‘কিশোর গ্যাং’ দমনে হার্ডলাইনে সরকার

  

পিএনএস ডেস্ক : ‘গ্যাং কালচারের’ নামে সারা দেশে কিশোরদের একটি অংশ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। তারা দলবেঁধে মাদক সেবন করার পাশাপাশি পাড়া-মহল্লায় নারীদের উত্ত্যক্ত করে। ঝুঁকিপূর্ণ বাইক ও কার রেসিং তাদের ‘ফ্যাশন’।


আধিপত্য বিস্তার আর কথিত ‘হিরোইজম’ দেখাতে গিয়ে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধে জড়ায় তারা। এতে ঘটছে খুনোখুনির ঘটনাও। ‘ভার্চুয়াল’ জগতে ‘সিক্রেট গ্রুপ’ তৈরি করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করছে গ্যাংয়ের সদস্যরা। সেখানে ভয়ঙ্কর ‘সিক্রেট মিশনের’ খুঁটিনাটি বিষয়েও আলোচনা করছে। এসব কিশোর গ্যাংয়ের রয়েছে বাহারি সব নাম।

বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের এমন লাগামহীন দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষ। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কিশোর অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে কঠোর পদক্ষেপ (হার্ডলাইন) নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সরকারের সংশ্লিষ্টরা। এরই অংশ হিসেবে ‘বিশেষ অভিযান’ শুরু হয়েছে।

শনিবার রাজধানীর মিরপুরে পুলিশ স্টাফ কলেজের কনভেনশন হলে এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, সারা দেশে কিশোর গ্যাংয়ের আবির্ভাব হয়েছে। এ বিষয়ে নিরাপত্তা বাহিনী যথেষ্ট সজাগ আছে। অভিভাবকদের অনুরোধ করব, ছেলেমেয়েরা কে কী করছে লক্ষ্য রাখুন। কিশোর গ্যাংয়ে কেউ যেন সম্পৃক্ত হতে না পারে সজাগ থাকুন।

একইদিন রাজধানীর লালবাগের হোসনি দালান ইমামবাড়ায় পবিত্র আশুরা উপলক্ষে নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শনে গিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘অভিযান চালিয়ে ঢাকায় কিশোর গ্যাংসহ অন্য সব গ্যাং নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হবে। কোনো কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব থাকতে দেয়া হবে না। ঢাকায় কোনো গ্যাং থাকবে না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নেহাল করিম মনে করেন, বিপথগামিতা থেকে উত্তরণের উপায় হচ্ছে বাবা-মায়ের তীক্ষè নজরদারি। অভিভাবকদের দুর্বল তত্ত্বাবধানের কারণে কিশোররা অপরাধের দিকে ঝুঁকছে। প্রতিটি বাবা-মাকে তার সন্তান সম্পর্কে সচেতন হওয়া উচিত। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, কোথায় সময় কাটাচ্ছে, এ বিষয়ে বাবা-মায়ের খবর রাখতে হবে। অস্বাভাবিক কিছু নজরে এলে তাকে (কিশোর) কাউন্সিলিং করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, কিশোর অপরাধ দমনের চূড়ান্ত দাওয়াই হচ্ছে অভিভাবকদের সচেতনতা। প্রতিদিন অন্তত একটা সময় হলেও পরিবারের সবাই এক টেবিলে বসে খাবার খাওয়া উচিত। এতে ভাবের আদান-প্রদান হয়। সন্তানদের চাহিদা সম্পর্কে জানা যায়।

পুলিশের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সারা দেশে বছরে কিশোর অপরাধ সংক্রান্ত ৫ শতাধিক মামলা হচ্ছে। তবে সম্প্রতি মামলার সংখ্যা কিছুটা কমলেও বেড়েছে কিশোরদের অপরাধের ধরন। প্রতি বছর হত্যা ও ধর্ষণ সংক্রান্ত ২ শতাধিক ঘটনায় জড়িত কিশোররা। শুধু নগরী নয়, গ্রামগঞ্জের পাড়া-মহল্লাতেও বিস্তার ঘটছে কিশোর অপরাধের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাওয়ার বয়েজ, ডার্ক শ্যাডো, নাইন স্টার, স্টার বন্ড এমন নানা ধরনের ফিল্মি সব নামে সারা দেশে কিশোর গ্যাং গ্রুপ গড়ে উঠেছে। খোদ রাজধানীতেই রয়েছে শতাধিক গ্রুপ। এসব গ্রুপে সহস াধিক সদস্য রয়েছে। একেকটি গ্রুপে সদস্য সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ জন। তাদের অধিকাংশের বয়স ১৫ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। এ দলে স্কুল থেকে ঝরে পড়া কিশোরের সংখ্যাই বেশি। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে হত্যা, মাদক চোরাচালানের মতো বড় ধরনের অপরাধের পরিকল্পনা করে এদের কেউ কেউ। এছাড়া মাদক সেবন, মাদক ব্যবসা, চুরি-ছিনতাইয়ের পাশাপাশি পরিকল্পিত হত্যা, সহপাঠীকে অপহরণের পর মুক্তিপণ দাবি, এমনকি ধর্ষণের ঘটনায় জড়িয়ে পড়ছে তারা।

র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম বলেন, বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই, মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে কিশোর গ্যাংগুলোর সংশ্লিষ্টতা মিলছে। এই গ্যাংয়ের নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে মাদক এবং ছিনতাইও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।

খুনোখুনি : রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা দেয়ালে তাদের গ্রুপের নাম লিখে জানান দেয়। শুধু দেয়ালে নয়, ভার্চুয়াল জগতেও নিজেদের গ্রুপ নিয়ে তারা প্রচারণা চালায়। তারা তুচ্ছ ঘটনায় খুনও করে। গত বুধবার রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আধিপত্য বিস্তার এবং মেয়েকে কেন্দ্র করে কিশোর মহসিন খুন হয়।

এ ঘটনায় জড়িতরা সবাই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। এর আগে ৩১ আগস্ট লালবাগ কেল্লা এলাকায় ঢোল বাজানোকে কেন্দ্র করে ছুরিকাঘাতে খুন হয় কিশোর রনি হাসান। এ ঘটনায় পুলিশ ২ সেপ্টেম্বর ৮ কিশোরকে গ্রেফতার করে। এদের সবার বয়স ১৮ বছরের কম। এর আগে গত বছর একই এলাকায় গ্যাংয়ের হাতে খুন হন কিশোর সিজান ওরফে বক্সার। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে রাজধানীর উত্তরায় ডিসকো গ্যাং এবং বিগবস গ্যাংয়ের সদস্যরা নাইন স্টার গ্যাংয়ের সদস্য কিশোর আদনানকে হত্যা করে। ওই ঘটনাটি সারা দেশে আলোচিত হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, গত ১৫ বছরে সারা দেশে কিশোর গ্যাং কালচার এবং সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে ৮০ জনেরও বেশি কিশোর খুন হয়েছে। কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে না। তাদের কিশোর সংশোধনাগারে পাঠাতে হয়।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, গ্যাং কালচার রুখে দিতে রাজধানীসহ সারা দেশে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছে পুলিশ। সর্বশেষ শুক্রবার হাতিরঝিল থেকে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত ১০৩ জনকে আটক করে পুলিশ। পরে এসব কিশোর এবং তাদের অভিভাবকদের সতর্ক করে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে কিশোরদের সংশোধনাগারে পাঠানো হচ্ছে। ছোট অপরাধের ক্ষেত্রে সতর্ক করে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেয়া হচ্ছে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম বলেন, এরই মধ্যে অভিযান পরিচালনা করে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনেছি। আমরা বিভিন্ন স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে সবাইকে সচেতন করার চেষ্টা করছি।

পিএনএস/জে এ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech