পানির দরে বিক্রি হচ্ছে কোরবানির গরু

  

পিএনএস ডেস্ক: বছরে দু-একটা গরু পুষে তা ঈদুল আজহার আগে স্থানীয় ব্যাপারীদের কাছে বিক্রি করে দেন শেরপুর জেলার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম। যা লাভ হতো, তাতেই সন্তুষ্ট থাকতেন নজরুল ইসলাম। তবে তার এলাকার অনেককে প্রতিবছর ঢাকায় গরু নিয়ে আসেন এবং ভালো দামে বিক্রিও করে থাকেন। স্থানীয়দের দেখাদেখি নজরুল ইসলামও গত বছর ছয়টি গরু পোষেন। ভালো দামের আশায় গত সোমবার নজরুল ছয়টি গরু ট্রাকে নিয়ে ঢাকার আফতাবনগর গরুর হাটে আসেন।

আফতাবনগর হাটেই আজ বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বিকেল চারটার দিকে কথা হলো নজরুলের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘এই প্রথমবার ঢাকায় গরু নিয়ে এলাম। কিন্তু বাজার খারাপ। গরুর পেছনে যে খরচ হয়েছে, সেই টাকাই মনে হয় উঠবে না। গরু যে পাললাম, যেভাবে দাম পাওয়ার কথা, সেভাবে দাম হলো না। আমাদের ওদিকে বন্যা হয়েছে। আমাদের ওখানে বেচাকেনা হচ্ছে না। পাইকার নেই। নিরুপায় হয়ে ঢাকায় আসলাম। এখানেও দেখি একই অবস্থা। আজ দুটি গরু বিক্রি করেছি। কিন্তু লসে।’

এমন বহু নজরুলের মাথায় হাত! রীতিমতো পানির দরে বিক্রি হচ্ছে কোরবানির গরু।

ঢাকার উত্তরার বৃন্দাবন হাটে সোয়া ৩ লাখ টাকায় একটি গরু বিক্রি করে বেপারী আবদুর রহিম আফসোস করছিলেন এই বলে, “২৫ হাজার টাকা লস খাইলাম।”

৮-৯ মণ ওজনের এই হরিয়ানা গরুটি কিনেছেন উত্তরা-৭ সেক্টরের বাসিন্দা আনিসুর রহমান। রহিম দাম হেঁকেছিলেন ৫ লাখ টাকা। কিন্তু আনিসুর আড়াই লাখ টাকা বলেন। তুমুল দরাদরির পর সোয়া ৩ লাখ টাকায় দফারফা হয়।

আনিসুর রহমান চলে যাওয়ার পরে বেপারি রহিম বলেন, “আমার গরুটা কি না ছিল সাড়ে ৩ লাখ টাকায়। “

তাহলে লোকসানে বিক্রি করলেন কেন- এ্ই প্রশ্নে তিনি বলেন, “কী করমু? গরু তো আর ফিরায়া নিতে পারমু না। এইবার সব গরুই প্রায় লস দিয়া বেচন লাগব।”

শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলা থেকে রহিমের মতো রাজধানীর অন্যান্য হাটে গরু নিয়ে আসা বেপারিরাও বলছেন, তারা এবার বড় ক্ষতির মুখে।

এই বেপারীরা গরু কিনে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ঢাকায় আনেন বিক্রির জন্য। বিক্রি না হলে সেগুলো ফেরত নিতে হলেও ট্রাক ভাড়া যায় অনেক, ফলে বিক্রি করে টাকা নিয়ে যাওয়াই তাদের লক্ষ্য।

করোনাভাইরাস মহামারীকালে অর্থনৈতিক সঙ্কট কিংবা স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়াতে এবার ঢাকায় কোরবানি অনেকেই দিচ্ছেন না, ফলে গরু বিক্রিতে নেমেছে ধস।

বৃন্দাবন হাটে ফরিদপুর থেকে আসা বেপারি মো.হাশেম বলেন, “আমি একটা দেশি গরুর দাম চাইলাম ৮০ হাজার টাকা, দাম কইল ৪০ হাজার টাকা। গৃহস্থের ঘর থেকে গরুটা কিনতেও তো ৬০ হাজার টাকা লাগব। শেষ পর্যন্ত লসেই বেচা লাগব। কী আর করমু।”

বৃন্দাবন হাটে কুষ্টিয়ার প্রাগপুর গ্রাম থেকে আসা বেপারী সিরাজুল ইসলাম জানান, গত শুক্রবার ৫টি দেশি গরু নিয়ে হাটে এলেও আজ ৪টা পর্যন্ত একটিও বিক্রি করতে পারেননি।

তিনি বলেন, “আমি দাম বলি, ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা … আরা যারা কিনতে আসে তারা দাম কয় ৫০ হাজার, ৬০ হাজার টাকা। এত কম দামে গরু ছাড়া যায়?

“যদি এমন অবস্থা হয়, একটা গরুও বিক্রি করতে পারছি না, ফিরায়া নিয়া যাব। কিন্তু এত কমে না।”

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থেকে আসা বেপারি কদম আলী ১২টি ষাঁড় নিয়ে এসেছিলেন বৃন্দাবন হাটে। আজ পর্যন্ত তিনি চারটি বিক্রি করতে পেরেছিলেন।

কদম বলেন, যেসব ষাঁড় তিনি ১ লাখ ২০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করতে চেয়েছিলেন, সেগুলো বিক্রি করতে হয়েছে ৭০ হাজার টাকায়।

দেশি আবাল, দেশি শাহীওয়াল ক্রস, এরে- তিন ধরনের ৬০টি গরু নিয়ে পোস্তগোলা শ্মশান ঘাটের কোরবানির হাটে এসেছিলেন কুষ্টিয়ার বেপারী মাসুদ রানা।

তিনি বলেন, “বহু জন এসে দাম জিজ্ঞাসা করে চলে গেছে। কিন্তু কেউ কিনতে চায় না। একটা গরুও বিক্রি করতে পারিনি। কী করব আর! গরু মনে হয় ফিরায়ে নিয়ে যাব।’

পোস্তগোলা হাটে আসা কুষ্টিয়ার মোহাম্মদ মহসিন বলেন, “১০-১২টা গরু আনছিলাম। কিন্তু বিক্রি হয়েছে মাত্র ৩টা। লাখের গরু ছাড়তে হইছে ৭০-৮০ হাজার টাকায়।”

উত্তরার বৃন্দাবন হাটের সায়িমা ডেইরি ফার্মের মালিক শামসুদ্দীন টগর বলেন, “২০০০ সাল থেকে গরুর ব্যবসা করছি। কিন্তু এমন খারাপ অবস্থা আর কখনও আসেনি।

“৪-৫ দিন হাটে আসছি, একটা গরুও বিক্রি করতে পারছি না। এবার ব্যবসা পুরোটাই লস বলা চলে। করোনাভাইরাস ধসিয়ে দিল এবারের ব্যবসা।”

অথৈ অ্যাগ্রো অ্যান্ড ফিশারিজের জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “২৮টি গরু নিয়ে এসেছিলাম। মঙ্গলবার পর্যন্ত বিক্রি করলাম ২টা মাত্র। এভাবে চলতে থাকলে তো ব্যবসাই হবে না। যে দাম বলছি, ক্রেতারা তার ধারেকাছেও থাকছেন না। হাটের খরচটাও উঠে আসছে না।”

ভাটারার ছোলমাইদ হাটে ২০টি ষাঁড় নিয়ে এসেছিলেন পাবনার আতাইকুলার আর এস আর অ্যাগ্রো ফার্মের খামারি জাহাঙ্গীর আলম।

তিনি বলেন, “আমাদের একেকটা ষাঁড়ের দাম পড়বে দেড় লাখ থেকে ৪ লাখ টাকা। কিন্তু ক্রেতারা যে দাম বলছেন, তাতে আমাদের পোষাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত গরু কিছু বিক্রি করতে পারব, আর কিছু পারব না।”

খিলক্ষেতের মাস্তুল হাটে বেপারী মেহেরপুরের শমসের আলী বলেন, “মোটামুটি ২০ বছর ধরে ঢাকার হাটে আসি গরু নিয়ে। এমন খারাপ অবস্থা আর দেখি নাই।

“গরু আনা, হাটের পজিশন সব মিলায়ে খরচ হয়েছে ১২-১৩ লাখ টাকা। হাট থেকে ৫-৬ লাখ টাকাও যদি পাই, তাও বলতে পারতাম। কিন্তু এখনও তো গরুই বিক্রি করতে পারলাম না।”

উত্তর শাহজাহানপুর হাটের বেপারী পিজির মণ্ডল বলেন, “ম্যালা লসে গরু বিক্রি করতে হইতেছে। মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নাই।”

পিএনএস/এএ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন