আসাম সীমান্তে শতভাগ আগাম প্রস্তুতি সময়ের দাবি

  

পিএনএস (মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম প্রধান) : আসাম নিজ দেশের নাগরিকদের সঙ্গে যারপরনাই অসৌজন্যমূলক আচরণ করছে। তাদের জন্মগত অধিকার ও নাগরিকত্ব নিয়ে নানা রকম ছলছাতুরির আশ্রয় নিয়েছে। ফলে বর্তমানে আসামের ১৯ লক্ষাধিক নাগরিক নিজ দেশে পরবাসীর মতো জীবন যাপন করছে। তাদের ১২০ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে আপিলের জন্য, যা সম্পূর্ণ হাস্যকর।

এনআরসি তালিকায় নাম নেই সাবেক অনেক শীর্ষ ব্যক্তিত্বের। যেমন নাগরিকত্ব নেই সাবেক এমপির, সাবেক প্রেসিডেন্টের স্বজনদের! নেই সাবেক সেনা কর্মকর্তার! যারা আগ বাড়িয়ে এটি করছে, তাদের ছাড়া আর সবার কাছে এটিকে তুগলকি কাণ্ড মনে হচ্ছে। সবাই এমন কথা শুনে কেবলই অবাক হচ্ছে। আর ভাবছে এটা কী করে সম্ভব! এ যে পাগলামী।

সার্বজনীন মানবাধিকার সনদের অনুচ্ছেদ ১৫ অনুযায়ী, ‘প্রত্যেক মানুষের একটা জাতীয়তার অধিকার রয়েছে।’ প্রতিটি দেশের নিজস্ব আইনের আলোকে মানবাধিকারের ওই সনদের প্রতি দায়বদ্ধতা রয়েছে। ‘নাগরিকত্ব’ বিষয়ে কোনো রাষ্ট্র এমন কোনো অভ্যন্তরীণ কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে না, যা মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক ওই অগ্রগতিকে পিছিয়ে দেয়। আসামে যা বর্তমানে শতভাগ উপস্থিত।

মানবাধিকার সনদের ‘অনুচ্ছেদ ১৫’কে বিবেচনা করা হয় রাষ্ট্রের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের নির্দেশনা হিসেবে। এই অনুচ্ছেদ ধরে নেয়, প্রত্যেকের অন্তত একটি দেশে নাগরিকত্ব থাকবে। এই বিবেচনায় কারো রাষ্ট্রবিহীন হওয়া বা কাউকে রাষ্ট্রবিহীন করা অন্তর্নিহিতভাবেই মানবাধিকারের জন্য বিপর্যয়কর। এটা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। অথচ সে অনুচিত কাজটা করতে যাচ্ছে আসামের রাজ্য সরকার।

১৯৬১ সালে জাতিসংঘ গ্রহণ করে ‘কনভেনশন অন দ্য রিডাকশন অব স্টেইটলেসনেস’। আন্তর্জাতিক এই সনদ অনুযায়ী, প্রতিটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে এটা দেখা যে, মানুষ যাতে রাষ্ট্রবিহীন না হয়ে পড়ে। আর আসামে ঘটছে উল্টোটা। আসামের ঘটনাবলি বিভিন্ন মানবাধিকার সনদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যদিও ভারতের সংবিধানের ৫১ (গ) অনুচ্ছেদ ‘আন্তর্জাতিক আইনি সনদসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা’র কথাই বলা আছে। আর এই হলো শ্রদ্ধার নমুনা!

ভারতীয় সংবিধানের ‘অনুচ্ছেদ ২১’-এ ‘ব্যক্তি’র জীবনের অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতার নিশ্চয়তা রয়েছে। কিন্তু আসামে নথিপত্র চূড়ান্ত পরীক্ষা না করেই ভোটার তালিকায় বেছে বেছে কিছু মানুষকে ‘সন্দেহজনক’ চিহ্নিত করে তাদের নাম পাঠানো হয়েছে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে। সেখানে অনেকেই ‘বিদেশি’ সাব্যস্ত হচ্ছেন। এভাবে লাখ লাখ লোক চরম এক মর্যাদাহানিকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন। ফলে অনেকে আত্মহত্যাও করছেন। এনআরসির কারণে গ্লানিবোধকারী ৫৭ জন আত্মহত্যা করেছেন। মূরত ভারতে মানবাধিকারের এটাই হলো বাস্তবতা।

নাগরিকত্ব নিয়ে নৈরাজ্যকর কাজটা মূলত রাজ্য সরকারের একার নয়। এটা কেন্দ্রের চাপিয়ে দেওয়া খড়্গ। যে খড়গের কবলে পড়ে আসামের ১৯ লক্ষাধিক নাগরিক আজ দেশ ও নাগরিকত্বহীন অবস্থায়। যাদের জন্ম ও ঠিকানা মূলত আসামে। এদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে তাদের দেশহীন করার যে ষড়যন্ত্র চলছে, এর পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র কাজ করছে বলে মনে করেন সামরিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সংঘবদ্ধ ছাড়া নাগরিকরা কখনো রাষ্ট্রশক্তির সঙ্গে পেরে উঠে না।

বাংলাভাষীদের বাংলাদেশী হিসেবে যারা প্রমাণ করতে চায়, তারা ঐতিহাসিক দিকগুলো ভুলে যেতে পারে, কিন্তু দালিলিক প্রমাণগুলো অস্বীকার করবে কীভাবে? সিলেটের কাছে ত্রীপুরার কিছু অংশ আর রংপুরের পাশের আসামের কিছু অংশ রয়েছে। এসব অঞ্চলে এক সময় চা ও তামাকের ব্যাপক চাষ হতো। ১৯০৫ সালে ঐতিহাসিক ভাগাভাগির পর সেখানে বসতি ছিল এসব চাষের সঙ্গে যুক্তদের। যাদের অধিকাংশের ভাষা বাংলা। তাই বলে তারা বাংলাদেশী? এটা হঠকারিতা বৈকি।

কদিন আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আজ বিএনপি মহাসচিব স্পষ্ট করে বলেছেন, স্বাধীনতার পর কোনো বাংলাদেশী ভারতে তথা আসামে যায়নি। এক ও অভিন্ন বক্তব্য দেশের সর্বস্তরের সচেতন জনগোষ্ঠীর। আশার কথা, বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্যের পর এটা স্পষ্ট যে, আসামের নাগরিকদের ছলেবলে কৌশলে যারা বাংলাদেশী প্রমাণের অপচেষ্টা চালাচ্ছে, এর বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে বাংলাদেশের সবাই একাট্টা। এ মূহূর্তে যা খুব বেশি দরকার।

শুধু যুগ যুগ নয়, অর্ধশতাব্দীও নয়; শত বছর ধরে যারা আসামে বসবাস করছেন, কূটকৌশলের মাধ্যমে তাদের বাংলাভাষী ও বাংলাদেশী আখ্যা দিয়ে তাদের নাগরিকত্বহীন করার অপচেষ্টা কখনো ফলপ্রসূ হতে পারে না। কারণ অপরিণাদর্শী এসব কাজের পেছনে অপকৌশল ও ষড়যন্ত্র রয়েছে। আর অপকৌশল ও ষড়যন্ত্র থাকলে সেটা কখনো ভালো ফল বয়ে আনে না।

এ মুহূর্তে বাংলাদেশকে যা করতে হবে, সেটা হলো দ্রুত আসাম সীমান্তজুড়ে শক্ত ও মজবুত কাঁটা তারের ডাবল বেড়া নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি পাহারা বাড়াতে হবে কয়েকগুণ। অবৈধভাবে, অপকৌশলে, অনিয়ম করে আসামের কোনো নাগরিককে কোনোভাবেই যেন বাংলাদেশে পুশ ইন করাতে না পারে, সে ব্যাপারে শতভাগ আগাম প্রস্তুত থাকতে হবে। যে জন্য এখন থেকেই আসাম সীমান্তকে নিরাপদ করা সময়ের দাবি।

প্রতিবেদক : বিশেষ প্রতিনিধি- পিএনএস

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech