পশুত্ব বাড়ছে, পুরুষত্ব কমছে? : তনু, মিতু, তানিয়া, রূপাকে ভুলে গেছি, এখন চলছে মিন্নি আর নুসরাত এরপর....!

  

পিএনএস (আহদেম জামিল): সাম্প্রতিক সময়ে একশ্রেণীর বিকৃত মানসিকতার যৌন টার্গেটে পরিণত হয়েছে নিজের মেয়ে, পুত্রবধু, শিশু। পাপিষ্টদের কারণে কলঙ্কিত হচ্ছে বাবা, মামা, চাচা, শ্বশুর, শিক্ষক নামগুলো। রাজধানীসহ সারাদেশে ধর্ষণের ভয়াবহ চিত্রের পাশাপাশি ‘আইয়ামে জাহেলিয়াতের’ সময়ের মতো কিছু কর্মকাণ্ড সমাজকে আরও বেশি কুলশিত করছে এই পুরুষ নামের জানোয়ারগুলো। ১৪শ বছর আগের আরব বিশ্বের সেই নরপশুগুলোর সরূপ আজ আমাদের সমাজে আবার দেখা যাচ্ছে। দুর্বৃত্তদের পাশবিকতা থেকে বাদ যাচ্ছে না শিশুরাও।

পশুত্ব বাড়ছে, পুরুষত্ব কমছে?

সেই ধর্ষকরা, জানোয়ার পুরুষ এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর যারা নিজের মেয়ে, পুত্রবধু ও শিশুদের ওপর অমানবিক পাষবিকতা চালায় তারা দেখতে অবিকল মানুষের মতো হলেও এরা আসলে মানুষ নয়, কোনো ধর্মের নয়। সম্প্রতি এরকম নিউজ প্রতিদিনিই গণমাধ্যমে আসছে। আমাদের এই নৈতিক অবক্ষয় কেন হচ্ছে? এর কারণ কি?, সমাধান কি?।

(১৯ জুলাই)খাগড়াছড়ির রামগড়ে মায়ের সহযোগিতায় এক মাদ্রাসা ছাত্রীকে ধর্ষণ করে বাবা। ধর্ষণের সময় সে চিৎকার চেঁচামেচি করতে চাইলে মা তার মুখ চেপে ধরতো। ধর্ষণের কথা প্রকাশ করলে তাকে গলাটিপে হত্যা করে লাশ বস্তায় ভরে মাটিতে পুঁতে ফেলারও ভয়ভীতি দেখাতো তার বাবা। কি ভয়ঙ্কর, কি ন্যাক্কারজনক ঘটনা তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। একটি মেয়ে তার বাবা-মায়ের কাছে যদি নিরাপদ না থাকে তাহলে কোথায় নিরাপদ?

দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলায় পুত্রবধূকে ধর্ষণের দায়ে মো. শফিকুল ইসলাম ছফু (৫০)এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওই পুত্রবধূ নিজের শ্বশুরের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনে চিরিরবন্দর থানায় মামলা করেন। এরকম সারা দেশে প্রতিদিন অহরহ ঘটনা ঘটছে। এক সময় গ্রাম্য শালিসে যে কোনো অনৈতিক বিষয় নিয়ে কঠিন শাস্তির বিধান রেখে শালিস হতো। এখন আর সেই গ্রাম্য শালিসী-বৈঠক তেমন দেখা যায় না। আর দেখা দেলেও যারা শালিস করেন অনেক সময় তাদের নৈতিকতা নিয়েও অনেক প্রশ্ন উঠে।

ঢাকায় মেয়েকে ধর্ষণ করে সৎবাবা আরমান হোসেন ওরফে সুমন। আট বছর ধরে মেয়েকে ধর্ষণ করে আসছিলেন সৎবাবা আরমান। একপর্যায়ে মেয়েটির আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ক্লিপ পাঠিয়ে তাঁর এক বন্ধুকেও হুমকি দিয়েছিলেন তিনি।

প্রতিদিন নিউজে কাজ করতে গেলেই ভারতের কিছু ঘটনা দেখে অবাক হতাম আর বলতাম আজব দেশ ভারত। কি ঘটেনা সেখানে, বাবা মেয়েকে, মামা ভাগ্নিকে, ভাই বোনকে ধর্ষণের ঘটনা অহরহ ঘটেছে। আর এর পিঁছনে কন্যা শিশু হত্যাকে দায়ী করেন ভারতের বিশ্লষকরা।

কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশের চলমান ধর্ষণের ঘটনায় বুঝা যায় আমরাও অমানুষ হয়ে গেছি। আমাদের এখন আর ধর্মীয় এবং সামাজিক নৈতিকতা নেই। আর এই পশুবৃত্তিটাই ঘরের মধ্যে মা-মেয়ে একসাথে ধর্ষিত হচ্ছে, স্কুলে ধর্ষিত হচ্ছে, মাদ্রাসায় ধর্ষিত হচ্ছে, কলেজে ধর্ষিত হচ্ছে, বাসে ধর্ষিত হচ্ছে।

ধর্ষণের আরেকটি ভয়াবহ কারণ হলে প্রযুক্তির অপব্যবহার। এখন সবার হাতে স্মার্টফোন । যার কারণে সহজে যে কোনো বিষয় ভিডিও করা যায়। আর যে কেউ চাইলে সহজে ব্লাকমেইল করতে পারে। হোটেলে জন্মদিনের পার্টিতে ডেকে এনে ধর্ষণ করে ভিডিও করা। বগুড়ার তুফান, ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজউদ্দৌলা ইত্যাদি।

মিডিয়ার কারণে এ সকল ঘটনা কিছু দিন আমাদের বিবেককে জাগালেও আবার নতুন অন্য ঘটনায় আড়াল করে দেয়, নির্মম ও নিষ্ঠুর নির্যাতন ঘটনাগুলো। আর মিডিয়াও তো একটি ঘটনা নিয়ে বসে থাকলে চলবে না। কারণ তাদের কাজ নতুন ঘটনার সন্ধান করা। কিছু দিন আগে ছিল ফেনীর নুসরাত আর এখন চলছে মিন্নি! এর আগে তনু, মিতু, তানিয়া, রূপাকে আমরা ভুলে গেছি। তাতে কি, আমরা ভুলমনা। মানুষ নতুন যা আসবে তা নিয়েই পড়ে থাকবো।

আজ নুসরাত, তনু, মিতু, তানিয়া, রূপা ধর্ষণের শিকার হয়েছে। কাল যে আমার আপনার ঘরে এ রকম ঘটনা ঘটবেনা তার নিশ্চয়তা কতটুকু?

অনেক ঘটনায় সামাজিক সম্মানের কারণে ভুক্তভোগীরা দীর্ঘমেয়াদি বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন।

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা আশ্বাস দিয়েছেন, ধর্ষণ প্রতিরোধে যা যা করার দরকার সরকার তাই করবে।তিনি বলেছেন, কেবল নারীরাই চিৎকার করে যাবে নাকি? এ ব্যাপারে পুরুষদেরও সোচ্চার হওয়া উচিত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একজন নারী সংসদের মাননীয় স্পিকার একজন নারী। তাই নারীর সম্মান বাঁচাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীই এখন একমাত্র ভরসা। এখনই প্রয়োজন দ্রুত কঠিন আইন তৈরি করে এর প্রতিরোধ করা।

গাজীপুরের ধর্ষিতা শিশুকন্যার অসহায় বাবা মেয়েকে নিয়ে ট্রেনের তলায় আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। কারণ, এই অসহায় বাবা বুঝতে পেরেছিলেন, যাঁরা তাঁর কন্যাকে ধর্ষণ করেছে, তারা ক্ষমতার জোরে আইন ও পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে। আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা লোকের সংখ্যা যত বাড়তে থাকবে, সমাজে তত বেশি পাশবিক, লোমহর্ষক ও বর্বর অপরাধের ঘটনা বাড়তে থাকবে। সামনে এরকম হাজারো অসহায় বাবা-মা আত্মাহুতির ঘটনা ঘটতে পারে।

মধ্যযুগীয় কায়দায় প্রেমিকাকে গণধর্ষণের পর হত্যা করে প্রেমিক আজির উদ্দিন। নির্মম ও নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়ে এভাবেই খুন করা হয়েছে সিলেটের কানাইঘাটের তরুণী ফরিদা বেগমকে। এই বিচারগুলো জনসম্মুখে হলে আজ হয়তো নুসরাত, তনুর মতো ঘটনা আর ঘটতো না।

‘২০১৯ সালের ১৫ মে পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার ৪১৯ জন। এর মধ্যে ২৯৬ জনই শিশু’।
বিজ্ঞজনেরা মনে করেন, অজ্ঞতার কারণে আর বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অনেকেই আদালত বা পুলিশের দোড়গোড়ায়া পৌঁছাচ্ছেন না। ফলে এসব অপরাধ ঘটছেই। " অনেক শিশু বা অভিভাবকই জানে না কোথায় অভিযোগ জানাতে হয়। আর অনেকে দেখছেন অনেক নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে কিন্তু বিচার তো হচ্ছে না। বাইরে মিটমাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। অনেক দেশে কিন্তু দ্রুত বিচার আইনে সাজা হয় এবং মানুষ তা দেখে সচেতন হয়"। দেশে এখন প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষার উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া। দ্রুত বিচার আইন বাস্তবায়ন করা।

একটা গল্প বলে শেষ করতে চাই। একবার এক পাগলীকে গ্রামের এক মাতব্বর ধর্ষণ করল। পরের দিন সেই পাগলী গ্রামের সকল মানুষের কাছে গিয়ে বলছে, মাতব্বর আমাকে ধর্ষণ করেছে, মাতব্বর আমাকে ধর্ষণ করেছে। মাতব্বর এ কথা শুনে বিব্রত হয়ে পাগলীকে গিয়ে জুড়ে একটি লাথি মারল। এর পর পাগলী আবার গ্রামে গ্রামে গিয়ে বলতে শুরু করল মাতব্বর ধর্ষণের পর আবার লাথি মারল, ধর্ষণের পর আবার লাথিও মারল। মাতব্বর আরও বিব্রত হয়ে রাগে এবার একটি থাপ্পর মারল। পাগলী গ্রামে গ্রামে গিয়ে আবার বলতে শুরু করল মাতব্বর লাথ্তির পর এবার থাপ্পরও মারল, লাথ্তির থাপ্পর মারল। পাগলী মেমরিতে দুটির বেশি ঘটনা মনে রাখতে পারতো না। সবাই এখন ধর্ষণের ঘটনা ভুলে গেল আর মাতব্বর পেল স্বস্তি। তনু, মিতু, তানিয়া, রূপাকে ভুলে গেছি, নুসরাত আর মিন্নি মনে আছে এরপর......!

[সাংবাদিক, জামিল আহমদ মোহন zamild2k@yahoo.com]



 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech