থাকে না। যখন থাকে, তখন সেটা ফুটিয়ে গন্ধ দূর করব, না ময়লা নাশ করব? এমডি সাহেবকে বলতে ইচ্ছা করে, আপনি এসে দেখে যান, এই কি মানুষের জীবন?

তাঁরা যে আসেননি, তা নয়। ওয়াসা দলবল পাঠিয়ে দিয়েছিল মিজানুর রহমানের আপন বাড়িতে নয়, শ্বশুরবাড়িতে। সেখানে পানি নিয়ে বাড়ির লোককে জেরা করে, ভয় দেখিয়ে এবং ভিডিও করে এসেছে। আবিষ্কার করেছে মিজানুরের পানির বিল বাকি। বিল বাকি হলে আইনে যা আছে তা করবে, কিন্তু দেড় কোটি নগরবাসীকে দূষিত পানির মহামারির দিকে ঠেলে দেওয়ার অধিকার কি আছে ওয়াসার? এই দূষিত পানি ফোটাতে ব্যয় হয় সাড়ে তিন শ কোটি টাকার গ্যাস। গ্যাসের এই বিল কি ওয়াসা দেবে? প্রতিবছর যে শত-হাজার কোটি টাকা খরচ করে রাস্তা খুঁড়ে জনভোগান্তি বাড়িয়ে তারা পাইপ তোলে আর বসায়, তার খতিয়ান কে দেবে? ওয়াসা কত বড় দুর্নীতির আখড়া তা জানতে টিআইবি লাগে না, দুদক লাগে না। ভুক্তভোগীমাত্রই জানে।

ওয়াসার এমডি যাঁকে পাগল বললেন, সেই মিজানুর রহমান ২০ বছর যাবৎ জুরাইন বইমেলার মুখ্য মানুষ। কত সুধী-সাহিত্যিক তাঁর আমন্ত্রণে জুরাইন গেছেন, সংবর্ধনা নিয়েছেন। কত ছেলেমেয়েকে বই পড়িয়েছেন লোকটা, আয়োজন করেছেন কত বিতর্কসভা। ঘরে আধা খেয়ে বাইরে পুরোটা জনসেবা করা নিশ্চয়ই পাগলের কাজ। জুরাইনবাসী শীত-গ্রীষ্ম বারো মাস হাঁটু অবধি কালো থকথকে ময়লা পানির তলে রাস্তা পেতেন। সেই রাস্তায় চলাচল করতেন। মিজানুর এলাকার তরুণদের নিয়ে কয়েক দফা সেই নর্দমা পরিষ্কার করে নর্দমার ময়লা রাস্তা থেকে নর্দমায় নামিয়েছেন। কিন্তু গোড়ায় গন্ডগোল থাকলে এসবে লাভ হয় না। ফলে, আন্দোলন করে এর একটা সুরাহা করতে বাধ্য করেছেন এলাকার এমপিকে। ওই এমপিসহ আমি তাঁদের আয়োজিত এক বইমেলায় বক্তৃতা করেছি। আমার বিশ্বাস, এমপি সাহেবাও বলবেন না মিজানুর পাগল।

জুরাইন এলাকার মাঠ ও পরিবেশ বাঁচানো দিয়ে মিজানুর রহমানের শুরু। তিনি পরে সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলনে জড়িত হন। গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদ করলে পুলিশ তাঁকে পিটিয়ে শাহবাগ হাজতে পুরে রাখে। তদবির করে সেখান থেকে বের করে নেওয়া হয় হাসপাতালে। সুইডেনের পরিবেশবাদী সংগঠন রি.পাবলিক তাঁকে ‘জলবায়ুযোদ্ধা’ খেতাব দেয়। পাগল না হলে কেউ এসব করে?

আমাদের মনে আছে, গ্যাসের দাম বাড়া, গ্যাসসম্পদের ব্যবস্থাপনার অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলায় এক মন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে আন্দোলনকারীদের টোকাই বলেছিলেন। ওই আন্দোলনের নির্দলীয় নেতা আনু মুহাম্মদকে টোকাইদের নেতা বলেছিলেন। আনু মুহাম্মদের সস্তা শার্টের দাম নিয়ে টিটকারি করেছিলেন।

বাংলাদেশ ধন্য যে এ রকম পাগল এখনো সৃষ্টি হয় সমাজের কোলে। পাগল না হলে কীভাবে নূর হোসেন বুকে-পিঠে ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক’ লিখে পুলিশের গুলির সামনে বুক পেতে দেন। পাগল না হলে কীভাবে ফায়ারম্যান সোহেল রানা বনানীর আগুন থেকে মানুষ বাঁচাতে গিয়ে আত্মদান করেন। এক পাগল পুলিশ অফিসারকে দেখেছি, যিনি রাস্তার ভবঘুরেদের নিজ হাতে গোসল করিয়ে জটা চুল কামিয়ে পরিষ্কার কাপড় পরিয়ে খাইয়ে দেন। পাগল না হলে ময়মনসিংহের এক রিকশাচালক পয়সা জমিয়ে হাসপাতাল বানাতে পারতেন না! পাগল না হলে রাজশাহীর পলান সরকার আমৃত্যু গ্রামেগঞ্জে বই ফেরি করে যেতে পারতেন না।

সুইডেনের রি.পাবলিক সংগঠনের উদ্যোগে ঘোষিত পৃথিবীর সেরা ৫ পরিবেশযোদ্ধার একজন মনোনীত হন মিজানুর রহমান
সুইডেনের রি.পাবলিক সংগঠনের উদ্যোগে ঘোষিত পৃথিবীর সেরা ৫ পরিবেশযোদ্ধার একজন মনোনীত হন মিজানুর রহমান
আরেক পাগলের কথা দিয়ে শেষ করি। নাম তার হিমালয় হিমু।

বাড়ি সাভারে। তার সঙ্গে দেখা রানা প্লাজা ধসের দিন। কী এক উন্মাদনার বশে ধ্বংসস্তূপ থেকে আহত ও নিহত লোকজনকে সরিয়ে আনছিল। হাতুড়ি-ছেনি-করাত দিয়ে উদ্ধার করছিল। হয়তো তার জন্য কারও হাত বা পা-ও কাটতে হচ্ছিল। পাগলটা কবিতাও লিখত। কিন্তু মৃত্যুপুরীর সেই দুঃসহ স্মৃতি সে আর ভুলতে পারেনি। রানা প্লাজার নিহত ব্যক্তিদের মতো তাকেও ভুলে যাচ্ছিল সবাই। দিনে দিনে অবসাদের চোরাবালি ঘিরে ধরে তাকে। ফেসবুকে একের পর এক স্ট্যাটাস দেখেও কেউ বুঝতে পারেনি যে রানা প্লাজা ধসের ছয় বছর পূর্তির দিনে ঘটবে আরেকটি মানবিক ধস। গতকাল ২৪ এপ্রিল গায়ে আগুন ধরিয়ে আত্মহত্যা করে সে। হয়তো বিচার না হওয়ার ক্ষোভ ছিল তার, তাই তাজরীনের আগুনের মতো, নুসরাতের আগুনের মতো মৃত্যু বেছে নিয়েছিল। নুসরাতকে আগুন দিয়েছিল অমানুষেরা, হিমু পুড়িয়েছে নিজেকে। কিন্তু তার আগে তিলে তিলে এই অকহতব্য বাস্তবতা তাকে দিয়ে নিজের খুনটা করিয়ে নিল, এর থেকে ভয়াবহ অবস্থা তরুণের জন্য আর কী হতে পারে?

এমন নৃশংস সময়ে, এমন অমানুষদের দম্ভের দিনে মিজানুর রহমানরা এক সুবাতাস। জনগণের নায়ক। জনস্বার্থে করা তাঁদের নিষ্ঠাবান প্রতিবাদকে কলঙ্কিত করার অপচেষ্টাকে বাতিল করতে হবে। তাঁদের একা করে দেওয়া যাবে না, যেমন একা হতে হতে মরে গেল সোনার ছেলে হিমু!

ফারুক ওয়াসিফ: কবি, লেখক ও সাংবাদিক
faruk.wasif@prothomalo.com প্রথম আলোর সৌজন্য

পিএনএস/জে এ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech