গুলি করে বুট দিয়ে সিনহার গলা চেপে ধরে লিয়াকত!

  

পিএনএস ডেস্ক: পুলিশের গুলিতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের মৃত্যুকে ‘পূর্ব পরিকল্পিত’ হত্যাকাণ্ড বলে উল্লেখ করেছেন তার সফরসঙ্গী ছিলেন শাহেদুল ইসলাম সিফাত। গত শুক্রবার টেকনাফ থেকে কক্সবাজার যাওয়ার পথে মেজর সিনহার সফরসঙ্গী ছিলেন তিনি।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সিফাত বলেন, পুলিশের যে ইন্সপেক্টর সিনহাকে গুলি করেন, তিনি মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন তখন, এবং তাতে মনে হয়েছে তিনি অপর প্রান্তের কারো নির্দেশ কার্যকর করতে গুলি চালিয়েছেন। ফোনে কথা বলার সময় তিনি অন্যপ্রান্তের ব্যক্তিকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করছিলেন। অন্যপ্রান্তের কথার জবাবে তিনি বলেন ‘ঠিক আছে স্যার, আমি করছি’। তারপরই তিনি সিনহাকে লক্ষ্য করে গুলি চালান।

গত মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত দল সিফাতের সঙ্গে কক্সবাজার কারাগারে দেখা করেন। সিফাত তদন্ত কর্মকর্তাদের একথা বলেন ।

কারাগার অভ্যন্তরে সিফাতকে জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে জড়িত সূত্র জানিয়েছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সিফাত জিজ্ঞাসাবাদে এ কথাও জানিয়েছে যে, সাবেক সেনা কর্মকর্তা কখনই তার লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্র বের করার চেষ্টা করেননি, এমন কি গুলি খাওয়ার পরেও না।

ঘটনার পুলিশি বক্তব্যকে পুরোই নাকচ করে দিয়েছেন সিফাত। পুলিশ দাবি করেছে, তারা আত্মরক্ষার জন্য গুলি চালাতে বাধ্য হয়েছিল। তদন্ত দলটি সিনহার অপর সতীর্থ শিপ্রা দেবনাথের সঙ্গেও কারাগারে কথা বলেছেন। তিনিও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী। দুজনের বিরুদ্ধেই পুলিশ পৃথক দুটি মামলায় হত্যা চেষ্টা এবং মাদকদ্রব্য বহন করার অভিযোগ এনেছে। শিক্ষার্থীদের নিয়ে কক্সবাজারে মেজর (অব.) সিনহা একটি প্রামান্যচিত্র তৈরির কাজ করছিলেন।

তদন্তকারী দলের কাছে ওই রাতের কথা স্মরণ করতে গিয়ে সিফাত বলেন, ‘শুক্রবার রাত সোয়া নয়টা দিকে আমরা কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারচড়া ইউনিয়নের শুটিং স্পট থেকে ফিরছিলাম। আমরা আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের দুটি চেকপোস্ট পার হয়ে আসি, সবকিছু ঠিকই ছিল।’

তদন্ত কমিটিকে সিফাত বলেন, ‘কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভের শামলাপুর চেকপয়েন্টে এলে তাদের থামার ইঙ্গিত দেয় পুলিশ - ওই রাতে এটা ছিল তাদের তৃতীয় চেকপোস্ট। সিনহা স্যার গাড়ি থামালে পুলিশ ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী চেঁচিয়ে আমাদের সবাইকে হাত উপরে উঠাতে বলে। তার কথা মতো আমরা তাই করি। সিনহা স্যার গাড়ি থেকে নেমে যান আর আমি গাড়ির সামনে সিটে বসে থাকি। তিনি নিজের পরিচয় দেন। পুলিশকে জানান যে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন প্রাক্তন মেজর। তিনি এমনকি পুলিশকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার পরিচয় যাচাই করারও প্রস্তাব দেন। কিন্তু লিয়াকত কোনো রকম সতর্ক না করেই তাকে গুলি করতে শুরু করে।’

সিফাত আরো বলেন, ‘গুলি করেই ক্ষান্ত হয়নি লিয়াকত, সিনহা স্যার যখন যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছিলেন বুট দিয়ে তার গলা চেপে ধরে সে। কর্তব্যরত পুলিশ তখন আমাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করেন।’

সিফাত তদন্ত দলকে বলেন, ‘ওই রাতে তারা কেউই মাতাল ছিল না বা কেউই কোনো মাদক বহন করছিল না। এই এলাকাটা আমরা চিনি ২৮ দিন ধরে। মেরিন ড্রাইভে একাধিক চেকপোস্ট রয়েছে জেনেও কোন বুদ্ধিতে এই ঝুঁকি নেব?’

স্থানীয় গ্রামবাসী তাদের ডাকাত বলে চিৎকার করেছে পুলিশের এই দাবিও একেবারে মিথ্যা বলেন সিফাত। তিনি তদন্ত দলকে বলেন, ‘টেকনাফ থেকে ফেরার পথে আমাদের দু'জন স্থানীয় লোকের সাথে দেখা হয়, তারা আমাদের পরিচয় জানতে চেয়েছে, তবে তারা আমাদেরকে দেখে কখনই ডাকাত বলে চিৎকার জুড়ে দেয়নি।’

সিনহার আরেক সতীর্থ শিপ্রা দেবনাথ, শুক্রবার রাতে স্থানীয় একটি রিসোর্টে ছিলেন। তিনি তদন্ত দলকে বলেন, ‘সেই ৩ জুলাই থেকে তিনি ডকুমেন্টারি দলটার সঙ্গে কাজ করছেন। প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তাকে তিনি কখনই রাগতে বা উত্তেজিত হতে দেখেননি।’

তার কথায় সায় পাওয়া যায় রিসোর্ট মালিক মনজুরুল কবিরে কথাতেও। তিনিও জানান, ‘এখানে যতদিন আছেন সিনহাকে তিনি পুরো একজন নম্র-ভদ্র ব্যক্তি হিসেবেই পেয়েছেন। আমি তাকে, এমন কি কখনও কারও সঙ্গে উঁচু গলাতে কথা বলতে দেখিনি। সে কীভাবে পুলিশকে বন্দুক ঠেকাবে!’ কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও তদন্ত কমিটির সমন্বয়ক শাহজাহান আলী জানিয়েছেন, ‘তারা দ্রুতই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবেন।’

প্রসঙ্গত, গত ৩১ জুলাই ঈদুল আজহার আগের রাত সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকত আলীর গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। এ ঘটনায় চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে প্রধান করে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ। তদন্তের স্বার্থে গত রোববার টেকনাফের বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ লিয়াকত আলীসহ সবাইকে প্রত্যাহার করা হয়। আর হত্যা মামলা হওয়ার পর বুধবার ওসি প্রদীপকে প্রত্যাহার করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত মঙ্গলবার সকালে সিনহা রাশেদের মা নাসিমা আক্তারকে ফোন করে সমবেদনা ও সান্ত্বনা জানিয়েছেন। তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তেরও আশ্বাস দিয়েছেন।

বুধবার দুপুরে সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ কক্সবাজারে যান। তাঁরা কক্সবাজার সৈকতে অবস্থিত সেনাবাহিনীর রেস্টহাউস জলতরঙ্গতে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। পরে সেখানে তাঁরা যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেন। তাঁরা সিনহা মোহাম্মদ রাশেদের নিহত হওয়াকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে উল্লেখ করেন। তারা বলেন, সেনাবাহিনী ও পুলিশের মধ্যে দূরত্ব নেই। আর এ ঘটনায় দুই বাহিনীর মধ্যে চিড় ধরবে না।

সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ বলেন, ‘সিনহার মৃত্যু নিয়ে বাংলাদেশের দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর মধ্যে কোনো ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ যে ঘটনাটি ঘটেছে, তাতে কোনো প্রতিষ্ঠান দায়ী হতে পারে না। তদন্ত কমিটি যাদের দোষী সাব্যস্ত করবে, অবশ্যই তাদের প্রায়শ্চিত্ত পেতে হবে। এ জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের সহযোগিতা করবে না।’

অন্যদিকে সংবাদ সম্মেলনে আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘টেকনাফে যে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটির কারণে দুই বাহিনীর মধ্যে সম্পর্কের কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না। বরং আমাদের লক্ষ্য হবে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত যৌথ তদন্ত কমিটি হয়েছে, তারা প্রভাবমুক্ত পরিবেশে তদন্ত করবে। তারা তদন্ত করে যে প্রতিবেদন দেবে, সে অনুযায়ী পরবর্তী আইনি কার্যক্রম পরিচালিত হবে এবং সেটাই গ্রহণ করা হবে।’

বুধবার দুপুরে মেজর সিনহা হত্যার বিচার চেয়ে কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। মামলাটির শুনানিতে সন্তুষ্ট হয়ে তা ‘ট্রিট ফর এফআইআর ’ হিসেবে আমলে নিতে টেকনাফ থানাকে আদেশ দেন আদালতের বিচারক তামান্না ফারাহ। একইভাবে মামলাটি কক্সবাজার র‍্যাব-১৫-কে তদন্তের দায়িত্ব দিয়ে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে মামলা অগ্রগতির প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।

হত্যা মামলার আসামিরা হলেন- টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশস বাহারছড়া শামলাপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের প্রত্যাহার হওয়া পরিদর্শক ও চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার পূর্ব হুলাইন গ্রামের বাসিন্দা লিয়াকত আলী (৩১), উপপরিদর্শক (এসআই) নন্দদুলাল রক্ষিত, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) লিটন মিয়া, পুলিশ কনস্টেবল সাফানুর রহমান, কামাল হোসেন, আবদুল্লাহ আল মামুন, টুটুল ও মো. মোস্তফা।

আদালতের নির্দেশে বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে টেকনাফ থানায় মামলাটি (নম্বর সিআর : ৯৪/২০২০ইং/টেকনাফ) তালিকাভুক্ত করা হয়। দণ্ডবিধির ৩০২, ২০১ ও ৩৪ জামিন অযোগ্য ধারায় মামলাটি তালিকাভুক্ত করা হয়। টেকনাফ থানার নতুন ওসি মামলাটি তালিকাভুক্ত করেন বলে থানার একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে হত্যা মামলা দায়েরের আগেই ওসি প্রদীপ স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে গত ৪ আগস্ট ছুটির আবেদন করেন। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) এ বি এম মাসুদ হোসেন তার ছুটির আবেদন গ্রহণ করেন বলে পুলিশ সুপার কার্যালয়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো কথা বলতে চাননি এসপি। মেডিকেল ছুটি নিয়েই ওসি প্রদীপ কক্সবাজার ছেড়েছেন। তাকেসহ মামলার আসামি নয় পুলিশ সদস্যকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে কি না, জেলা পুলিশ নিশ্চিত করতে পারেনি।

পিএনএস/এএ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন