ভরা মৌসুমেও ইলিশের আকাল

  


পিএনএস ডেস্ক: ‘মে মাসে ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে আবার জেলেদের মুখে হাসি ফিরবে’ এই আশা নিয়ে বুক বেঁধে থাকলেও দক্ষিণাঞ্চলের ইলিশের প্রধান বিচরণক্ষেত্র মেঘনা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। জেলেরা সারাদিন জাল ফেলেও ২/৪টির বেশি ইলিশ পাচ্ছেন না।

মৎস্য বিভাগের মতে, গত ১ জুন থেকে ইলিশের ভরা মৌসুম শুরু হয়েছে। কিন্তু এখনও নদী থেকে জেলেরা ফিরছেন বিষন্ন মুখে। যেন বন্ধ্যা ভূমিতে পরিণত হয়েছে বিস্তীর্ণ মেঘনা ও বরগুনা-পটুয়াখালী সাগর মোহনা। অপরদিকে সাগরে মাছ ধরায় রয়েছে সরকারী নিষেধাজ্ঞা। তাই জেলেদের আকাল দূর হচ্ছেনা।

জেলেরা মেঘনা ও সাগর মোহনায় জাল বিছিয়েছে। কিন্তু বিধি বাম। মৌসুম শুরুর দু’সপ্তাহ পার হতে চললেও ইলিশের দেখা মিলছে না বরিশালের বদরপুর অংশ থেকে ভোলার চরনিজাম পর্যন্ত প্রায় একশ’ কিলোমিটার বির্স্তীর্ণ মেঘনার বুকে।

বুধবার প্রায় ১৬ ঘণ্টায় দু’বার জাল ফেলে মাত্র চারটি ইলিশ পেয়েছেন হিজলা সংলগ্ন মেঘনার বালুরঘাট মাছঘাটের জেলে শওকত হোসেন। ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ওই দুটি ইলিশের নিলামে দাম উঠে সাড়ে তিন হাজার টাকা।

শওকত হোসেন জানান, গত দু’দিনে চারজন মানুষের খাওয়ার খরচই হয়েছে হাজার টাকার মতো। এখন বেশিরভাগ জেলের একই অবস্থা। ইলিশ ধরা পড়ছে না শুনে জেলেরা মেঘনায় নামছেন না। কেউ কেউ মহাজন, এনজিও এবং মাছঘাট মালিকদের কাছ থেকে ধারদেনা করতে শুরু করেছেন।

সূত্রমতে, চাঁদপুরের দক্ষিণে নীলকমলের শেষ সীমান্তে বিশাল মেঘনার বরিশাল অংশের শুরু বঙ্গেরচর থেকে। ভোলার মনপুরা উপজেলার চরনিজামে গিয়ে মেঘনা মিলেছে বঙ্গোপসাগরে। দীর্ঘ ওই ১০০ কিলোমিটার এলাকায় মেঘনার গভীরতা ও প্রশস্ততায় সবচেয়ে বেশি। বরিশাল, ভোলা, চাঁদপুরের হাইমচর, নোয়াখালীর হাতিয়ার হাজার হাজার জেলের বিচরণ ভূমি মেঘনার ওই এলাকা। দীর্ঘ মেঘনার তীরে গড়ে উঠেছে দুই শতাধিক মাছ ঘাট।

জেলেদের অভিযোগ, প্রভাবশালী মাছঘাট মালিকদের কারণেই মেঘনা এখন ইলিশ শুন্য। দ্রুত টাকার মালিক হতে নিষিদ্ধ মৌসুমে যে হারে জাটকা আর মা ইলিশ ধরা হয়েছে সে কারণেই মেঘনায় এখন আর ইলিশ মিলছে না।

মেঘনার চরকিল্লা, বালুরঘাটসহ প্রায় একডজন মাছ ঘাটের আড়তদার বরিশালের হিজলা উপজেলার নজরুল ইসলাম মিলন জানান, মৌসুমের শুরু থেকেই মেঘনা যেন ইলিশ শুন্য হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়িক সম্মান রক্ষার জন্য লোকসান দিয়ে তিনি মাছঘাটগুলো চালু রেখেছেন। নচোকাঠি মাছঘাটের আড়তদার রাশেদ বেপারী জানান, ইলিশ ধরা না পড়ায় জেলেরা মেঘনায় নামতে চাচ্ছেন না। মৌসুমের শুরু থেকেই মেঘনায় চলছে ইলিশের আকাল।

জেলে নুরুল ইসলাম ও লতিফ রাঢ়ী জানান, জেলেরা ধার-দেনা করে দিন কাটাচ্ছেন। জেলেদের আশা আগামী পূর্ণিমার ঢলে হয়তোবা ইলিশ ধরা পড়তে শুরু করবে।

বরিশালের পোর্ট রোড ইলিশ মোকামের আড়তদার জহির সিকদার জানান, গভীর সমুদ্রে সব ধরনের মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং মেঘনাসহ উপকূলের নদীগুলোতে মৌসুমের শুরু থেকেই ইলিশ মিলছে না। বরিশাল মোকামে বর্তমানে গত বছরের তুলনায় তিন ভাগের এক ভাগ ইলিশও আসছেনা। এ কারণে দামও এখন আকাশচুম্বি। জহির সিকদার বলেন, বর্তমানে কেজি সাইজের ইলিশ পাইকারি বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি এক হাজার পাঁচশ’ টাকা দরে। যা গত বছর বর্তমান সময়ে ছিল এক হাজার টাকা।

বরিশাল জেলা মৎস্য আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক নীরব হোসেন টুটুল জানান, গত বছর ইলিশ মৌসুমের শুরুতে তার আড়তে প্রতিদিন ৩/৪শ’ মন ইলিশ আসতো। এ বছর মৌসুমের শুরু থেকে ৮/১০ মনের বেশি ইলিশ আসছে না।

ভোলা সদরের রামদাসপুর থেকে দক্ষিণে মনপুরার চরনিজাম পর্যন্ত প্রায় ৭০ কিলোমিটার মেঘনা তীরে শতাধিক মাছঘাটের জেলেরা এখন অলস সময় পাড় করছেন। ভোলার খালগোড়া মাছঘাটের আড়তদার আরিফ হোসেন জানান, শুধু ইলিশ কেন; পোমা, আইড়সহ বর্ষা মৌসুমের কোন মাছই তেমন মিলছে না মেঘনায়।

মনপুরার জনতার বাজার মাছঘাটের ব্যবসায়ী আমির হোসেন জানান, জেলেদের খোরপোষ দিয়ে রাখতে হচ্ছে ঘাট মালিকদের।

ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ আজহারুল ইসলাম বলেন, সাগর মোহনা থেকে বিস্তীর্ণ মেঘনায় অসংখ্য ডুবোচর জেগেছে। ফলে ডিম ছাড়ার সময়ে ইলিশের ঝাঁক ডুবোচরে বাঁধা পেয়ে আবার সাগরে ফিরে যাচ্ছে। যে কারণে মেঘনায় ইলিশ মিলছে না। বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা (ইলিশ) বিমল চন্দ্র দাস বলেন, বর্ষা আসতে দেরি হওয়ায় নদীতে ইলিশের দেখা মিলছে না।

ভরা মৌসুমে ইলিশের আকালে দুর্দিন যাচ্ছে বরগুনার ২৫ হাজার জেলে পরিবারে।

দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান ইলিশ মোকাম পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের আড়তদার আব্বাস উদ্দিন ও সেলিম খান জানান, গভীর সাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় জেলেরা মোহনায় ইলিশ ধরছেন। কিন্তু মোহনায় মৌসুমের শুরুতে তেমন ইলিশ ধরা পড়ছে না।

তারা আরও বলেন, বৃহস্পতিবার পাথরঘাটার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ৬৪টি আড়তে মাত্র ১০ থেকে ১৫ মন ইলিশ এসেছে। ওই অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক লে. কমান্ডার এম. ছোলয়মান জানান, ইলিশ ধরা না পড়ায় জেলেদের পাশাপাশি ভালো নেই মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের শ্রমিক, পাইকার, আড়তদার ও ট্রলার মালিকরা।

বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী ও জেলা ট্রলার শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুল মান্নান মাঝি জানান, ভরা মৌসুমে বিষখালি ও বলেশ্বর নদ এবং সাগর মোহনায় ইলিশের আকালে জেলে পরিবারে চরম দুর্দিন যাচ্ছে।

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন