ট্রাফিক সিগন্যালিংয়ে কেবলই অপচয়

  


পিএনএস ডেস্ক: রাজধানীর ট্রাফিক সিগন্যালিং উন্নয়ন ও স্থাপনে শুধু অর্থ খরচই হচ্ছে গত এক দশক ধরে। কিন্তু সিগন্যালিংয়ের কোনো কার্যকারিতা নেই। সত্তরটি ট্রাফিক সিগন্যালে বসানো হয়েছিল সময়নির্দেশক (টাইমার)। সেই মরা ট্রাফিক সিগন্যালকে কার্যকর করতে কয়েক দফায় এ পর্যন্ত প্রায় ৬৪ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। এসব টাকা পানিতে বিসর্জন দেয়া হয়েছে। ট্রাফিক সিগন্যালগুলো শুধু খাম্বার মতো দাঁড়িয়েই আছে। পুরো ঢাকা সিটিতে ৩ শ’টি ইন্টারসেকশনের মধ্যে মাত্র ৮টি সক্রিয় আছে। এখন আবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) নতুন ও পুরনো মিলে ৯৫টি সিগন্যাল উন্নয়নে প্রায় ৩০ কোটি টাকা খরচের প্রস্তাবনাসহ ৩১৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে পরিকল্পনা কমিশনের কাছে। এ ব্যাপারে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ জানান, আমাদের এ ক্ষেত্রে দক্ষ প্রকৌশলী ও জনবলের অভাব। পরিকল্পনা নেয়ার আগে দুই সিটি করপোরেশনের উচিত ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ট্রাফিক) সাথে সমন্বয় করা। সবার সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া এটা সম্ভব না।

ঢাকা উত্তর সিটির প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, এই সিটি করপোরেশন এলাকার ট্রাফিক অবকাঠামো উন্নয়নসহ সড়ক নিরাপত্তায় ৩১৭ কোটি ৭৯ লাখ ১৬ হাজার টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব দেয়া হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের কাছে। বলা হয়েছে, অনুমোদন পেলে আড়াই বছরে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। এই প্রকল্পের আওতায় কাজগুলোর অন্যতম হলো, সড়কের ইন্টারসেকশনের উন্নয়নের মাধ্যমে যান-চলাচল সহজীকরণ, সড়কের ইন্টারসেকশনে ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি স্থাপনের মাধ্যমে ট্রাফিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ করা, ট্রাফিক সাইন স্থাপন, ৪০টি নতুন সিগন্যাল নির্মাণ ও ৪৫টির উন্নয়ন করা।

জানা গেছে, আগে যেসব সিগন্যাল ছিল তা অস্ট্রেলিয়ার টাইকো কোম্পানি থেকে আমদানি করা হয়েছিল। সেগুলো দীর্ঘসময় সচল ছিল। কিন্তু পরে যেসব সিগন্যালিং যন্ত্রপাতি বিভিন্ন প্রকল্পে আমদানি করে ইনস্টল করা হয় সেগুলো ছিল ভারতীয়, যা অকেজো হয়ে পড়ে আছে। এখন যেগুলো সচল আছে এবং স্থাপনপ্রক্রিয়া চলছে এগুলো চীন থেকে আমদানি করা হয়েছে। বর্তমানে ৮টি সক্রিয় আছে।

ডিএনসিসির প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, তাদের আওতায় প্রায় এক হাজার ৩৪০ কিলোমিটার সড়ক নেটওয়ার্ক রয়েছে। প্রধান সড়কসহ অন্যান্য শাখা সড়কগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণ নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনার অবকাঠামোগুলো যথা- সড়ক মিডিয়ান বা ডিভাইডার, জেব্রা ক্রসিং, মিডিয়ানের গ্রিল ফেন্সিং, রোড সারফেস মার্কিং, ফুটপাথ, সড়ক ইন্টারসেকশনগুলোতে ট্রাফিক সিগন্যাল ইত্যাদি অপ্রতুল। ফলে ট্রাফিক জ্যাম হয়। এখন ৪০টি নতুন করে ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা স্থাপনের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ কোটি ৮৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। প্রতিটির জন্য ব্যয় হবে ৩২ লাখ ৯ হাজার টাকা। আর ৪৫টি বিদ্যমান ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য ব্যয় ধরা হয় ৫ কোটি ৪০ লাখ ১৬ হাজার টাকা। এখানে প্রতিটির উন্নয়নব্যয় ১২ লাখ টাকা। আর ৩৮টি সড়ক ইন্টারসেকশনের উন্নয়ন খরচ ১১ কোটি ৫০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। যেখানে প্রতিটিতে ব্যয় হবে ৩০ লাখ ২৮ হাজার টাকা।

সরেজমিন দেখা যায়, এর আগে রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সত্তরটি ট্রাফিক সিগন্যালে সময় নির্দেশক (টাইমার) স্থাপন করেছিল দুই সিটি করপোরেশন। সেগুলো কাজে লাগানোর জন্য কয়েকবার উদ্যোগও নেয়া হয়। বনানী থেকে শাহবাগ পর্যন্ত সড়কে টাইমার ব্যবহার করতে গিয়ে যানজট চরমে গিয়েছিল। বর্তমানে ওই সড়কে ব্যস্ততম সময়ে টাইমারের কোনো কার্যকারিতা নেই। সবই এখন ঘুমন্ত। আর শহরের অন্যান্য স্থানের টাইমারগুলো ব্যবহারই করা হয়নি। সেগুলোর বেশির ভাগ নষ্ট হয়ে গেছে। ভেঙে পড়ে আছে। এখন ট্রাফিক পুলিশের বাঁশি ও হাতের ইশারাতেই চলছে যানচলাচল নিয়ন্ত্রণ। ফলে ওই প্রকল্পের ১৬ কোটি টাকা পানিতেই।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০০২ সালে ১১ কোটি টাকা খরচ করে ট্রাফিক সিগন্যাল চালুর উদ্যোগ নেয় ডিসিসির ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট (টিইডি)। কিছু এলাকায় এটা কাজে এলেও অনেক এলাকায় সিগন্যাল মেনে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ ২০০৯ সালে কেইজ প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়। টাইমারের বিদ্যুতের সংস্থানের জন্য ওই পয়েন্টগুলোয় যুক্ত করা হয় একটি করে সোলার প্যানেল। কিন্তু ব্যবহার না হওয়ায় সেগুলো এখন অকেজো। তার পরও কয়েকটি সিগন্যালে টাইমার স্থাপিত হয়নি। টিইডি থেকে এ কাজ করার কথা থাকলেও করা হয়েছে কেইজ প্রকল্প থেকে। এরপর ২০১১ সালে ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে আবার প্রকল্প নেয়া হয়।

ডিটিসিএ সূত্র বলছে, ব্যবহারের আগেই অনেক টাইমার বিকল হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিশ্বের বড় বড় শহরে টাইমারই ব্যবহৃত হয়। ঢাকায় কয়েকটি পয়েন্টে চালুর পর অবস্থা হিতে বিপরীত হয়েছিল। কারণ টাইমারের সময় নির্ধারণটা সঠিকভাবে হয়নি। আবার একসাথে সব ক্রসিংয়ের টাইমার চালু না করলে এর সুফল পাওয়া যাবে না।

ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মফিজ উদ্দিন আহম্মেদের কাছে ফোনে গতকাল জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, তিনটি কারণে আমাদের এসব ট্রাফিক সিগন্যালিং সচল থাকে না। প্রথমত: এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ ও দক্ষ প্রকৌশলী নেই সিটি করপোরেশনের। টেকনিক্যাল এক্সপার্ট নেই। এরপর, এসব কাজের জন্য অভিজ্ঞ ও দক্ষ কোনো ঠিকাদার নেই। যার কারণে সেগুলো ইনস্টল করার পরও কাজ করে না। দ্বিতীয়ত: বাস্তবতার সাথে মিল রেখে ইনস্টল করা দরকার। তার মতে, অনেক আগে অস্ট্রেলিয়ার টাইকো কোম্পানি থেকে আনা সিগন্যালিংগুলো অনেক বছর সক্রিয় ছিল। পরে যখন যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন করা হয়, সেগুলো মানসম্পন্ন ছিল না। ফলে সেগুলো কাজ হয়নি। পরে যেসব স্থাপন করা হয় সেগুলো ছিল ইন্ডিয়ান, যা কাজ করছে না।

তিনি জানান, ডিএমপিতে তাদের বিভাগে এসবের জন্য ৩৯ জন অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দেয়ার জন্য একটি জনবল কাঠামো করা হয়েছে। এখন নীতিমালা অনুমোদন হলেই ওইসব জনবল নিয়োগ দেয়া হবে। এতে করে ডিএমপির ট্রাফিক শাখা অনেক দক্ষ জনবল পাবে। এতে এসব ট্রাফিক সিগন্যালকে ইনস্টল ও পরিচালনা করা সম্ভব হবে। তিনি জানান, মিরপুর রোডের আজিমপুর থেকে গাবতলী পর্যন্ত ১৩টি ইন্টারসেকশনের কাজ চলমান আছে। শিগগিরই এগুলো চালু করা হলে সড়কে যানচলাচলে একটা সুন্দর শৃঙ্খলা আসবে। আর যে আটটি সক্রিয় আছে বর্তমানে সেগুলো হলো, বিজয় সরণি, হাতিরঝিল, গুলশান-২, মগবাজার, মালিবাগ ও শান্তিনগর।

সুজন সম্পাদক অধ্যাপক ড. বদিউল আলম মজুমদারের মতে, ঢাকা সিটি করপোরেশন, ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ) এবং ট্রাফিক পুলিশের মধ্যে একটা সমন্বয় দরকার। এটা ছাড়া এসব প্রকল্প নেয়াটা হবে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়। এ পর্যন্ত এ খাতে যে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে সবই পানিতে গেছে। কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ও মহলকে কাজ দেয়ার জন্যই এই ধরনের প্রকল্প প্রস্তাবনা।

নগরবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কাজের সাথে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনও রয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা সিটি করপোরেশন, ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ) এবং ট্রাফিক পুলিশের মধ্যে একটা সমন্বয় দরকার। এটা ছাড়া এসব প্রকল্প নেয়াটা হবে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়। ট্রাফিক সিগন্যালিং ব্যবস্থার সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্য যারা সংশ্লিষ্ট তাদের মধ্যে একটা সমন্বয় থাকা উচিত। সেটা না হলো প্রকল্প নিয়ে কোনো কাজ হবে না। আমরা ডিজিটালাইজেশনের বিরুদ্ধে নই। আগের প্রকল্প যখন ব্যর্থ হলো তখন আমরা দেখলাম ট্রাফিক পুলিশের মধ্যে একটা স্বস্তি। যদি সমন্বয় ও সচেতন করা না যায়, তাহলে শুধু ডিসিসি বা ট্রাফিক পুলিশের একার পক্ষে এই পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। -নয়া দিগন্ত

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন